advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

উন্নয়নশীল দেশে বিবেকের শুদ্ধতা প্রয়োজন

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
৪ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৩ মার্চ ২০২১ ২৩:২২
advertisement

এটি খুব আনন্দের কথা যে, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিপিডি) বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) অবস্থান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। একটি দেশের জন্য এমন অবস্থান পরিবর্তন বেশ সম্মানের। আর আমাদের উন্নয়নের সার্বিক সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও বটে। উন্নয়নশীল দেশের সারিতে দাঁড়ানো খুব সরল পথে হয় না। রীতিমতো অনেকগুলো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী এই সম্মানে পৌঁছতে হলে তিনটি মানদ- অর্জন করতে হয়। এখানে হিসাব করতে হয় দেশবাসীর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিমাপ, দেশের মানবসম্পদের কতটা উন্নয়ন হলো আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা থেকে কতটা দৃঢ়তায় বেরোতে পারল। এসব বিচারে জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উন্নয়নের মানদ- পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ পায়।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পরপর দুবার উল্লিখিত তিনটি মানদ-ের সবটুকু পূরণ করেছে। তবে এখনই আমাদের দেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে পড়বে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশের এই সাফল্য যেমন বিশ্ববাসীর সামনে আমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবে, একই সঙ্গে উন্নয়নের ধারাও আরও গতি পাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি আস্থা পাবে। এতে তৈরি হবে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পথ। তবে একই সঙ্গে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, নানা পণ্যে আমদানি শুল্ক আরোপসহ আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে এক্ষুণি তা করতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষিত হলে পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাবে। ২০২৯-এর পর বাংলাদেশের সুযোগ এবং চেষ্টা থাকবে আরও বারো বছর অর্থাৎ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এসব সুবিধা অব্যাহত রাখার।

এসব নিয়মকানুন ও রক্ষাকবচ থাকায় বাংলাদেশ যে সময় পাচ্ছে তাকে কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ প্রস্তুতি রাখতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। একই সঙ্গে চেষ্টা চালাতে হবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য। এটি ঠিক, আমরা মুখে মুখে অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ বলে আসছি। এটি হয়তো আমাদের মনের আকাক্সক্ষারই বহির্প্রকাশ ছিল।

প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যেভাবে বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন তা জাতি সকৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য দিক মনে রাখতে হবে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দরিদ্র দেশটিকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করেছিলেন তিনি। এর পর অনেক সরকারই তাদের সময়কাল অতিক্রম করেছে। কিন্তু এমন কোনো শুভ সংবাদ নিয়ে আসতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের পথযাত্রা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর মতো আমরাও স্বপ্ন দেখি উন্নত দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার।

বলা হয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি কঠিন। তেমনি আমাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ উন্নয়নশীল দেশে পৌঁছে এই মর্যাদাকে ধরে রাখতে পারি কিনা। আসলে আমাদের আশঙ্কা এ পথপরিক্রমণে আমাদের বড় বাধা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি। আমাদের রাজনৈতিক সরকারগুলো যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হতো তবে দুর্নীতির হার কমিয়ে আনা যেত। দলীয় শৃঙ্খলাই কি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ধরে রাখতে পারছে?

আওয়ামী লীগ সরকারের অনেকটা কৃতিত্ব এই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় দেশকে নিয়ে আসায়। অথচ এমন একটি ঐতিহ্যবাহী দলের পরিচালকরা শৃঙ্খলার ভেতরে দলকে নিয়ে আসতে পারলেন না। এই দলের পক্ষেই সম্ভব ছিল কঠিন দলতন্ত্রে নিজেদের বন্দি না রেখে অভিন্ন সাধারণ আদর্শ ধারণ করা সৎ দেশপ্রমিক মেধাবী মানুষদের বন্ধু বানানো। আমাদের লেখায় এ কথা আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলাম। আমরা বিশ্বাস করি, ‘একান্ত অনুগত’দের দিয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যদি দলে এবং দলের বাইরেও সৎ মেধাবী মানুষদের সমাহার ঘটানো যেত তা হলে আজ স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয় পেয়ে এভাবে ধর্ষক-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে পড়ত না দেশটি। এজন্য প্রয়োজন উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। আজ আমলা যদি জানে ক্ষমতায় বারবার ফিরে আসতে হলে তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে সরকার আর সরকারি দলকে, পুলিশ যদি জানে তাদের রয়েছে নির্বাচনী লাঠিয়ালের দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা এবং স্থানীয় নেতা জানেন পেশিশক্তি হিসেবে মাস্তান ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়া আছে তাদের হাতে- তা হলে বুনো মোষের উল্টোগুঁতো খেতেই হবে।

উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠা দেশকে নিয়ে আমরা যখন গর্ব করছি, এর রূপকার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনেক ভরসা রাখছি, তখনই কালিমার ছিটা পড়ছে সর্বত্র। এতে সমাজ কাঠামোর গাঁথুনিও হয়ে যাচ্ছে নড়বড়ে। এর বিরূপ প্রভাব আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে অনেককাল। শক্তির দাপটে আমরা অনেক কিছু বুঝতে চাই না। কিন্তু মানতে হবে সাধারণ মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নিলে অনেক কিছুই হারাতে হবে।

নৈতিকতা মুখ থুবড়ে পড়ছে না কোথায়? সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে আইন আদালত কোথাও কি আস্থা রাখতে পারছে? প্রতিকারের জন্য আজকাল থানায় যাওয়ার ভরসা পায় না সাধারণ মানুষ। প্রায়ই পত্রিকায় বেরোচ্ছে পুলিশ দ্বারা হয়রানির কথা। এখানে নাকি নানা ধরনের বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। বিচিত্র সব নামও আছে। পুলিশে যোগদানের আগে আছে নিয়োগ-বাণিজ্য। পুলিশ হওয়ার পর আছে গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, রিমান্ড-বাণিজ্য, থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা বাণিজ্য- এমন সব নানা ধারার বাণিজ্য। আদালত নিয়ে বাণিজ্যের কথা ভুক্তভোগীরা বলেন। জামিন-বাণিজ্য, সাজা কমবেশি-বাণিজ্য ইত্যাদি কথাও এখন প্রকাশ্যে বলা হয়। মাঝে মাঝে বিচারক-বিচারপতিদের দুর্নীতির খতিয়ানও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

আগেও ছিল, এখন একটু বেশি করে পত্রিকায় আসছে দেশের বড় আমলাদের কথা। নিজেদের হাতে ক্ষমতা থাকায় প্রায়ই নিজেদের নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য আমলাতন্ত্রের এটি পুরনো অভ্যাস। নৈতিকতার প্রশ্ন যদি সামনে থাকত তা হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে রাষ্ট্রের সব পেশাজীবীর সঙ্গে একটি ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি কাজ করত। আর সরকার যখন নানা কারণে আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, দেশে বড় কোনো নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আমলাতন্ত্র নিজেদের সুবিধা আদায়ে সরকারকে অনেকটা বাধ্য করে। এভাবে ‘নির্বাচনের প্রয়োজনে’ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে!

অনৈতিকতা, অসাধুতা আর দুর্নীতি সব যুগেই ছিল আর ধারণা করছি থাকবেও। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর রাশ কতটা টেনে রাখা যায়। এই রাশ টানার সঙ্গে রাজনৈতিক শুদ্ধতার প্রশ্নটিই সবচেয়ে জরুরি। সামরিক শাসন না হলে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক দল আর রাজনীতিকরাই থাকেন। সেখানে যদি নৈতিকতার স্খলন ঘটে তবে প্রশ্রয় পাবে সব ক্ষেত্র। এ দেশের বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা লোভী হয়ে পড়বে। দুর্বৃত্ত আচরণ করবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে না হাঁটতে পারলে নৈতিকতার স্খলন ঘটবে। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়বে প্রশাসনে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইন-আদালত কেউ নষ্ট ভাইরাসমুক্ত হতে পারবে না।

তা হলে এতসব নৈরাজ্য বজায় রেখে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় পৌঁছা বাংলাদেশে প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করবে কেমন করে। অনন্যোপায় আমরা। বিশ্বাস করতে ভরসা পাই না রাজনৈতিক শুদ্ধতায় সহজে ফিরতে পারবে এ দেশ। তাই প্রয়োজন মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগ্রত হওয়া। বিবেকের শুদ্ধতা ছাড়া সুন্দরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

উন্নয়নের পথ ধরে দেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় পা রাখতে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার। সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই শুদ্ধাচারের সুবাতাস বয়ে যাওয়া প্রয়োজন। গৎবাঁধা বন্ধ্যত্ব থেকে বেরিয়ে চিন্তা-চেতনায় আমাদেরও ‘উন্নয়নশীল’ হতে হবে। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত লাভ-লোভ থেকে নিজেদের মুক্ত করে দেশোন্নয়নের পথে নিজেদের যদি এক-একজন কর্মী বিবেচনা করতে পারি তবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ায় আমরা যেসব অর্থনৈতিক সুবিধা বঞ্চিত হবো একে কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন হবে না। বরং দুর্নীতি আর দুষ্ট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে সরকার পক্ষকেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সুফল পাওয়ার জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ই মনোযোগী হতে হবে। এমনটি করতে পারলে উন্নত দেশে পৌঁছার স্বপ্ন অধরা থাকবে না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement