advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অর্থনৈতিক উন্নয়নের আরেক মাইলফলক

চিররঞ্জন সরকার
২ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১ মার্চ ২০২১ ২৩:৩০
advertisement

খবরটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। স্বল্পোন্নত দেশের আত্মমর্যাদাহীন অবস্থা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পথে আমাদের দেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডিপি) গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে এই সুপারিশ করেছে। বর্তমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাবে। এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের কিছু বাণিজ্য ও অন্যান্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অনেক সম্ভাবনার দ্বারও খুলবে। বৈশ্বিক মহামারী, দেশে একের পর এক বরেণ্য ব্যক্তির মৃত্যু, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা ধরনের টানাপড়েন, রাজনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় একটি সুসংবাদ। এই মাইলফলক বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করবে, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-কে সমৃদ্ধ করবে। বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ পেল, যখন জাতীয়ভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, উন্নয়ন কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ তার সদস্য দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত (এলডিসি), উন্নয়নশীল এবং উন্নত- এ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)- এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কিনা, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদ- পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো মানদ-গুলো অর্জন করেছে। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে।

সিডিপি যে তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে, সেই তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেক এগিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮২৭ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে ৬৬ পয়েন্টের প্রয়োজন; বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ৭৫.৩। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোনো দেশের পয়েন্ট ৩২ বা এর নিচে আসার পর উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন হয়। সেখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ২৫ দশমিক ২।

পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে এসব মান অর্জন করায় বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বের হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে সিডিপি। এখন নিয়ম অনুযায়ী সিডিপির সুপারিশ প্রথমে জাতিসংঘের ইকোসকে যাবে। তিন বছর পর তা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য উঠবে। কিন্তু করোনার কারণে বাংলাদেশ বাড়তি আরও দুই বছর সময় পেয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ। রচিত হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক গৌরবময় সাফল্যগাথা।

এবার দেখা যাক এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে বাংলাদেশ কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে কিংবা কী ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে। প্রথমে সুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।

এলডিসি থেকে বের হলে প্রথমে যে সুবিধাটি হবে, তা হলো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। গরিব বা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা থেকে বের হয়ে একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশে উন্নীত হবে। পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বহির্প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি সুদে অনেক বেশি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। বেশি ঋণ নিতে পারলে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বেশি খরচ করতে পারবে বাংলাদেশ। আবার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষমতা থাকায় বিদেশি বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে। অবশ্য বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ পরিবেশ বড় ভূমিকা পালন করে। উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারাটাই এ ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে এলডিসি থেকে বের হলে কিছু সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাদ হয়ে যাবে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যাও দেখা দেবে। এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যা দেখা দেবে রপ্তানি খাতে। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা পায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তো আঞ্চলিক বা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতেও (যেমন ভারত, চীন) এই ধরনের শুল্কসুবিধা পেয়ে থাকে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে এসব বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নিয়মিত হারে শুল্ক বসবে। সম্প্রতি প্রকাশিত ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাড়তি শুল্কের কারণে রপ্তানি বছরে ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।

এ ছাড়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে বের হলে ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। এর কারণ, মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট) ওপর অর্থ দেওয়া হলে ওই ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে এলডিসির গরিব নাগরিকরা স্বল্পমূল্যে ওষুধ পাবে না। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এই সুবিধা বেশি পেয়েছে। বাংলাদেশ ওষুধশিল্প একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। ২০৩৩ সালের আগে যদি কোনো দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে ওষুধশিল্পের এই সুবিধা থাকবে না। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এই সুবিধা শেষ হয়ে যাবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেশি বলে ধরে নেওয়া হয়। তখন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশও এ ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। এ ছাড়া এলডিসি হিসেবে যে কোনো দেশ তার দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার ওপর নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশ এখন কৃষি ও শিল্প খাতের নানা পণ্য বা সেবায় ভর্তুকি দেয়। এসব ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার চাপ আসতে পারে। এমনকি বাংলাদেশ এখন যে রপ্তানি আয় বা রেমিট্যান্স আনায় নগদ সহায়তা দেয়, তা নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে।

এলডিসি থেকে বের হলে জাতিসংঘে চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশকে আগের চেয়ে বেশি খরচ করতে হবে। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সরকারি কর্মকর্তারা জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে সৌজন্য টিকিট পান। গরিব দেশের কর্মকর্তা হিসেবে এই টিকিট দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের পর এ ধরনের বিনা পয়সার টিকিট মিলবে না। আবার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের বৃত্তি দেয়। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে এ ধরনের বৃত্তির সংখ্যা কমে যাবে।

এলডিসি থেকে বের হওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে আরও পাঁচ বছর সময় পাবে। এই সময়টিকে প্রস্তুতিকাল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এলডিসি থেকে বের হলে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির ইতিবাচক সুবিধা ভোগ করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, চাল ও সারের দাম ছিল নিম্নমুখী। এতে আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কিছুটা নড়বড়ে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি এবং বিদেশে টাকা পাচার বাড়ছে। যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব গলদ দূর করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর্থিক বৈষম্য কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

একটি বাংলা প্রবচন আছে, ‘তোলা দুধে পোলা বাঁচে না।’ সাহায্য, ঋণ, খয়রাতিনির্ভর স্বল্পোন্নত দেশের তকমা কাটিয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়ে আত্মনির্ভর জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই। আর এজন্য প্রয়োজন চুরি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। প্রয়োজন দূরদর্শী ও ইতিবাচক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর নীতি। আর একই সঙ্গে এসব নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য চাই সোনার মানুষ। আছে কি সেই মানুষ? বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ কিন্তু ছিল সেখানেই!

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement