advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

গবেষণা সম্প্রসারণ সংযোগ কী ও কেন প্রয়োজন

এম আব্দুল মোমিন
২ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১ মার্চ ২০২১ ২৩:৩০
advertisement

আমরা যারা কৃষি সেক্টরে কাজ করি প্রায়ই একটি অভিযোগ শুনি, কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলো প্রতিবছর এত এত জাত-প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে কিন্তু সে তুলনায় মাঠে উন্নত জাত বা প্রযুক্তি সম্প্রসারণ হচ্ছে না অথবা সম্প্রসারণ হলেও তার হার আশানুরূপ নয়। তাই কৃষিবিষয়ক যে কোনো সভা-সেমিনার ও কর্মশালায় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি সম্প্রসারণে গবেষণা-সম্প্রসারণ লিংকেজ বা সংযোগ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। কাজের প্রয়োজনে আমি গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক আয়োজিত প্রায় দশটি আঞ্চলিক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করি। এর প্রায় প্রতিটিতেই কৃষক ও মাঠ পর্যায়ের সম্প্রসারণ কর্মীদের কাছ থেকে যে অভিযোগটি পাওয়া গেছে সেটি হলো নতুন জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গবেষণা-সম্প্রসারণ দুর্বল সংযোগ প্রধান সমস্যা।

এই সমস্যা নিয়ে আলোচনার আগে সংক্ষেপে গবেষণা-সম্প্রসারণ সংযোগ কী সেটি নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই। আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের (এনএআরএস) অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো বিভিন্ন ফসলের নতুন নতুন জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। তারা যেসব জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই জাত ও প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে বা মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে থাকে। এটিকে কেন্দ্র করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষকদের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক সেটিকেই গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক সংযোগ বলা যেতে পারে। এ কাজের প্রশাসনিক দিক তদারক করে স্বয়ং কৃষি মন্ত্রণালয় এবং গবেষণার বিষয়াদি সমন্বয় করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)।

এবার আসা যাক গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক সংযোগ কেন প্রয়োজন? আগেই বলেছি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও এর বিজ্ঞানীদের কাজ ফসলের নতুন জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। কিন্তু এগুলোর মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। আর এ কাজে বীজ, সার ও নানা উপকরণ সহায়তা প্রদান করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। মোটামুটি এটি হলো সরকারি সংস্থাগুলোর কাজের পরিধির সংক্ষিপ্ত একটি ধারণা। এর বাইরে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা এ কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নতুন জাত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি সংস্থা ও এর কর্মীদের সঙ্গে কৃষকের একটি শক্তিশালী ও দৃঢ় সংযোগ থাকা আবশ্যক। যাতে কৃষক যা চায় সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ে তা জোগান দিতে পারে।

অনুরূপভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারে মাঠ পর্যায়ে কৃষক যেসব সমস্যা বা অসুবিধার সম্মুখীন হন সেগুলো সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে গবেষণা সংস্থাগুলোতে পৌঁছানো হয় যাতে বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে সেগুলোর গ্রহণযোগ্য ও সাশ্রয়ী সমাধান বের করতে পারেন। এই প্রক্রিয়াটি যদি সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে কাজ করে তা হলে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই যে পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ বা সম্পর্ক এবং এর সঙ্গে জড়িত কোনো একটি একক বা পক্ষ যদি ঠিকমতো কাজ না করে তা হলে পুরো প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয় এবং কৃষি উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সংস্থা হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিস্তৃতি যেমন বেশি, তেমনি এই প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধিও ব্যাপক। কৃষিতে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষি বাজার সংযোগ, বাণিজ্যিক কৃষি জনপ্রিয়করণ, পরিবেশ সুরক্ষা, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ, ভ্যালু চেইন, সাপ্লাই চেইন ইত্যাদি সাম্প্রতিককালে কৃষি সম্প্রসারণের মূল কাজের মধ্যে পড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এসব বিষয়ে সম্প্রসারণ কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। এই সার্বিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু কৃষক এবং লক্ষ্য কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন। আর সেটি তখনই নিশ্চিত হবে যখন গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক সংযোগ দৃঢ় হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পর বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা পালনকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে বিএডিসির সেবার পরিধিও সমগ্র বাংলাদেশে বিস্তৃত। মাঠপর্যায়ে এর অফিসগুলোয় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও প্রত্যন্ত এলাকায় অফিসের সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। বিএডিসির মৌলিক কাজগুলো হচ্ছে সারাদেশে কৃষি উপকরণ উৎপাদন, সংগ্রহ (ক্রয়), পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনা টেকসই করা। বিশেষ করে অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণ যেমন- বীজ, সার সরবরাহ এবং ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকের জন্য সেচের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু নতুন জাত-প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিএডিসির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে চাহিদা তৈরি না হলে বিএডিসি নতুন কোনো জাতের বীজ উৎপাদনে আগ্রহী হয় না বা ঝুঁকি নিতে চায় না। এই মাঠ পর্যায়ে চাহিদা সৃষ্টি এই জায়গায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএডিসির একটি গ্যাপ রয়েছে যেটি সমাধান করা অতি জরুরি।

বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ, সময়, রুচি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নতুন নতুন জাতের অপশন তৈরি করা, সেগুলো আজই ব্যবহার হবে বিষয়টি এমন নয়, নিকট-ভবিষ্যতের কৃষিক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে সেটি বিবেচনায় নিয়ে জাত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করে যেতে হবে। পাশাপাশি নতুন জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের নতুন জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই কেবল কৃষিতে বর্তমানে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।

কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি এবং পিএইচডি ফেলো, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, শেকৃবি, ঢাকা

advertisement