advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কর্মজীবী নারীর অবসরকালীন কর্ম

শেলী সেনগুপ্তা
১ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২২:৩৫
advertisement

কর্মজীবী নারীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে আসে সূক্ষ্ম সুতোর ওপর চলা একটি জীবনের গল্পকথা। এ বড় কঠিন চলা। এই শতকে এসেও একজন নারীকে খুব কঠিন সংগ্রাম করে কর্মজীবন টিকিয়ে রাখতে হয়। গৃহিণীর জীবন যেমন ‘রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা’, কর্মজীবী নারীর জীবন কিন্তু আর একটু ভিন্নধারায় প্রবাহিত হয়। ‘রাঁধা-খাওয়া’র পরও তাদের কর্মতৎপরতার কমতি থাকে না। এর মধ্যে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েও নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সুষ্ঠু মনোযোগী হতে হয়। প্রতিদিন সকালে সংসারে দশভুজার দায়িত্ব পালন করে প্রত্যেক কর্মজীবী নারী তার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। এর মধ্যে থাকে যাত্রাপথের নানা বিড়ম্বনা। পথ দীর্ঘ হোক কিংবা না হোক, ব্যস্ত শহরে সব সময়ই একটা অনিশ্চয়তা থাকে। তার পর কর্মস্থলে গিয়েও কখনো কখনো তার শ্রম ও মেধার সুষ্ঠু প্রয়োগের সুযোগ হয় না। আবার সবটুকু মনোযোগ দিয়ে কাজ সম্পন্ন করার পরও এর সঠিক মূল্যায়ন হয় না।

তার ওপর থাকে প্রতিনিয়ত চাকরি ছেড়ে সংসারে মনোযোগী হওয়ার ধারাবাহিক উপরোধ ও অনুরোধ। আমাদের সমাজে এখনো কর্মজীবী নারী পরিবারে খুব একটা আদৃত নয়। কেউ কেউ নানা প্রতিকূলতার মুখে হেরে গিয়ে পদত্যাগ করেন, নিজের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার কথা ভুলে সংসারের চৌহদ্দিতে ফিরে যান। আবার কেউ কেউ শত প্রতিকূলতার মুখে খড়কুটো হয়ে টিকে থাকেন। নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে তিল তিল এগিয়ে যান, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সমাজের জন্য একটা কিছু করে দেখাতে চান।

এই এগিয়ে যাওয়াও একদিন শেষ হয়। স্বাভাবিক নিয়মে চাকরি জীবনে অবসর শব্দটি চলে আসে। কেউ কেউ অবসর জীবনকে শুধুই বিনোদন হিসেবে নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। তবে এই সংখ্যা খুবই কম। আবার কেউ কেউ আগেই পরিকল্পনা করেন, কীভাবে অবসর জীবনে নিজেকে আরও বেশি কর্মক্ষম রাখা যায়। অবসর শব্দটিকে সুন্দর মাত্রা দেওয়ার মাধ্যমেই সঠিক পরিকল্পনা করা হয়। তা ছাড়া মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা কখনই শেষ হয় না। সঠিক উপায়ে অর্থ উপার্জন করে সঠিক পথে ব্যয় করলে নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যেরও উপকার করা যায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করেন, এই চাকরির মাধ্যমে তাদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে। ফলে তারা যদি অবসর গ্রহণের পর কোনো ব্যবসা করার চিন্তাভাবনা করেন তবে সেটা বিফলে যাবে না। দীর্ঘদিন চাকরি করার কারণে অভিজ্ঞতা এবং বিশাল নেটওয়ার্কিং বেশ সাহায্য করে থাকে। তা ছাড়া এদের মধ্যে যারা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে জানেন, তারা ইচ্ছা করলেই অবসর থাকাকালীনও ভালো অঙ্কের টাকা আয় করতে পারেন। যেমন কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা।

যদি কেউ নতুন কাজে ফিরে যেতে চান তা হলে এমন কিছু কাজের খোঁজ করতে হবে যা করে অপার আনন্দ পাওয়া যাবে। এটা করতে হবে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগেই। পরিচিতি দিয়ে অনেক কাজ সহজেই করা সম্ভব।

এ সময় এমন কিছু ব্যবসার চিন্তা করা যায় যা আনন্দ দেয় এবং উপভোগ্যও হয়। নারীমাত্রই কর্মযোগী। তাই প্রত্যেক নারীর কিছু দক্ষতা থাকে, যেমন- ভালো আচার বানানো, ভালো সেলাই করা, বনসাই অথবা ইকোবেনা করা। চাইলেই এসব দক্ষতা দিয়ে নতুন করে নিজেকে কর্মে নিয়োজিত করা যায়। বাসায় বসে নিজে এসব প্রস্তুত করে বাজারজাত করতে পারেন। এজন্য আরও কিছু মেয়েকে নিয়োজিত করলে তাদের কর্মসংস্থান হয়ে যায়।

এ ছাড়া এ কাজগুলো কেউ শিখতে চাইলেও সম্মানীর বিনিময়ে শেখানো যায়। ফলে মাস শেষে কিছু অর্থ উপার্জন হবে, সময় ভালো কাটবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে। জ্ঞান এমন এক বিষয় যা কখনই বাদ দেওয়া যায় না, দেওয়া উচিতও নয়। বাসায় বসে এমন সব কাজ পরিচালনা করলে আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে আয়ের পথও হয়ে যায়।

দীর্ঘ চাকরি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে অবসর জীবনে কাজে লাগানো যায় পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে। কিছু মানুষ আছেন যারা পরামর্শের জন্য অন্যদের কাছে গিয়ে থাকেন। এ রকম অনেক সমস্যা সমাধানের পরামর্শ বা সমস্যা সমাধানের কিছু উপায় জানিয়ে আয়ের ব্যবস্থা করা যায়। সাধারণত নারীরাই নারীর সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের উপায় বলে দিতে পারেন। এটা হতে পারে আইনগত সমস্যা সমাধান, হতে পারে বিষণœ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষকে সঠিক পথ দেখানো। এখানে সৃজনশীলতা এবং নিজস্ব ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে। কারও সমস্যা সমাধান করে দিয়ে সুন্দর জীবন গড়তে সাহায্য করার আনন্দও কিন্তু কম নয়।

চাকরি থেকে অবসরের পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়া মন্দ নয়। শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত হলে যেমন জ্ঞানচর্চার মধ্যে থাকা যায়, তেমনি নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। অনেকেই শিশুদের মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন। সে ক্ষেত্রে নিজের এলাকার শিশুদের নিয়ে কোনো সংগঠন গড়ে তোলা যায়। তাদের নিয়ে কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গান ও ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়। তাতে শিশুরাও খুশি হবে। একটা শিশুকে সুন্দর সময় দেওয়ার মাধ্যমে সুনাগরিক গড়ে তোলায় বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

অনেকেই বেড়াতে ভালোবাসেন। কিন্তু কর্মজীবন ও সংসার সামলাতে সামলাতে খুব একটা বেড়ানো হয়ে ওঠেনি। তারা অবসর জীবনে ট্যুর গাইডের মতো মজার কাজ করতে পারেন। যদি বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ভ্রমণের উপযোগী স্বাস্থ্য হয়ে থাকে তা হলে ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করলে যেমন বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে পারবেন, সেই সঙ্গে অর্থও আয় হয়। আরও একটি দারুণ বিষয় হচ্ছে, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়। ট্যুর গাইডের কাজের মাধ্যমে মন যেমন ফ্রেশ থাকে, তেমনি সময়ও কেটে যায় বেশ দারুণভাবে। ঘর থেকে বের হয়ে ‘একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু’ দেখার অপার আনন্দ নিয়ে অবসর জীবন কাটানো যাবে।

নিজের অবসর সময়কে ভালো কাজে ব্যয় করে যদি কেউ মানসিকভাবে তৃপ্তি পেতে চান তা হলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে জড়িত হতে পারেন এবং তাদের সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে যোগ দিতে পারেন। অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সদস্যদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে। কেউ যদি উদ্যমী, নিবেদিত এবং যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন তা হলে অবসর কাটানোর মতো সবচেয়ে উপভোগ্য কাজ হবে এটি। যখন মন চায় হাসপাতালে গিয়ে অসহায় রোগীদের সান্ত¡না দেওয়া যায়। অসুস্থ শিশুদের গল্প বলে আনন্দ দেওয়া যায়। একজন অসহায় মানুষকে সহায়তা করার সুযোগ সবাই পান না, পেলে নিতে হয়। করতে চাইলে কাজের কোনো অভাব নেই। মানুষমাত্রই সৃষ্টিশীল, এ সময় নিজের সৃষ্টিশীল মানসিকতাকে কাজে প্রয়োগ করা যায়। ছাত্রজীবনে লেখালেখির অভ্যাস থাকলে তা আবার শুরু করা যায়, কিছু না হোক, আত্মজীবনী লেখার আনন্দ তো নেওয়া যায়। অতীতের বন্ধুদের খুঁজে বের করে নিজেদের মধ্যে সমবায়ের মাধ্যমে আয়ের পথ বের করেও নেওয়া যায়। এই আয় থেকে চাইলেই কাছাকাছি কিছু অসহায় মানুষকে সাহায্য করা যায়। দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া যায়। আঙিনায় বাগান তো অনেকেই করেন। নিজ হাতে ফুল ফোটানোর আনন্দ একমাত্র পুষ্পপ্রেমীই জানেন।

ফটোগ্রাফির অভ্যাস থাকলে তাও হবে আনন্দদায়ক। প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তোলা যায়। কোনো ক্লাবে যোগ দিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যায়। বিক্রি করে অর্থ উপার্জনও করা সম্ভব। একজন নারীর জন্য অবসর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কাজ হবে, নিজেকে ভালোবাসা। অন্যকে ভালোবাসা খুব সহজ, কেউ নিজেকে ভালোবাসার কথা খুব একটা ভাবেন না। এই অবসরে নিজেকে নিয়ে ভাবা যায়, নিজের আনন্দের জন্য, নিজের ভালো লাগার মতো কিছু করা যায়। নিজেকে নিয়ে একান্তে কিছু সময় কাটানোও অনেক আনন্দের।

জীবন আসলে থেমে থাকার জন্য নয়। অবসর জীবনে এ কথাটা মনে রেখে নিজের সময় ও বয়সকে মেনে নিয়ে জীবনকে অর্থবহ করে তোলাটাই জীবনের সার্থকতা। এক-একটা জীবনকে মালার মতো গেঁথে নিয়ে মানবকল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার আনন্দ নিয়ে সফল অবসর জীবনযাপনই হতে পারে প্রতিটি নারীর একান্ত কাম্য।

শেলী সেনগুপ্তা : সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

advertisement