advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ব্যাংকে অলস তারল্য বাড়ছে বেকারত্ব
ধারাবাহিক উন্নয়নে ছোবল

হারুন-অর-রশিদ,অতিথি প্রতিবেদক
৮ মার্চ ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৮ মার্চ ২০২১ ০৮:৫২
প্রতীকী ছবি
advertisement

করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ থাবা শনাক্ত হওয়ার এক বছর আজ। বিভিন্ন দেশে মাস তিনেক আগেই এর তা-ব শুরু হলেও বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়ে ৮ মার্চ। অজানা আতঙ্কে থমকে যায় দেশ। জ্যামের নগরী ঢাকা পরিণত হয় কোলাহলশূন্য ভুতুড়ে নগরীতে। জনজীবনের এই স্থবিরতা ভয়াবহ আঘাতে হানে অর্থনীতিতে। মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ শুরু হয় অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিতে। গত অর্থবছরের মাত্র তিন মাসের আঘাতে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ল-ভ- হয়ে যায়। ভাইরাসের আঘাত কমে এলেও এখনো খুড়িয়ে চলছে অর্থনীতি। ধারাবাহিক উন্নয়নের সূচক এক যুগ ধরে যে গতিতে চলছিল, তা হঠাৎ হোঁচট খেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার ক্ষতি অন্য দেশে তুলনামূলক কম হয়েছে। সার্বিক অগ্রযাত্রায় যে ছেদ পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সঠিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক সহায়তার যথার্থ বাস্তবায়ন।

করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ প্রথম শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে। এর পর ক্রমান্বয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণের প্রায় দুই মাসের সাধারণ ছুটিতে অর্থনৈতিক সব কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়ে। অর্থনীতিকে ধরে রাখতে সরকার ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ছিল রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের জন্য ৪০ হাজার কোটি, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ৩ হাজার কোটি, ইডিএফ তহবিলের আকার ১২ হাজার বৃদ্ধি ইত্যাদি। কিন্তু বড় শিল্পপতিদের টাকা দ্রুত দেওয়া হলেও সারাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নিম্ন আয়ের মানুষদের এই টাকা দেওয়া হয়নি সঠিকভাবে।

গত বছরের ব্যাংক খাত সম্পর্কে ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, করোনার প্রণোদনার অর্থ সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়নি। যারা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি, তাদের পকেটেই প্রণোদনার অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে। আবার এই সংকটে ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে তারল্য ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এর অর্থ যারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি বা কম হয়েছেন, তারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রণোদনা পেয়েছেন। এই অর্থ তারা ব্যাংকেই জমা রেখেছেন। আবার গ্রামে যাদের সত্যিকার অর্থে টাকা প্রয়োজন, নানা জটিলতায় তারা প্রণোদনার অর্থ পাননি।

করোনার ছোবলে স্থিতিশীল ও গতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকই হোঁচট খেয়েছে। এক যুগ ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু করোনায় সরকারি হিসেবে অর্জন হয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। জিডিপিতে বিনিয়োগের অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে হয়েছে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত ২৩ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকা- থমকে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণও অনেক কমে যায়। জিডিপিতে ১৩ দশমিক ২ শতাংশের বিপরীতে হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ হারে, বছর শেষে বাড়ানো হয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ১২ শতাংশের বেশি। সেখানে বৃদ্ধির পরিবর্তে কমেছে ১৭ শতাংশ। আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। শিল্পের প্রয়োজন মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী উপকরণ আমদানি ব্যাপক হারে কমেছে।

ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে আসে। ২০১৯ সাল শেষে দরিদ্রতার হার দাঁড়ায় মাত্র ২০ দশমিক ৫ শতাংশে, ২০১০ সালে যা ছিল ৪৮ শতাংশ। কিন্তু করোনার মানুষের আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়। রাজধানীসহ সারাদেশের ছোট ছোট কাজের সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। বেসরকারি খাতে চাকরি মাধ্যমে সচ্ছলতায় ফিরে মানুষ আবার দরিদ্রতার অন্ধকারে নিপতিত হয়। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই দরিদ্র হয়ে পড়েন। মানুষের আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় দেখা যায়, দরিদ্রতার হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ শতাংশ। নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ। সানেমের মতে, দরিদ্রতার হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। নতুন করে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে সৃষ্ট সংকটে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ জন্য সরকারও প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। যারা কাজ হারাচ্ছে, তাদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে। নতুন সৃষ্ট দরিদ্রতার চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে এসব উদ্যোগ জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে অর্থনীতি যে ধরনের স্থবিরতায় মধ্যে ছিল, সেটি কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় এখনো ফিরে আসেনি। আমদানিতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, গত বছরের ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ২ শতাংশ কমেছিল আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধিতে এখনো গতি আসেনি। তবে করোনাকালীন ব্যাংক যথার্থভাবে এগিয়ে আসেনি। আদায়ের ঝুঁকি বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ বাড়াচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা তারল্য জমা হয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সমাজের সব অংশের মানুষের ওপর করোনার আঘাত এসেছে। জীবন-জীবিকা, ব্যবসা, উৎপাদন, অর্থনীতি কিছুই এই আঘাতের বাইরে নয়। তবে এ ক্ষেত্রেও বৈষম্য হয়েছে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার কারণে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটলেও অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা খুব নাজুক ছিল। ফলে আমাদের দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের ওপর বড় রকম আঘাত এসেছে। এই আঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলছেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপ্তি কম হওয়া, রপ্তানিতে একক খাতের ওপর বেশি নির্ভরতা, কৃষিতে বহুমুখীকরণের অভাব, প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণে বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে মহামারীর ধাক্কা বাংলাদেশে বেশি লেগেছে।

করোনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পর্যটন খাত। বিমান, ভ্রমণ, হোটেল, পর্যটন গাইড ইত্যাদি খাতগুলোর ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি তা ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। সংকটের বছরে বাংলাদেশের জন্য আশার দিক ছিল রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধি। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতেই রেমিট্যান্স বেড়েছে ২২ দশমিক ৬১ শতাংশ হারে। করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার আগের মাসে অর্থাৎ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স বাড়ে মাত্র ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৪২ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ২৭৪ কোটি ডলার। গত বছরের মার্চে এই রিজার্ভ ছিল ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার। করোনা সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানদ-ে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যেতে দ্বিতীয়বার বা চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে যাবে বাংলাদেশ।

advertisement