advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ : এক নান্দনিক উপস্থাপনা

ড. আতিউর রহমান
৩ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২ মার্চ ২০২১ ২৩:১৫
advertisement

গত পর্বেই লিখেছি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নানা কারণেই অনন্য। অসাধারণ। শুধু একটি জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়, এর কাব্যময়তা, এর ভাষাভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা, অঙ্গুলি হেলন, রাজনীতির মহাকবির দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ঘাড় ফিরিয়ে জনতার দিকে ফিরে ফিরে তাকানোর ভঙ্গি, তার হুঙ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জনতার গর্জন, সমুদ্রে ঝড় ওঠার মতো ধীরে ধীরে একটি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া, আবার হঠাৎ করেই সামান্য বিরতি এবং ফের প্রশ্নের আকারে গর্জে ওঠা- সবকিছু মিলিয়ে ৭ মার্চের এই ভাষণ একটি মহাকাব্যিক রূপ নিয়েছে। আর সে কারণেই যার কণ্ঠ নিঃসৃত হয়ে এই কাব্যসুধা ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছে তিনি সুখ্যাতি পান রাজনীতির এক অমর কবি হিসেবে।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর মার্কিন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নিউজ উইক’-এর সংবাদদাতা লোরেন জেনকিনস তার প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বলে উল্লেখ করেন। পয়েট অব পলিটিক্স নামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ওই পত্রিকাটি একটি প্রচ্ছদও প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি এমন একটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে যে, ধরতে গেলে তার পুরো রাজনৈতিক জীবন একদিকে আর এই ভাষণটির মর্যাদা আরেক দিকে। ১৯ মিনিটের ভাষণটিতে মোট ১০১টি বাক্য আছে। ওই ভাষণে তিনি তুলে ধরেন ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস এবং একই সঙ্গে প্রকাশ করেন আগামী দিনের মুক্তির সনদ। ভাষণের মূল দিকগুলো ছিল- ১. সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা; ২. পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভূমিকা; ৩. সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি; ৪. অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলার আহ্বান জানানো; ৫. দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সার্বিক হরতালের সিদ্ধান্ত; ৬. নিগ্রহ ও আক্রমণ প্রতিরোধের আহ্বান ও স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করা; এবং ৭. আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি হিসেবে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ গড়ে তোলার আহ্বান।

পাকিস্তান সরকার ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ভাষণটি প্রচার করার অনুমতি দেয়নি। সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র করপোরেশনের চেয়ারম্যান এএইচএম সালাহউদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক একই সঙ্গে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার পাঁচ আসনের সংসদ সদস্য এম আবুল খায়ের ভাষণটি ধারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাদের এ কাজে সাহায্য করেন তৎকালীন চলচ্চিত্র বিভাগের চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা আবুল খায়ের, যিনি ভাষণের ভিডিও ধারণ করেন। তাদের সঙ্গে তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রযুক্তিবিদ এইচএন খোন্দকার ভাষণের অডিও রেকর্ড করেন।

অডিও রেকর্ডটি এম আবুল খায়েরের মালিকানাধীন রেকর্ড লেভেল ঢাকা রেকর্ডে বিকশিত এবং আর্কাইভ করা হয়। পরে, অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের একটি অনুলিপি শেখ মুজিবকে হস্তান্তর করা হয় এবং অডিওর একটি অনুলিপি ভারতে পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে অডিওর ৩,০০০ অনুলিপি করে তা সারাবিশ্বে ভারতীয় রেকর্ড লেভেল এইচএমভি রেকর্ডস দ্বারা বিতরণ করা হয়।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইতিহাসবিদ ড. জ্যাকব এফ. ফিল্ড কর্তৃক সম্পাদিত এবং লন্ডনের মাইকে ও’মারা বুকস লিমিটেডের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে বের হয়েছে ‘ডব ংযধষষ ভরমযঃ ড়হ ঃযব ইবধপযবং: ঞযব ঝঢ়ববপযবং ঃযধঃ ওহংঢ়রৎবফ ঐরংঃড়ৎু’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশনা। বইটিতে সংকলিত আড়াই হাজার বছরের ৪১টি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের একটি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে ‘রাজনীতির মহাকাব্য’ শিরোনামে একটি অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। দেশের বরেণ্য ২৬ জন ব্যক্তি সেখানে ৭ মার্চের ভাষণের বহুমাত্রিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন। আমার সৌভাগ্য সেখানে আমারও একটি লেখা আছে। বইটির মুখবন্ধ রচনা করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জননেত্রী শেখ হাসিনা তার মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে।’ (‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : রাজনীতির মহাকাব্য’, সম্পাদক : অজিত কুমার সরকার, প্রকাশনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, মুখবন্ধ, পৃষ্ঠা-৮)।

এই বইয়ের শুরুতেই যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে পুরো ভাষণটির বাংলা লিখিত রূপ এবং তার ইংরেজি অনুবাদ। তবে লিখিত রূপের চেয়ে এ ভাষণের আশ্চর্য জাদুকরী শক্তি প্রকাশ পেয়েছে তার অডিও ও ভিডিও ভার্সনে। এই ঐতিহাসিক ভাষণটি যে জীবনে একবারও ভিডিও চিত্রে প্রত্যক্ষ করেনি সে অবশ্যই এর পূর্ণাঙ্গ মহিমা থেকে বঞ্চিত। মাঠভর্তি দর্শক অধীর আগ্রহে বসে আছেন। অধীর অপেক্ষার সেই বিষয়টি ধরা পড়েছে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার ভাষায়, ‘কখন আসবেন কবি!’ অবশেষে তিনি এলেন। পুরনো ব্যক্তিগত টয়োটা গাড়িতে চড়ে মঞ্চের কাছে এসে নামলেন। পুরো রেসকোর্স কাঁপিয়ে তখন স্লোগান উঠল, ‘শেখ মুজিবের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে উঠলেন। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে ওঠামাত্রই কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা-নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে বজ্রমুষ্টি তুলে স্লোগান দিল, ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’ তাদের অনেকের হাতেই বাঁশের লাঠি। বঙ্গবন্ধু মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানালেন। করতালির মধ্য দিয়ে লাখ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানাল। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যখন প্রথম উচ্চারণ করলেন, ‘ভায়েরা আমার’, পুরো ময়দান তখন শান্ত। জনতা রুদ্ধশ^াসে বসে আছেন এর পর তিনি কী বলেন তা শোনার জন্য। হাত দুটো পেছনে নিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ভরাট স্বরে তিনি শুরু করলেন তার অমর কবিতাপাঠ, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’

প্রথম পাঁচটি বাক্যেই তিনি পুরো ভাষণের সারমর্ম তুলে ধরলেন। তার পর হাত দুটো পেছনে বেঁধে রেখেই সিংহের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো ময়দানের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে লাগলেন ২৩ বছরের দুঃশাসনের কথা। কী অসামান্য তার আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস! ভাষণের মাঝামাঝি গিয়ে ‘রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই’ বলে প্রথমবার পেছনের হাতের বাঁধন খুললেন। ডান হাতটা তুললেন। তর্জনী ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমি দশ তারিখে, বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করত পারে না।’

তার পর সেই আঙুল আর নামল না। বারবার তা উঠে যেতে লাগল আকাশের দিকে, যেন তিনি হুকুম দিচ্ছেন। থেমে থেমে প্রতিটি বাক্য উচ্চারণ করলেন অমোঘ নির্দেশনার মতো, ‘অ্যাসেম্বলি কল করেছেন আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন মার্শাল ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তার পর বিবেচনা করে দেখব আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারব কী পারব না।’ তিনি যখন তর্জনী নাড়িয়ে গর্জন করে উঠলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেদিনই সেই তর্জনী বাংলার স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ শিরোনামে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে। বইটি সম্পাদনা করেছেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। আগের বইটির চেয়ে এ বইটির গুরুত্ব ভিন্ন জায়গায়। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে ২০০৪ সাল থেকে প্রতিবছর মার্চ মাসের প্রথমার্ধে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ওপর সেমিনার আয়োজন করা হচ্ছে। এই সেমিনারে প্রতিবছর একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ লিখিতভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেই প্রবন্ধের ওপর দু-তিনজন আলোচক লিখিত বা মৌখিকভাবে তাদের বক্তব্য পেশ করে থাকেন। সেমিনারগুলোয় সভাপতিত্ব করেছেন ট্রাস্টের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ পর্যন্ত মোট ১৪টি সেমিনারে ১৪টি মূল প্রবন্ধ পঠিত হয়েছে। সেসব প্রবন্ধ, সভাপতির ভাষণ, স্বাগত বক্তব্য ও আলোচকদের আলোচনা নিয়ে এই বই।

২০০৪ সালের ৪ মার্চ প্রথম সেমিনারে প্রথম প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ : একটি অনুপুঙ্খ পাঠ’ শিরোনামের আলোচনায় তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্লেষণ করে দেখান। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ইতিহাসে অনন্য ভাষণটি অধিকারবঞ্চিত বাঙালির শত সহস্র বছরের সংগুপ্ত আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের উচ্চারণে সমৃদ্ধ।... ভাষণের মূল কথা যদি খুঁজি তা হলে দেখা যায়, পূর্ববাংলার মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস ও অধিকারহীনতার বিষয় এতে দীপ্র হয়ে উঠেছে; এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে বাঙালির সার্বিক মুক্তি সম্ভব- এই বক্তব্যই বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতাশৈলীর অতুলনীয় ভঙ্গিতে কখনো আবেগ, কখনো যুক্তি, কখনো প্রশ্ন বা ইচ্ছাকৃত জোরালো পুনরুক্তির মাধ্যমে সোচ্চার করে তুলেছেন; কিংবা বিশেষ স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই কৌশলময় ভাষা বা ইঙ্গিতে শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন।’

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের ওপর বিভিন্ন জনের প্রকাশিত লেখাগুলোর একটি সংকলনের কাজ শুরু করেছিলেন প্রয়াত নাট্যজন অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমেদ। আমি এবং তার ভাগ্নে শাহরিয়ার মাহমুদ প্রিন্স তাকে সহায়তা করছিলাম। আমাদের তিনজনের সম্পাদনায় ‘মেঘনাদ কণ্ঠ’ নামের ওই সংকলনটি শিগগির প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ওই সংকলনে অনেকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার স্মৃতিচারণও স্থান পাবে। তাদের লেখার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করেই শেষ করছি এই পর্ব। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা লিখেছেন, ‘৭ মার্চের সকাল থেকে আমাদের বাড়ির সবাই খুব টেনশনে। কোথায় কোন ঘটনা ঘটছে মানুষ মারা যাচ্ছে, খবর আসছে। আব্বাও প্রতিদিনের মতো সকালে উঠেছেন, চা খেয়েছেন, খবরের কাগজ পড়েছেন দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে বেশ খুঁটিয়ে। সেদিন বেশ ধীর-শান্ত, অথচ দৃঢ় একটা কাঠিন্য ছিল তার চেহারায়। বেশ চিন্তমগ্ন ছিলেন।’ মাকে উদ্ধৃত করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘তুমি নিজে যেটা ভালো মনে করবে সেই কথাই আজ বলবে। কারও পরামর্শে কিছু বলবে না। মনে রেখো মানুষ আজ অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। তাদের তুমি নিরাশ করো না।’ তাদের তিনি নিরাশ করেননি। ‘বাংলাদেশের মানুষের মনের কথা আজ তিনিই উচ্চারণ করলেন’- এ কথা বলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ শুনে যে তার মাও বেশ খুশি হয়েছিলেন সে কথাটিও বলতে ভোলেননি। শেখ রেহানা তাই লিখতে পেরেছেন, ‘আমার মায়ের মুখেও হাসি দেখেছিলাম-¯িœগ্ধতার শুভ্রতারা।’ অন্যদিকে ‘ভায়েরা আমার’ শিরোনামে নিবন্ধটি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। তার নিজের কথায়, ‘চোখের চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে তিনি ভাষণটি দিলেন, ঠিক যে কথা তার মনে এসেছিল, সে কথাগুলোই তিনি বলেছিলেন। বাংলার মানুষের মনে প্রতিটি কথা গেঁথে গিয়েছিল। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বুকে ধারণ করে তিনি যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার দেশের মুক্তিকামী মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বিজয় অর্জন করেছিল।’ এভাবেই একটি ভাষণ একটি জাতির অভ্যুদয়ের আগাম বার্তা দিয়েছিল। আর কল্যাণ ও ন্যায্যতার অঙ্গীকার ঘোষণার নান্দনিক উপস্থাপনা হতে পেরেছিল। (চলবে)

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

advertisement