advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

উন্নয়নের নতুন মাইলফলক

শফিকুল ইসলাম
৪ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৩ মার্চ ২০২১ ২৩:২২
advertisement

করোনা পরিস্থিতিতে আমরা নতুন এক অর্জন পেলাম। তা হলো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার সুপারিশ। এতে আমাদের ১৯৭১ সালের কথা মনে পড়ে, তখন কী অবস্থা ছিল! আজ আমরা ধারাবাহিক উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছি। তা গত ১০ বছরের উন্নয়নের ফসল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেললাইন নির্মাণ দিয়ে বোঝা যায় আমরা কতদূর এগিয়ে যাচ্ছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ তার কথাই আজ সত্যি প্রমাণিত হলো। কেউ বাঙালি জাতিকে দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমরা আগামী ২০-২৫ বছরে বাংলাদেশ উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারব।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত শুক্রবার বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে। এর অর্থ, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হবে। প্রধানমন্ত্রী স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণের কৃতিত্ব জনগণকে দিয়েছেন।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে ইনশাআল্লাহ। এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে উৎসর্গ করবে বলে বিশ্বাস করি, আমাদের সম্মিলিত চেষ্টায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। জাতির জন্য এটা অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। এই উত্তরণ এমন এক সময়ে ঘটল- যখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি এবং আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময়।

বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করে। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশ উল্টোপথে যাত্রা করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আবার উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। এক যুগ আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। বদলে যাওয়া এই দেশকে বুঝতে আর্থিক ও উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য যে তিনটি সূচককে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমরা এর সব সূচকে মানদ- অতিক্রম করায় আজকের এই অবস্থা।

উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও উন্নয়ন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক ও আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ চলমান। তা এই অর্জন পেতে কাজ করছে। বাংলাদেশ এখন পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে নিজস্ব অর্থায়নে। আমরা দারিদ্র্য বিমোচন করেছি উল্লেখযোগ্য হারে। মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিক্ষায় যথেষ্ট উন্নতি সাধন হয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমেছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র। তাই এত অর্জনের পর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ বানিয়ে দিচ্ছে না জাতিসংঘ, বরং এ অর্জন আমাদের।

জাতিসংঘ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে। এর আগে ২০১৮ সালে এই জাতীয় ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে তা ২ বছর পিছিয়ে ২০২৬ সাল করা হয়েছে। লাওস ও মিয়ানমারও এ যোগ্যতা অর্জন করেছে। মিয়ানমারের জন্য সুপারিশ করা হলে পরে তা স্থগিত রাখা হয়েছে সামরিক শাসনজনিত অনিশ্চয়তা বিবেচনায়। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছিল- বাংলাদেশ, লাওস ও মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে। তবে এটি আরও কয়েক বছর দ্বিতীয় দফায় শর্ত পূরণ করতে পারলে চূড়ান্তভাবে এলডিসি তালিকা থেকে এ দেশগুলো বের হতে পারবে।

বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হলো এক. নিম্ন-আয়ভুক্ত দেশ (মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত), দুই. নিম্ন-মধ্যম আয়ভুক্ত দেশ (১ হাজার ২৬ থেকে ৪ হাজার ৩৫ ডলার) ও তিন. উচ্চ-মধ্যম আয় (৪ হাজার ৩৬ থেকে ১২ হাজার ৪৭৫ ডলার)। উচ্চআয়ভুক্ত দেশ ১২ হাজার ৪৭৬ মার্কিন ডলারের বেশি। বাংলাদেশ এখন দুই নম্বরে রয়েছে। এই অর্জনের ফলে বাংলাদেশের জন্য কিছু সমস্যা সৃষ্টি হবে। যেমন- নিম্ন-আয়ভুক্ত দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিশেষ সুবিধা আর পাবে না। এ ছাড়া স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার বিবেচনার মধ্যেও বাংলাদেশ আর থাকতে পারবে না এবং অন্যান্য দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির পরিমাণ কমে যাবে। আরও বৈদেশিক সাহায্য কমে যাবে বাংলাদেশের জন্য।

উন্নয়নশীল দেশের ইতিহাসে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যে, সব সূচকে সক্ষমতা অর্জন করে এই ধরনের বড় প্রাপ্তি আমরা অর্জন করেছি। বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাই এটি একটি ভালো দিক যে, এই ধারা ধরে রাখতে হলে আরও উন্নয়ন করতে ও দুর্নীতি কমাতে হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নদীনালা, খালবিল, বন দখল ও ধ্বংসের পরিমাণ কমাতে হবে, দুর্নীতি এবং অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি কমাতে হবে ও চোরাই অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সন্ত্রাসী এবং দুর্নীতিমূলক তৎপরতার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের আরও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান হচ্ছে দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকদের আয়। এ ছাড়া রয়েছে কৃষি। অথচ এই তিন ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষের আয় এবং জীবনের নিরাপত্তা- দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত। উন্নয়নের রঙিন প্রচারণায় ঢাকা পড়ে যায় তাদের কথা। তাদের নিশ্চিয়তা দিতে হবে- যাতে তারা কর্ম ও জীবিকা ভালোভাবে চালাতে পারেন।

যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সূচক তিনটি। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচকে আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি। এটি ভবিষ্যতে ধরে রাখতে হলে আমাদের টেকসই উন্নয়নে ব্যাপক গুরুত্ব দিতে হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে পাঁচ বছর পর এলডিসি থেকে বের হয়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যাবে। এটি আমাদের জন্য বড় সুসংবাদ। বর্তমানে ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশ আছে। এ পর্যন্ত মালদ্বীপ, বতসোয়ানা, গিনি, সামোয়া কেইপ ও ভারত- এই পাঁচ দেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে আসছে। তবে আমার বিশ্বাস, আমরাও পারব।

এলডিসি থেকে বের হতে সিডিপির পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি পেতে হয়। স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রস্তুতির জন্য সাধারণত তিন বছর এলডিসি হিসেবে থাকে একটি দেশ। বাংলাদেশ সেদিকে ধাবিত হচ্ছে একমাত্র সরকারপ্রধানের কারণে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। তার নেতৃত্বেই গত এক যুগের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এ উত্তরণে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ চাইলে ২০২৪ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশ হতে পারে। আর তা না হলে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক যে অবস্থান, এতে এটিকে স্বল্পোন্নত দেশ বলা যায়। এখন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের দিকে। আশা করা যায়, শিগগিরই আমরা ওই লক্ষ্যেও যাব।

শফিকুল ইসলাম : শিক্ষক ও সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

advertisement