advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পাকিস্তানের তালেবান কৌশল : একটি অর্ধশতযুগের সন্ত্রাসবাদ?

মাইকেল রুবিন
৩১ মার্চ ২০২১ ২০:১২ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২১ ২০:১২
advertisement

আগামী মাসে ইস্তানবুলে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে আফগান সরকার এবং তালেবানরা। আফগানিস্তানে শান্তি ফেরানোর উদ্দেশ্যে এ বৈঠকে তারা একটি চুক্তি সম্পন্নের চেষ্টা করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, আফগানিস্তানে কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা থাকবে এটিই আলোচনায় মূল ইস্যু হবে : গত দুই দশকের মতোই একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের নের্তৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দেশ হিসেবে থাকবে, নাকি তালেবানদের দাবি অনুযায়ি নিযুক্ত ধর্মীয় নেতার নের্তৃত্বে ইসলামিক আমিরাত হয়ে উঠবে দেশটি?

তবে এ প্রশ্নটির শিকড় কিন্তু ৯/১১ পরবর্তী ন্যাটো অভিযান শুরুর পর অথবা ১৯৯৪ সালে তালেবানদের উত্থানের পর নয়; বরং আরও আগে বাংলাদেশকে যখন পূর্ব পাকিস্তান নামে ডাকা হতো। আজ থেকে ৫০ বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের সাধারন মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা যেখানেই থাকুন এবং যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করুন। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের একজন সেনা থাকা পর্যন্ত আপনারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। জয় আমাদের আসবেই।’ এর কয়েকঘণ্টা পরেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাংলাদেশিদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাক সেনাবাহিনী।

এরপর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, প্রাণ দেওয়া এবং ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় অর্জন করে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করেন। এরপর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পর বাংলাদেশের অভিষেক রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন শেখ মুজিবর রহমান। পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের কাছে হেরে যাওয়া ছিল বড় ধরনের বিপর্যয়। সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের নেতা এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা নতুন দেশটিকে মুসলমানদের ভূমি, রাষ্ট্র যা জাতিসত্তার পরিবর্তে ধর্মের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশিরা ছিল পাকিস্তানের সেসব শীর্ষ জাতিগত সম্প্রদায়ের একটি, যারা কিনা পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেদের পরিচয় চাইছিলো। এক্ষেত্রে বালুচিসদের উদাহারন দেয়া যায়। ভারতের সঙ্গে বিভক্তির সময় এই সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের সঙ্গে জোরপূর্বক অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছিলো। অনেক পাশতুনও তাদের সমগোত্রীয়দের সঙ্গে ‘বৃহত্তর পাশতুনিস্তানে’ যোগ দিতে ছোটখাট বিক্ষোভ করেছিলো। আর তা সম্ভব হলে পাকিস্তানে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবর্তে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ে পরিণত হতো। যদিও পাকিস্তানের নেতারা একসময় জাতিগত আন্দোলনগুলোকে খুবই বিরক্তির সঙ্গে দেখতেন। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে হেরে যাওয়ার পর তারা এ ধরনের জাতিগত আন্দোলনকে রীতিমতো অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর তাই এ ধরনের ক্ষতির মুখে আর যাতে না পড়তে হয় সেজন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও দেশটির সেনাবাহিনীরা উগ্র ইসলামপন্থী কার্যকলাপে উৎসাহ দেওয়া শুরু করে। পাকিস্তানকে অবিচ্ছিন্ন রাখতে তারা ইসলামাবাদকে ব্যবহার করে। যখন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান হেরে যায় তখন দেশটিতে ৯০০ ধর্মীয় বিদ্যালয় ছিল।

১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়া-উল-হকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এ ধরনের ধর্মীয় বিদ্যালয়ের সংখ্যা দশগুন বেড়ে যায়। তবে এই হিসাবের মধ্যে ২৫ হাজার অনিবন্ধিত ধর্মীয় স্কুলগুলো নেই। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হামলা করে, তখনো কিন্তু বাংলাদেশের থেকে হেরে যাওয়ার জখম না শুকালেও একে পাকিস্তানের নেতারা দারুন সুযোগ হিসেবে দেখে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতের আগ্রাসন থামাতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের একার পক্ষে একাজ করা সম্ভব ছিল না। আফগানিস্তান ছিল পুরোপুরি স্থলবেষ্টিত। ইরানও আমেরিকার কূটনীতিকদের জিম্মি করে রেখেছিলো। ফলে এসময় একমাত্র পাকিস্তান ছিলো আফগানিস্তানকে সহায়তা করার একমাত্র পথ। এসময় পাকিস্তানের নেতারা একটি চরম দরকষাকষি করলেন। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র সরবরাহ করবে এবং সৌদি দিবে নগদ অর্থ, আর পাকিস্তানের এজেন্টরা এসব বন্টনের দায়িত্ব নিবে। পাকিস্তান এ সময় অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘পেশোয়ার সেভেন অথবা সেভেন পার্টি মোজাহিদিন অ্যালায়েন্স’কে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে। এই দলটি মূলত ইসলামপন্থী আফগান রাজনীতিবিদদের সংগঠন। গুলবোদ্দিন হেকমাতেয়ারের মতো এই মোজাহিদিনদের অনেকেই পরবর্তীতে তালেবানদের সঙ্গে কাজ করতেন (সেসময়ের তরুন রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান যিনি বর্তমানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট)। বাকিরা ছিলেন নর্থান অ্যালিয়েন্স এবং আফগানিস্তানের ২০০২ পূর্ববর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব। পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) আশা করেছিল তারা প্রত্যেকে জাতিগত গুরুত্বের পরিবর্তে ধর্মীয় সংহতিতে জোর দেয়। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েতরা চলে যাওয়া এবং জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বিল ক্লিনটন প্রশাসনের অনাগ্রহের কারণে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের চাপও কমে আসে। আর এ সুযোগে হেকমাতায়েরদের সমর্থন দেওয়া শুরু করে পাকিস্তান। হেকমাতায়েরের সমস্যা হলো তিনি চরমমাত্রায় সমাজবিরোধি। তিনি আফগান জনগোষ্ঠির মধ্যে ভয় জাগিয়ে তুলেছিলেন কিন্তু সম্মান অর্জন করতে পারেননি। এই দৃশ্যপটে তালেবানদের আবির্ভাব হয়, প্রথমদিকে তারা হেকমাতায়েরের মতো যোদ্ধাদের থেকে স্থানীয়দের রক্ষা করতে আদীবাসী জাগরণ আন্দোলন হিসেবে আসে। একপর্যায়ে তারা ক্ষমতায় থাকার জন্য শক্তি প্রদর্শন করে। আমেরিকার নতুন সরকার বাইডেনের প্রশাসন সম্ভবত আফগানিস্তানে তাদের দীর্ঘতম যুদ্ধের সমাপ্তি চাইতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য লক্ষ্য ভিন্ন। ইসলামাবাদ এবং আইএসআইয়ের জন্য জাতীয়তাবাদী সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত স্থিতিশীল আফগানিস্তানকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখবে তারা। অন্যদিকে একটি ইসলামপন্থী আফগানিস্তান হলো আইএসআইয়ের আদর্শ সমাধান, কিন্তু এতে ব্যর্থ হলে আফগানিস্তানকে তারা অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

লেখক : মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ, পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা

সূত্র: দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট

advertisement