advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

গৌরবের আরও এক ধাপ উত্তরণ

মাহফুজুর রহমান
২ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১ মার্চ ২০২১ ২৩:৩০
advertisement

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের প্রস্তুতিলগ্নে জাতিসংঘের কাছ থেকে আমরা একটি গৌরবময় সংবাদ শুনতে পেলাম- তা হলো বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ পেয়ে গেছে জাতিসংঘের কাছ থেকে। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। জাতিসংঘের এই তালিকা থেকে উত্তরণের শর্ত হচ্ছে তিনটি সূচকের সবগুলো শর্ত পূরণ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে দেশটির মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার হতে হবে, মানবসম্পদ সূচকে কমপক্ষে ৬৬ পয়েন্ট অর্জিত হতে হবে এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ৩২ পয়েন্টের কম হতে হয়। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এসব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে। এবার দ্বিতীয়বারের মতো শর্তগুলো পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল এবং লাওসও উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ পেয়েছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ইউএন-সিডিপি) প্রবিধান অনুসারে উত্তরণের সুপারিশ পাওয়া দেশ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রস্তুতিকালীন সময় ভোগ করতে পারে। করোনা ভাইরাস মহামারীর বাস্তবতায় উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইউএন-সিপিডির কাছে পাঁচ বছর সময়কালের সুবিধা চেয়েছে- যা ইউএন-সিপিডি কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। এর অর্থ, আগামী ২০২৬ সালে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ হবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে।

বাংলাদেশের এই গৌরবযাত্রায় দেশের সরকারপ্রধান এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশ যে বিভিন্ন দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে তা এ দেশের অধিবাসী হিসেবে আমরা সরেজমিনই প্রত্যক্ষ করছি। এক সময়ের ক্ষুধার্ত বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গ্রামের সেই তালি দেওয়া মলিন কাপড়ের স্মৃতিও আজ সময়ের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে। এক সময় পাকিস্তানের শোষণের চাপে আমাদের সম্ভাবনাময় অর্থনীতি পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা নিয়ে তার দেশকে সুইডেন বানিয়ে দেবেন বলে ঘোষণা দেওয়ার পর সেদেশের ক্যাপিটাল টিভির এক টক শো-তে একজন বক্তা বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রীকে মিনতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘খোদার দোহাই, আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।... পাঁচ না, দশ বছরে আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।’

দেশের উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিগত দিনগুলোতে আমাদের উন্নয়ন ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেছে; আগামী দিনগুলোতেও এই প্রক্রিয়া আমাদের ধরে রাখতে হবে। এই সুসংবাদটি পেয়ে আমরা যদি আনন্দিত হয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিই তা হলে চলবে না। সরকারের উন্নয়নমুখী নীতিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেশের সব পর্যায়ের মানুষের। করোনাযুদ্ধে যখন সারাবিশ্বের নামিদামি দেশগুলোর অর্থনীতি পর্যুদস্ত, তখন প্রধানমন্ত্রীর সঠিক পদক্ষেপের কারণে এবং দেশের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতার ফলে আমাদের অর্থনীতি বহাল-তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। গত ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ পুনরায় রেকর্ড স্থাপন করেছে। এই দিনে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪০২ কোটি মার্কিন ডলার।

স্বল্পোন্নত দেশের বিষম চক্র ভেঙে একটি দেশ যখন উন্নয়নশীলতার দিকে এগিয়ে যায় তখন দেশটি কিছু সুবিধা পায়, কিছু অসুবিধাও বা চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়। একটি দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনীতির ওপর বিশ্ব অর্থনীতির আস্থা যতটা থাকে, একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা থাকে অধিকতর। অনেকগুলো কাজেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভিন্ন কাজে নির্ভর করতে পারে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির ওপর। বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ব্যয় কমে যায়। উন্নয়নশীল দেশের যে কোনো খাতে বিনিয়োগে তুলনামূলকভাবে স্বল্পোন্নত দেশে বিনিয়োগের চেয়ে ঝুঁকি কম। আর সেজন্যই কম সুদহারে অনেকেই বিনিয়োগ করার কথা ভাবেন। তাই বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ব্যয় কমে যায়। বাংলাদেশ এই সুবিধা অতি সহজেই পাবে। ঋণ বা এর কিস্তি ফেরত প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কারণ অর্থনীতির দুরবস্থার সময়ও বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি কখনো খেলাপি হয়নি।

দেশটি উন্নয়নশীল বিধায় এর ক্রেডিট রেটিং হার ওপরে উঠে যায়। দেশের পরোক্ষ সম্পদগুলো দৃশ্যমান বা ক্রিয়াশীল হতে শুরু করে। এই সুবিধাগুলো দেশ পেতে শুরু করে। দেশের অভ্যন্তরীণ কর আদায়ের হার বাড়ে এবং প্রক্রিয়া আধুনিকতর হয়। কর খাত অধিকতর স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। এ ছাড়া সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বিদেশের অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসে এবং সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগিয়ে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি, আয়, সঞ্চয়, কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি আত্মনির্ভরতা বাড়িয়ে তোলে। দেশের উন্নয়নের জন্য বিদেশের দয়ানির্ভরতা হ্রাস পায়। এর ফলে দেশকে বিদেশিদের কাছে কোনো দাসখত দিয়ে কাজ করতে হয় না, নিজেদের ইচ্ছা অনুসারে নিজেদের সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব হয়।

এগুলো তো গেল সুবিধার কথা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে গেলে কিছু সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয়। দরিদ্র, অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে প্রাপ্ত অগ্রাধিকারগুলোর অবসান ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানতম ধাক্কাটি আসবে আমাদের রপ্তানি খাতে। দেশের মোট রপ্তানির অন্তত শতকরা ৭৩ ভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। পণ্যের মূল্য বিবেচনায় এর পরিমাণ হবে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অঙ্ক। তা ছাড়া ওষুধ খাতে কাঁচামাল ব্যবহারে কিছুটা জটিলতা দেখা দেবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সরকার ইতোমধ্যে ওষুধের কাঁচামাল তৈরির জন্য চট্টগ্রাম রোডের পাশে একটি এলাকা নির্ধারণ করে ২৪টি কোম্পানির অনুকূলে জমি বরাদ্দ করেছে। এখানে অবকাঠামো এবং ইটিপি নির্মাণের কাজ অদ্যাবধি শেষ হয়নি। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোলাবরেশন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ওষুধ ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের বেশ কটি প্রতিষ্ঠান বিদেশে ওষুধ রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ওষুধের কাঁচামাল রপ্তানির ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার বেলায় বিনা টাকায় ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করা যাবে না। এ খাতে বাংলাদেশকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হবে এবং আমাদের উৎপাদিত ওষুধগুলো বিশ্ববাজারে অধিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

তবে সব কথার শেষ কথা হচ্ছে, উন্নয়নের এই স্বীকৃতিকে টাকার অঙ্কে হিসাব করে মেলানো যাবে না। দেশ এগিয়েছে, উন্নয়নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ- সেটাই এখানে বড় কথা। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি বলে পরিচিত বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে শূন্য হাতে কাজ শুরু করেছিল, জাতির পিতা কেমন করে সেই ভগ্ন স্বাস্থ্যের অর্থনীতিতে জোড়াতালি দিয়ে চালানোর মতো দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন এবং তার মৃত্যুর আগেই অর্থনীতির ইতিবাচক মোড় ঘোরাতে সক্ষম হয়েছিলেন, সে কথা আমাদের জানা। সেই সূত্র ধরেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া শুরু। বাংলাদেশের অর্থনীতির উজ্জ্বল দিকটি হচ্ছে, এখানে অতি দরিদ্র বা হতদরিদ্র কেউ নেই। আমাদের অর্থনীতি দেশের সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। এই করোনাকালীন দুঃসময়ে সরকার সাহায্য, ভর্তুকি ও প্রণোদনার ঝাঁপি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। টিকা ব্যবস্থাপনায়ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ ও সফলতা ব্যাপক প্রশংসার দাবি রাখে। বিশ্বে অনেক ধনী দেশ আছে যাদের সম্পদের সিংহভাগ মুষ্টিমেয় ক’জন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। সেসব দেশে সাধারণ মানুষদের অনেকেই হতদরিদ্র। কিন্তু বাংলাদেশ এগোচ্ছে সবাইকে নিয়ে- এটা আমাদের গৌরবের আরও একটি বড় জায়গা। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে এখানে দারিদ্র্য দূর করার জন্য নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে- যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সীমারেখায় আবদ্ধ গৎবাঁধা অর্থনীতি নয়, এটি বৈচিত্র্যময় এবং গতিশীল অর্থনীতি। দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই গতিশীল অর্থনীতির সুবিধা সমাজের সব স্তরের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে; ভবিষ্যতেও অর্থনীতি এভাবেই এগিয়ে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. এবং প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement