advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী, বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী উদযাপন ও অতঃপর

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন
৬ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২১ ০০:০৬
advertisement

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং দেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী আমার জীবদ্দশায় দেখব বলে কোনোদিন ভাবতে পারিনি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরম দয়ায় যে উদযাপনটি সরাসরি দেখার সুযোগ না হলেও ঘরে বসে টিভির পর্দায় কিছুটা দেখেছি। অনুষ্ঠানগুলো বর্ণাঢ্য ও গর্ব করার মতো হলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বা সুযোগের মতো অবস্থা ছিল না, দুটো কারণে। প্রথমত, করোনা মহামারীর পুনঃআক্রমণ এবং অত্যধিক মাত্রায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যেহেতু এই দশ দিনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপমহাদেশের চারজন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এসেছিলেন, যাদের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ঘর থেকে বের হওয়াও আমার মতো সাধারণ মানুষের সম্ভব হয়নি। কোনো একটা আলাদা ব্যবস্থা করলে হয়তো আরও উপভোগ্য হতে পারত। আরও সর্বজনীন হতে পারত।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী বারবার আসবে না, অন্তত আমাদের জীবদ্দশায় নয়। তথাপি প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ বাংলাদেশকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করার জন্য।

এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করতে না পেরেও আমি বাংলাদেশি হিসেবে গর্ববোধ করছি। তথাপি ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশের অগ্রগতি, উন্নতির যে ছবি এর মাধ্যমে বিশেষ করে উপমহাদেশ ছাড়াও বিশ্বের ওই সব দেশে পৌঁছেছে, যারা ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঘৃণিত প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সেক্রেটারি স্টেট ড. হেনরি কিসিঞ্জারের ‘বাংলাদেশ এ বটমলেস বাস্কেট কেস’ উক্তির সমর্থক ছিল। হেনরি কিসিঞ্জার এখনো জীবিত আছেন, আমার মতে বাংলাদেশ সরকার তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এলে উত্তম হতো। অবশ্য আগামী ১৬ ডিসেম্বরও আমন্ত্রিত হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় আসতে বেশি দিন লাগেনি। কারণ এ দেশের মানুষের দেশ ও নিজেকে গড়ার অদম্য আকাক্সক্ষা আর ইচ্ছাশক্তি। বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আয়তনে ছোট দেশ। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর কষ্টের দিনগুলো দেখেছি ১৯৭২-৭৫ তাদের অনেকেই আমার মতো ১৯৭৪-এর মানুষ সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের সময় ভাবতেও পারেনি দেশ একদিন আজকের জায়গায় পৌঁছবে। দুর্ভিক্ষের হতাশা বঙ্গবন্ধুকে মাঝে মধ্যে গ্রাস করত। তিনি জনগণের কাছে লুকাতেন না, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সামলাতে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি ভিক্ষা করে আনি আর চাটার দল খেয়ে ফেলে।’ তিনি জনগণের সামনে বলেছেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেলাম চোরের খনি।’ মানুষের কষ্টকে ধারণ করে এসব কঠিন বাক্য উচ্চারণ করেছেন কিন্তু তিনি চোরদের ধরতে পারেননি। তিনি যেসব স্বপ্ন নিজে দেখেছিলেন ও মানুষকে দেখিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ঘাতকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়েছিল। আমার মনের ভেতরে গেঁথে আছে এবং আজীবন থাকবে ১৫ আগস্ট বাড়ি সিঁড়িতে পড়ে থাকা তার নিথর দেহটি ও তার শান্ত-গম্ভীর মুখটি। (আমার রচিত বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১, পালক পাবলিশার্স)। মহান ব্যক্তিত্ব স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু বাস্তবায়ন করতে সময় পাননি।

ওই সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতি চরম হুমকি ছিল তথাকথিত বামপন্থি উগ্রবাদী সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে থাকা পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে চোরাগোপ্তা হামলায় হাজার হাজার মানুষের জীবন নাশের। লুটপাট আর হত্যার মাধ্যমে কথিত ‘অসমাপ্ত বিপ্লবের’ ডাকের মধ্য দিয়ে। অনেকের মতে, এদের সম্পর্ক ছিল পশ্চিম বাংলার নবশালদের সঙ্গে। অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণার বিষয় হতে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’, যাদের মতে, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল অসমাপ্ত।’ ওই সময়ে এত বড় রক্ষীবাহিনী তৈরি করেও এদের শায়েস্তা করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু সরকার। অবশেষে অস্ত্র উদ্ধার ও এদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী তলব করতে হলো। এ পরিস্থিতির মধ্যেই বঙ্গবন্ধু যিনি সারাজীবন উদার গণতন্ত্রের জন্য জীবনের অর্ধেক সময় জেলজুলুম সহ্য করেছেন সেই তিনিই চারদিকের পরিস্থিতির কারণে উদার গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে এসেছিলেন। কেন তাকে এমন করতে হয়েছিল? সে ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় পাননি।

বঙ্গবন্ধুর বিশাল রাজনৈতিক কর্মকা-ের খানিকটা পাওয়া যায় তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা বই দুটি হতে। শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশের তথা এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নেতা বা জাতির পিতা থেকে আলাদা ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি সব সময় মানুষের মধ্যেই থাকতেন। তিনিও রক্ত-মাংসের মানুষ, সফলতা-ব্যর্থতা থাকাটাই স্বাভাবিক কিন্তু তিনি বাংলাদেশ নামক বাঙালি আর বাংলা ভাষার একমাত্র দেশের স্থপতি। এ কথা অনস্বীকার্য আজ কোথায় পাকিস্তান আর কোথায় বাংলাদেশ, তথাকথিত বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মডেল। সনম্র চিত্তে স্মরণ করব জাতির পিতাকে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, শুধু কন্যা হিসাবে নয়- নেতা হিসাবে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার যেভাবে জাতির পিতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন তা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। সব রাজনৈতিক দলেরই এ বিষয়ে সংশয় থাকা বা রাখা উচিত নয়। জাতির পিতা হতে হবে সর্বজনীন। আশা করব যে, জাতির পিতা শুধু আওয়ামী লীগের নয়, সব দলেরই সম্মান করা উচিত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহ্বানে আরও অনেক সামরিক-বেসামরিক নেতা রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। সবাই জাতির পিতার সহযোগী হিসাবে স্বাধীনতা ও জাতি গঠনে অবদান রেখেছেন, জীবন দিয়েছেন তাদের যথাযথ স্থানে মর্যাদা দেওয়া হবে উদারতার বহির্প্রকাশ। স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে তাদের উল্লেখও হতে পারে উদার সমাজের পরিচয়। আশা করব আগামী সুবর্ণ বিজয় দিবসে এমনটাই হতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর একদল গঠনের কারণের ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি বা সময় পাননি। যার কারণে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে। পরে রাজনৈতিক দলের বিকাশ যেমন হয়নি, তেমনই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দলগুলোর ভেতরে ও বাইরের কোন্দল আর ক্ষমতাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠতে পারেনি। প্রয়োজন হয়েছিল অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা পরে আর টেকেনি। উদার গণতন্ত্র আর সমাজ গড়ে ওঠেনি। ক্রমেই রাজনৈতিক ময়দান সংকুচিত হয়েছে। এর পেছনের দায় বেশির ভাগ বিএনপি। বড় দল হিসাবে এর অরাজনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক মনোভাব। রাজনীতি ও গণতন্ত্রের নাম ‘আপস’, সেখানে আপসহীন শব্দ মানায় না। আজ বাংলাদেশের রাজনীতি যে জায়গায় পৌঁছেছে তা অবশ্য রাজনৈতিক দলের ও রাজনীতিকদের ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায় বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের, বিশেষ করে বড় দুই দলের। এখন ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভর করছে সরকারে অধিষ্ঠিত দলের। দেশ এখন এক চাকার গাড়ির মতো। রাজনীতি ও গণতন্ত্র দেশের দ্রুত উন্নতির অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেখানেই বড় বিপদ।

দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গন প্রায় শূন্য, শুধু সরকারি দল ছাড়া। বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং এই শূন্যতার মধ্য দিয়েই আমরা লক্ষ করছি অরাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যাপক উত্থাপন। যে কাজ বিরোধী দলের তাদের ছন্নছাড়া অবস্থার কারণে আজ অরাজনৈতিক শক্তির প্রকট উত্থান দৃশ্যমান। শূন্যস্থান পূরণ হবেই, তবে রাজনৈতিক দল দ্বারা পূরণ হওয়া দেশের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গল।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি। তিনি অনেক কিছু ভালোর কৃতিত্বের দাবিদার তাই জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর উদার রাজনীতির স্বপ্ন ও সারাজীবনের সংগ্রামের বাস্তবায়ন একমাত্র শেখ হাসিনা দ্বারাই সম্ভব। শুধু উদার রাজনীতির প্রতিষ্ঠাই নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনও এই সরকার দ্বারা সম্ভব।

রাজনৈতিক উদারতার অভাবে এবং দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকা- সংকুচিত করার কারণেই অরাজনৈতিক শক্তির উত্থান অতীতেও যেমন দেখা গিয়েছে তার আলামত পুনঃদৃশ্যমান। অরাজনৈতিক শক্তি যে শক্তি সঞ্চয় করে ফেলেছে তাকে প্রতিহত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও, যদি সেসব দলকে সে ধরনের রাজনৈতিক স্পেস দেওয়া হয়। অন্যথায় অরাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নতির সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধের উন্নতি হয়নি। এ ক্ষেত্রে অন্তর্কোন্দল ও স্বার্থপরতার কারণে প্রবীণরাও নবীনদের প্রতি দায়িত্বে ব্যর্থ হচ্ছেন।

ভালো হতো যদি বাংলাদেশের এমন উৎসবে, যে কারণেই হোক এতগুলো প্রাণনাশ ও রক্তপাত না হতো। এ সময়ে এ রক্তপাত দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চোনার মতো কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এক অসহিষ্ণু সমাজে পরিণত হয়েছে। যে সংকট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা অবস্থান তৈরি করা যায় সেখানে শক্তি প্রয়োগ হিতে বিপরীত হতে পারে। এই সময়ে এ রক্তপাত সম্পূর্ণ আয়োজনকে কিছুটা হলেও ম্লান করেছে। আসুন সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শক্তিশালী বাংলাদেশের স্বার্থে উদার সমাজ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলি।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন : নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

advertisement