advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

চাকায় পিষ্ট প্রাণ, ধুঁকছে স্বজন

বিশ্বজিত রায়
৩ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২ মার্চ ২০২১ ২৩:১৫
advertisement

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ফের লিখতে হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় গত শুক্রবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসক, বাসচালক, ব্যবসায়ী, কলেজছাত্রসহ ৩১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষে আটজন, ঝিনাইদহে তিন মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তিনজন, বগুড়ায় ট্রাকের ধাক্কায় বাসের নিচে চাপা পড়ে সিএনজিচালকসহ তিন যাত্রী এবং দুপচাঁচিয়ায় ট্রাকের ধাক্কায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকসহ দুজন, বরিশালে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক, ময়মনসিংহে ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুই বন্ধু, খুলনায় ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক, চট্টগ্রামে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধ, কক্সবাজারে দুজন, কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রেনের ধাক্কায় তিনজন, হবিগঞ্জে বাসচাপায় ইজিবাইকচালক এবং সুনামগঞ্জে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পথচারী নিহত হয়েছেন। এই হতাহতের ঘটনা নিত্য চলমান।

গত ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর একটি দুর্ঘটনা আমায় ব্যাপকভাবে তাড়িত করে। যদিও সব মৃত্যু বেদনাদায়ক। ওইদিন রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে আজমেরী পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হয়েছিলেন আকাশ ইকবাল ও হাজারিকা মিতু দম্পতি। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান তারা। বেঁচে থাকে বাসায় রেখে যাওয়া তাদের একমাত্র শিশুকন্যা আফরা আনজুম। মর্মান্তিক এই সংবাদ ও সংবাদে প্রকাশিত রঙিন ছবিটি মারাত্মক বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা-বাবার কোলে সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশু আনজুমের নিষ্পাপ চেহারাটুকু আমার তিন বছরের কন্যার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কলিজার টুকরো মেয়ে যখন বায়না ধরে ‘আমার বাবা আসছে না কেন, বাবা কখন আসবে’ তখন তার মা ফোন ধরিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে দিয়ে শান্ত করে তাকে। আমার প্রাণপ্রিয় মেয়ের মতো আনজুম যখন বায়না ধরবে মায়ের জন্য, বাবার জন্য তখন কার সাধ্য আছে সেই আবদার পূরণ করার।

অবুঝ এই শিশুটি জানে না, তার মা-বাবার জীবনযাত্রা যে চিরতরে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মায়ের কোল, বাবার ছায়াতলেই যে শিশুটির আপন ঠিকানা, সেই স্নেহপূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়স্থলটি রাষ্ট্রযন্ত্রের অনিয়মতান্ত্রিক বেপরোয়া চাকায় পিষ্ট করে মেরে ফেলা হয়েছে। নিজের কন্যাকে কোলে নিয়ে আনজুমের কান্না যেন শুনতে পাচ্ছি। মা-বাবাকে ডেকে হাউমাউ করে কাঁদছে সে। যদি আমার বেলায় কখনো এ রকম হয়, তবে আমার অতি আদরের মেয়েটাও যে ছোট্ট আনজুমের মতোই কেঁদে ফিরবে সারাক্ষণ। তাই আনজুমের কান্না খুব কষ্ট দিচ্ছে আমায়। জানি না এ কান্না রাষ্ট্র শুনতে পাচ্ছে কিনা। হয়তো ছোট্ট আনজুমের কান্না শুনতে পারছে না রাষ্ট্র। কান্নায় কান্নায় আপনজনহারাদের চোখের জল শুকিয়ে গেলেও রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে উদাসীন।

অদক্ষ ও বেপরোয়া চালকদের চাকায় প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো মানুষ পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। যার যাচ্ছে সেই বুঝতে পারছে এর বেদনা কতটা কঠিন, কতটা নিষ্ঠুর। এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রটা যখন রাজধানীকেন্দ্রিক হয় তখন জানাজানিটা একটু বেশি হয়। এ ছাড়া দেশব্যাপী যত দুর্ঘটনা ঘটছে তার খবর এতটা ফলাও করে প্রকাশ হয় না। এর দায়ভারও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থার ওপর তেমন বর্তায় না। শুধু স্বজনহারা অভাগা মানুষরাই এর কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করে ফেরে। ছোট্টবয়সী শিশু আফরা আনজুম যেন তার বড় উদাহরণ। জীবন শুরুর আগেই অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়া এই শিশুটি বড় হয়ে যখন বিস্তর জানতে পারবে তার মা-বাবার করুণ পরিণতির কথা, তখন জন্মদাতা-জন্মধাত্রীর আপন চেহারাটুকু হয়তো নিজের স্মৃতি থেকে হারিয়ে ফেলবে সে। কিন্তু দুঃখভারী বেদনার বোঝাটা কী সে সরাতে পারবে নিজ বোধশক্তি থেকে। বরং দুঃখটা ভারী থেকে আরও ভারী হয়ে চেপে বসবে তার ওপর। তখন মা-বাবার অভাববোধ সইতে না পেরে সে যদি প্রশ্ন করে- যে রাষ্ট্র আমার মা-বাবার চলার পথ নিরাপদ করতে পারেনি এ কোনো রাষ্ট্রে জন্ম নিয়েছি আমি? জন্ম নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে কেন অনাথ আশ্রমে ঠেলে দেওয়া হলো? অবুঝ বয়সেই আমি কেন এতিম হলাম? কোনো উত্তর কী আছে এর। জানি, কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির মিথ্যা গল্প শোনানো সম্ভব। ঘটনা-পরবর্তী কখনো উ™ূ¢ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি আসে। সেই ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতির নড়চড় না হলেও তরতাজা প্রাণ ক্ষয়ের ধারাবাহিকতা ঠিকই চলতে থাকে। যার ফলে আনজুমের এতিম হওয়া। আবার কখনো কোনো শিশু আনজমুকেও জীবন দিতে হচ্ছে।

অপ্রতিরোধ্য সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে উঠে আসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের হিসাব। তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, বিদায়ী বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৮৬ জন। আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০ জন। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেলে সড়ক দুর্ঘটনা ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর সারাদেশে ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হন ৬ হাজার ৬৮৬ জন। তাদের মধ্যে চালকের সংখ্যা ২ হাজার ৩৯ জন, ১ হাজার ৫৯৪ জন পথচারী, ৭৫৭ জন পরিবহন শ্রমিক, ৭০৬ জন ছাত্রছাত্রী, ১০৪ জন শিক্ষক, ২০০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ৯১৮ জন নারী, ৫৪১ জন শিশু, ২৯ জন সাংবাদিক, ২৭ জন চিকিৎসক, ৮ জন আইনজীবী ও ৫ জন প্রকৌশলী। এ ছাড়া ১৪৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীও নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে সংগঠনটি বলছে, গত বছর যত সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে, এর মধ্যে ৫২ দশমিক ৯৬ শতাংশ গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। এ ছাড়া ২২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ শতাংশ যানবাহন খাদে পড়ে দুর্ঘটনাকবলিত। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে সংগঠিত হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বেপরোয়া গতি, মুঠোফোনে কথা বলসহ অনেক চালকের মাদক সেবনও দায়ী বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। [সূত্র : প্রথম আলো, ০৯.০১.২০২১]

বিগত কদিনের হিসাব যদি কষি তা হলে দেখা যায়, ২১ জানুয়ারি পাবনায় সড়কের পাশে থাকা বসতঘরে মালবাহী ট্রাক উঠে গেলে ঘুমন্ত অবস্থায় চাপা পড়ে লিটন সরকার (৩২) নামে এক যুবক নিহত হয়। ৩১ জানুয়ারি লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কে ছেলের সামনে বেপরোয়া বাস কেড়ে নেয় মা আয়েশা বেগমের প্রাণ। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে আহত হয়। একইদিনে শেরপুর সদর উপজেলার ঝিনাইগাতী-শেরপুর সড়কে ট্রাকচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পাঁচ যাত্রী, কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বালুবোঝাই ট্রাক্টরের ধাক্কায় নুরজাহান নামে এক নারী, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর-চাঁদপুর সড়কে সিএনজির সঙ্গে দ্রুতগামী ট্রাকের সংঘর্ষে জাহাঙ্গীর হোসেন, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মালবাহী পিকআপ ভ্যানচাপায় অটোরিকশার যাত্রী মনোয়ারা বেগম ও চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার রাহাত্তারপুল এলাকায় ট্রাকচাপায় ইমতিয়াজুল ইসলাম নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়। এর আগের দিন চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে যাত্রীবাহী পদ্মা এক্সপ্রেস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মো. আহসান হাবীব ফরিদ নামে এক স্কুলশিক্ষক নিহত হন। এ ছাড়া ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বাসের ধাক্কায় জুয়েল রায় নামে এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। এভাবে একের পর এক মহামূল্যবান জীবন থেমে যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে।

অনিয়ন্ত্রিত এই অঘটনের কারণ বিভিন্ন মাধ্যম কর্তৃক উঠে এলেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে তার গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে পারছে না রাষ্ট্র। তাই প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনার খবর পত্রিকান্তরে ছাপা হচ্ছে। খবরে বর্ণিত দুর্ঘটনার দুর্বিষহ বাস্তবতা অনুধাবন করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হচ্ছে সবাইকে। আর যারা প্রিয়জন হারিয়ে দুঃখে দেয়ালে কপাল ঠুকছেন তাদের খবর কি কেউ রাখছে। না, সে খবর রাখার সময় ও মনমানসিকতা কারও নেই। শুধু স্বজনহারা পরিবার কিংবা প্রিয়জনশূন্য ব্যক্তিই সে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ।

কার অবহেলায় এসব হচ্ছে? যাদের হাত ধরে মানুষ মারার গ্যারান্টি নিয়ে ওরা সড়কে নামছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না রাষ্ট্র। যার ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে সড়কে। আর স্বজনহারা কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস। সড়কে ঝরা তরতাজা রক্ত দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে। তবু টনক নড়ছে না কারও। শুধু দুর্ঘটনার প্রতিবাদে মানুষ জেগে উঠলেই নড়েচড়ে ওঠে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল চেয়ার। যখন মানুষ সড়কে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী লেখায় জানিয়ে দেয়- ‘এদিকে সড়ক বন্ধ। রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে।’ তখন ঘোষণা আসে কিছু করার। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর আবার স্তব্ধ হয়ে পড়ে সবকিছু। সড়কে ফের স্বরূপে ফিরে আসে প্রাণসংহারী সেই দানব। এই অনিয়ন্ত্রিত দানব কর্তৃক সড়কে চলাচলরত যে কেউ যে কোনো সময় জীবনবিনাশী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারেন। সড়কে জীবন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে- কবে নিরাপদ হবে আমাদের চলার পথ।

বিশ্বজিত রায় : প্রাবন্ধিক

advertisement