advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

শিক্ষায় এ কেমন গোলকধাঁধা

ড. কাজল রশীদ শাহীন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০০:১৯
advertisement

শিক্ষা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তখন আমাদের দেশে চলছে গোঁজামিল ও গোলকধাঁধায় ভরা এক শিক্ষাব্যবস্থা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এখন অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা দুর্নীতির সূতিকাগার ও টাঁকশাল শিক্ষিত সমাজে ও শিক্ষিতজনদের মধ্যেই বেশি। বিষয়টা এ গ্রহবাসী সবার জন্যই ভাবনার, তবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে অধিকতর ভাবনার, যদি সেটা আমলে নেওয়া হয়। বলা হচ্ছে, শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতির মধ্যে মস্ত বড় কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে, এ কারণে সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষিতজন তৈরি হলেও মনুষ্যত্ব গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ তৈরি হচ্ছে না। ফলে, অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ছে বৈ কমছে না।

এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে শিক্ষার কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। যা নিয়ে কোথাও কোথাও কাজও শুরু হয়ে গেছে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এ ব্যাপারে সুন্দর একটা পথ বাতলিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, আমাদের শিশুদের মন নরম সিমেন্টের মতো, সেখানে আপনি যা লিখে দেবেন সেটা খোদাই হয়ে থেকে যাবে। তিনি আরও মনে করেন, শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে বড় হয়ে বড় দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হবে। শিক্ষায় ব্যবস্থা যেন হয় তার আগামী দিনের রিহার্সেল পিরিয়ড। কিন্তু আমরা শিখাচ্ছি, ‘প্রয়োজন আইন মানে না’র মতো ভাবসম্প্রসারণ আর দুধে পানি মেশানোর পাটীগণিত।

শুধু কি তাই, ট্র্যাজেডি হলো, শিক্ষা নিয়ে বিশ্ব যখন এই স্তরের ভাবনা-প্রচেষ্টা ও কসরতে বুঁদ এখন অধ্যবসায়ী তখন আমরা রয়েছি গোঁজামিল ও গোলকধাঁধার অদ্ভুত এক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে।

আমাদের পরীক্ষা হবে কিনা পরীক্ষার্থীরা জানে না। অথচ তারা গত পরীক্ষাটা দিয়েছে ঠিকঠাকই। সপ্তাহান্তে কিংবা দু-একদিনের মধ্যেই নির্ধারিতও রয়েছে পরবর্তী পরীক্ষা হওয়ার তারিখ। কিন্তু তারা সংশয়ে রয়েছে আদৌ পরীক্ষা হবে কিনা এই নিয়ে। এরই মধ্যে রাজধানীতে সাত কলেজের আন্দোলন-অবরোধ ও নানা চাপান-উতোরের ঘটনা।

ঘটনাগুলো দৃশ্যমান হলো চলচ্চিত্রের দৃশ্যের চেয়েও দ্রুতগতিতে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের যে বহুল চেনা সময় পরিধি তার মধ্যেই কিংবা একটু বেশি-কমে ঘটে গেল একের পর এক ক্লাইমেক্স। শিক্ষার্থী ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা তো বটেই অন্যরাও বেজায় আগ্রহ-কৌতূহল ও বিস্ময় নিয়ে দেখল সেসব ঘটনাবলি। এবং স্পষ্ট হলো অদ্ভুত এক গোলকধাঁধা, যেখানে আটকে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এই হাল-হকিকতের মধ্য দিয়ে রুটিনমাফিক কিছু কাজ হয়তো সম্পাদন করা যায়, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরি করা যায় কি?

একটু ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে দেখে নেওয়া যেতে পারে সেদিনের ঘটনাবলি। আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ঈদুল ফিতরের পর ২৪ মে থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। আর ১৭ মে খুলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। জানা গেল না, এই ঘোষণা কি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কিনা, তবে ঘোষিত টেক্সের আলোকে ধরে নিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই প্রযোজ্য। তা হলে স্কুল-কলেজের কী হবে। এ রকম একটা কথা চাউর রয়েছে ক্লাস ফোর পর্যন্ত খুলে দেওয়া হবে ঈদের পর পরই। কিন্তু কোনো প্রমাণাদি নেই।

এই অবস্থার মধ্যে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো ঠিকই খোলা রয়েছে। করোনা মাদ্রাসা শিক্ষার একটা ধারাকে ব্যাহত করতে পারেনি। কিছু কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলও তাদের সব কার্যক্রম প্রকাশ্যে কিংবা কিছুটা আড়ালে-আবডালে যথারীতি অব্যাহত রেখেছে। সেখানে ঘটা করে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসবের বাইরে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার মতো রঙ্গ তো চলছেই। এগুলোকে কি শুধু গোলকধাঁধা বলা উচিত নাকি মহাগোলকধাঁধা বলাই যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয়?

অতি সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটল তা তো শুধু বিস্ময়ের নয়, জ্ঞান লোপ পাওয়ার মতো বৈকি। প্রথমে বলা হলো, সব পরীক্ষা বন্ধ। কেউই কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তারও আগে বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা যেহেতু হলে উঠে গেছেÑ তারা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হবে। আর কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া মানে বাকি সব একই পথ অনুসরণ করা। কিন্তু দেখা গেল, পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকল। একপর্যায়ে বন্ধ করার ঘোষণা এলো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বন্ধের নোটিশও দেওয়া হলো। এই অবস্থায় মনে করা হলো কিংবা ধরে নেওয়া হলো যে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ই বন্ধ। কিন্তু কোনো ঘোষণা নেই। ফলে, যে বা যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগে পরীক্ষা কার্যক্রম চলমান ছিল তারা কী করতে যাচ্ছে কিছুই স্পষ্ট হলো না। পরীক্ষার্থীরা পড়ে গেল দোটানায়। শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগে তারাও কোনো কিছু জোর দিয়ে বলতে পারল না। বরং আরও ঝুলিয়ে রাখা হলো তাদের এই কথা বলে যে, উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে তারা চেষ্টা করবে পরীক্ষা নেওয়ার। এটা কি সম্ভব? তা হলে সমন্বিত সিদ্ধান্ত বলে কি কিছুই নেই? বিভাগীয় শিক্ষকরা তাদের এই কথা বলে উৎসাহিত করল যে, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে যে কোনো মূল্যে পরীক্ষা নিয়ে নেওয়ার, তবে নিশ্চিতও নয়। এরই মধ্যে যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি সেই ঘটনার একটা সুরাহা হয়ে গেল। সেটা হলো সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং সেই অনুযায়ী দিন-তারিখ ও সময় জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে কী হবে তা স্পষ্ট হলো না। এখনো কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা হবে কী হবে না এই দোচালায় রাত-দিন পার করছেন। আর শিক্ষকরা দেখি-দেখি করেই যাচ্ছেন।

দেশের উচ্চশিক্ষায় সমন্বয়হীনতা কতটা প্রকট, তা এসব ঘটনায় আবারও যেমন স্পষ্ট হলো, তেমনি অতীতেও বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি আজও। এই নিয়ে কারও সদিচ্ছা আছে কিনা সেটা নিয়ে আমরা কোনো কথা বলতে চাই না। আমরা শুধু বলব, আজও গোলকধাঁধা থেকে বেরোতে পারেনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা। এই ত্রুটিযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা যে আমাদের সব অর্জন ও প্রাপ্তিকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট তা বোধহয় আমরা বুঝেও বুঝছি না, দেখেও দেখছি না।

আমাদের উচ্চশিক্ষাকে দেখভাল করার জন্য ইউজিসি বলে একটা মনিটরিং সংস্থা রয়েছে। কিন্তু তারা বাস্তবে কোনো প্রভাববিস্তারী ভূমিকা পালন করতে পারছে না। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ বিদ্যমান। একাধিক উপাচার্যের নামে অসততার অভিযোগ শুধু নয়, ইউজিসির অনুমোদন না নিয়ে কিংবা ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে ইচ্ছেমতো কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কোনো কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওপেন সিক্রেট ক্ষেত্রবিশেষে প্রমাণিত কিন্তু তাদের আইনের আওতায় আনা যায়নি। তা হলে উপাচার্যরা কি দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে? ইউজিসি যদি দৃশ্যমান ও সুফলপ্রদায়ী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে না পারে তা হলে তার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সঙ্গত নয় কি? নাকি তারা মনে করেন, নামকাওয়াস্তে কিছু গবেষণা বৃত্তি প্রদান করলেই ইউজিসির মতো একটা প্রতিষ্ঠানের ষোলো আনা দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এ রকম একটা প্রতিষ্ঠান থাকার পরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেন একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেল না, সেটা ভেবে দেখা জরুরি নয় কি। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও কেন সুন্দর একটা বিহিত করা গেল না, তাও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসনের নামে আসলে কী করছে বা কী করল সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসনের সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন তা কি যুক্তিযুক্ত? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও আমরা কেন একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে উপহার দিতে পারলাম না। কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটল শুধু, আর শিক্ষা ও গবেষণাতে তলানিতে রয়ে গেলাম। কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের স্কলারদের আনাগোনা নেই। এই যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে আমরা হাজির হয়েছি। পেছন ফিরে তাকালে আমরা কি হলফ করে বলতে পারব যে, পঞ্চাশ জন নোবেল লরিয়েটকে আমাদের দেশে এনেছি। জ্ঞানের এই লেনদেন যদি নাই-ই ঘটে তা হলে শত বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী হবে আমাদের?

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা অদ্ভুত এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে। এখানে অবকাঠামো ও নতুন নতুন বিভাগ খোলার জারিজুরি যতটা প্রবল, জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানকাঠামোর বিকাশ-বিস্তার ও পুনরুৎপাদনে ততটা সক্রিয়তা তো নেই-ই, বিন্দুমাত্র কোশেশ আছে বলেও মনে হয় না। হুমায়ুন আজাদ একদা বলেছিলেন, আমাদের উচ্চশিক্ষার সর্বনাশে যেসব কার্যকারণ ও অনুষঙ্গ দায়ী তার মধ্যে এনজিও অন্যতম। কারণ আমাদের সেই সময়ের মেধাবী শিক্ষকদের মনোযোগ ও আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল এনজিও-এনজিও এবং এনজিও। শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং গবেষণার পরিবর্তে ওইসব শিক্ষক এনজিওর প্রজেক্ট প্রোফাইল করতেই আগ্রহ বোধ করতেন, কারণ সেখানে নগদ ও অধিক অর্থযোগ বিদ্যমান।

এনজিওর সুদিনে ভাটা পড়ায় শিক্ষকরা এখন অন্য পথ বাতলে নিয়েছেন। এখন তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাÑ টেলিভিশনের পর্দায় টক শোর বুদ্ধিজীবীতা, ফরমায়েশি লেখালেখি, পদ-পদবি ও নানা অছিলায় বিদেশ ভ্রমণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষকদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার বৈধতাও দিয়েছে। এসব করার পর তারা যেহেতু অনেক অনেক সময় পান তাই তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও গবেষণাও করেন। এর পরও যদি আমরা না বুঝি কতটা গোলকধাঁধায় আটকে আছে আমাদের উচ্চশিক্ষা ও সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা। তা হলে কিছুই বলার নেই, কারণ জেগে ঘুমালে তার ঘুম ভাঙাবে সাধ্যি কার? এ তো গেল গোলকধাঁধার কথা। গোঁজামিলও রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আঁতুড়ঘরে।

মাত্র ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট একটা দেশে তিন রকমের শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। পৃথিবীর কোথাও এ রকম ব্যবস্থা নেই, থাকতে পারে না। একটা গোঁজামিল দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা উন্নয়ন-গণতন্ত্র-ন্যায়বিচার-সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতিকে টেকসই করার চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু একবারও ভেবে দেখছি না এভাবে আদৌ সম্ভব কিনা। হ্যাঁ, সম্ভব যদি আমরা শুধু মুখেই বাস্তবায়ন করতে চাই আর সংখ্যার নিরিখে সান্ত্বনা খুঁজে ফিরি। প্রকৃতই যদি দেশপ্রেমের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে চাই তা হলে গোঁজামিল ও গোলকধাঁধার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও বটে।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

advertisement