advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বৈষম্যহীন ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে

মিলি সাহা
৬ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২১ ০০:০৬
advertisement

গবেষকরা বলছেন- ছেলে ও মেয়ে মস্তিষ্কের ধারণাটি ভুলে যান, বরং তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ ভিন্ন বলেই শিক্ষা এবং সাফল্যে ছেলে ও মেয়েতে পার্থক্য হয়। হ্যাঁ, শিক্ষায় আমরা এখনো প্রচলিত লিঙ্গবিধি অনুশীলন করি, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য খুঁজি এবং তাদের জন্য পৃথক স্কুলের ব্যবস্থা করি। এমনকি বাড়িতেও ছেলে ও মেয়েরা পায় আলাদা মনোযোগ এবং তাদের পড়াশোনার জন্য করা হয় ভিন্ন ব্যবস্থা। কেন? আমাদের হাতে রয়েছে জৈবিক ও সামাজিক শ্রেণিবদ্ধ পরিচয়। তা দিয়েই আমরা পড়াশোনায় ভালো ও খারাপ ফলাফলের ব্যাখ্যা দিয়ে সামাজিক সন্তুষ্টি লাভ করি। ছেলেদের বহির্মুখী বৈশিষ্ট্য ও মেয়েদের নিয়মের অনুসারী মনোভাবের কারণেই তাদের শিক্ষার ধরন একটু আলাদা। তবে শিক্ষকদের অব্যাহত অদক্ষতার কারণে ছেলেদের শেখানোর সঠিক উপায়গুলো স্কুলে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় না। এতে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিতে ছেলেরা অনেকাংশেই অবহেলিত! এটিও সত্যি, জন্মের ঠিক পরই আমরা শিশুদের পোশাক এবং আচরণের পাশাপাশি সম্বোধন, কথা বলা বা প্যারেটিংয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা করে দেখি। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি ¯েœহ, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ পায়- যেখানে ছেলেদের জন্য ¯েœহ, উদ্বেগ ও নিয়ন্ত্রণ থাকে কম। আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের স্বাবলম্বী ও দায়িত্ববান হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। অথচ মেয়েদের শেখানো হয় সমাজের নিয়ম-কানুন মানাসহ ছেলেদের ওপর নির্ভরশীলতা! তবে কঠোর এবং কর্তৃত্বপূর্ণ মা-বাবার শিশুরা সামাজিকভাবে দক্ষ, পরিপক্ব, আত্মবিশ্বাসী ও দায়বদ্ধ হয় এবং বেশিরভাগ মানসিক সমস্যার বাইরে থাকে। এ ছাড়া সংবেদনশীল এবং পরিণত হওয়ার কারণে পড়াশোনা ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ হয়। অন্যদিকে অভিভাবকের অমনোযোগ ও অবহেলা তাদের আবেগীয়, আচরণগত এবং জ্ঞানীয় সমস্যার মুখোমুখি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, স্কুলে ছেলেদের অর্জনের হার উদ্বেগজনক। ক্লাস পুনরাবৃত্তি, মনোযোগের অভাব এবং শিক্ষায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রের সংখ্যা বাড়ছে। ছেলেরা স্কুলে মেয়েদের থেকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। পেছনে পড়া ছেলেরা স্কুল ছাড়ার ঝুঁকিতে থাকে, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। এ কারণে বেকার হয়। ক্রমহ্রাসমান একাডেমিক পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ছেলেদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়েও উৎকণ্ঠা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ- স্কুলে ছেলেদের অযৌক্তিকভাবে অত্যাধিক কঠোর ও নিখুঁতভাবে বিচার করা হয়। তাদের প্রায়ই মেয়েদের তুলনায় নিম্ন গ্রেড দেওয়া হয়। মেয়েদের মধ্যে শিক্ষকদের খুশি করার যে প্রবণতা, ছেলেরা তার সঙ্গেই পেরে ওঠে না! তবে যেসব ছেলের মধ্যে মেয়েদের মতো শেখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আগ্রহ থাকে, শিক্ষকরা তাদের একটু ভালো নম্বর দেন। আবার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ব্যবহারের জন্যও ক্ষতিপূরণ দেন। কী কারণে ছেলেদের নম্বর কমে যায়, সেটি একটি গবেষণার বিষয়। কেননা অনেক সময় শুধু নেতিবাচক আচরণের জন্য তাদের কঠোরভাবে বিচার করা হয়! বিশেষ করে যেসব ছেলে অন্তর্মুখী ও নিভৃতচারী, তারা দলবদ্ধ কাজে ভালো করতে পারে না এবং প্রায়ই অভদ্র ও অমনোযোগী ছাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ভালো আচরণকারী শিক্ষার্থী ও ভালো নম্বর অর্জনকারীদের প্রতি শিক্ষকদের অনুকূল মনোভাব ধীরে ধীরে ছেলেদের নিরুৎসাহিত করে।

শিক্ষিকারা প্রায়ই নিয়মানুবর্তি ও বাধ্যগত হওয়ার জন্য মেয়েদের বেশি পছন্দ করেন। তবে ছেলেদের শিক্ষকরা একই লিঙ্গের হওয়ায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। ছেলেদের মধ্যে জৈবিক ও সামাজিক পার্থক্যগুলো বোঝার ফলে তাদের সুপ্ত প্রতিভা আবিষ্কারে পুরুষ শিক্ষকরা বেশি সফল। কেননা মেয়েদের ও ছেলেদের সামাজিক যোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সামগ্রিকভাবে মেয়েদের চেয়ে স্কুলের সঙ্গে বেশি লড়াই করতে হয় ছেলেদের। শেখার অক্ষমতা ও আচরণগত সমস্যা মেয়েদের তুলনায় তাদের মধ্যে বেশি। ক্রমাগত নিচু গ্রেড পাওয়া ছেলেরা পড়াশোনার প্রতি অবসাদ ও বিরক্তি অনুভব করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে হাইস্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশই ছেলে। স্কুলে ৮০ শতাংশ শৃঙ্খলা সমস্যায় ছেলেরা জড়িত। শিখতে অক্ষম (লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি) শিক্ষার্থীর ৭০ শতাংশ ছেলে। আচরণ ও মনোযোগের সমস্যায় ভোগা ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীও ছেলেই। অন্যদিকে কলেজ শিক্ষার্থীর মাত্র ৪৪ শতাংশ ছেলে! যদিও আমাদের দেশে এ চিত্র অনেকটাই উল্টো, তবুও শ্রেণিকক্ষে ছেলেদের বঞ্চিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতটুকু এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ছেলেদের প্রতি সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে বহুগুণ।

ছেলে ও মেয়েরা স্পষ্টতই আলাদা। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ছেলে মাত্রই আচরণ সমস্যা বা গতাগনুগতিক ফল। ছেলে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ দক্ষতার স্ফুরণ ঘটাতে হলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের ছেলে এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পার্থক্যসহ শেখার ভিন্ন কৌশল এবং আগ্রহের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। শেখানোর জন্য এমন সব কৌশল ব্যবহার করতে হবে- যাতে ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই বুদ্ধির বিকাশ সমভাবে ঘটে। দুর্ভাগ্যক্রমে ছেলে ও মেয়েরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অবমূল্যায়নিত হয়। যেমন- মা-বাবা ও শিক্ষকদের বিশ্বাস যে, ছেলেরা গণিতে ভালো, মেয়েরা পড়ার ক্ষেত্রে ভালো, আমিও অঙ্কে বা বিজ্ঞানে ভালো ছিলাম না, ছেলেরা কথা শোনে না ইত্যাদি। অভিভাবক ও শিক্ষকদের নেতিবাচক অনুভূতি শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে। যারা গণিতে অস্বস্তিতে ভোগেন, তারা এই বিষয়ে পড়াতে কম দক্ষবোধ করেন এবং নতুন উদ্ভাবনী শিক্ষণ কৌশল ব্যবহার করতে কম উৎসাহিত হন।

শিক্ষকরা যদি ছেলেদের কাছে সব সময়ই মেয়েদের চেয়ে খারাপ আচরণ প্রত্যাশা করেন, তা হলে তারা মেয়েদের আচরণের সমস্যাটি পুরোপুরি এড়িয়ে যাবেন বা ভালো ছেলেদের ব্যতিক্রমী হিসেবে বিবেচনা করবেন। তা শিক্ষকদের প্রত্যাশাকে বিকৃত করতে পারে। লিঙ্গগত পার্থক্যের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ অন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যেমন- বয়স, শারীরিক পরিপক্বতা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা ও বাড়ির পরিবেশকেও অস্পষ্ট করে। আবার শিক্ষার ভিন্ন কৌশলের দোহাই দিয়ে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক স্কুল কোনো সমাধান নয়। কেননা এটি লিঙ্গবৈষম্যকে সুস্পষ্ট করে, সমতাকে নিরুৎসাহিত করে এবং ছেলে ও মেয়েদের সমাজে মানিয়ে চলার ক্ষমতা হ্রাস করে। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্যগুলো পৃথক স্কুলের আড়ালে লুকিয়ে ফেলার বিষয় নয়, বরং শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের এগুলো স্বীকার করে নিয়ে বৈষম্যহীন ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ছেলে ও মেয়েদের শেখার ভিন্ন আচরণ এবং প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সবস্তরের শিক্ষককে, বিশেষ করে প্রাথমিকের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটি আমাদের ১ শতাংশেরও কম শিক্ষকের রয়েছে। ভালো শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন সম্পর্কে শিক্ষকদের যতটা সম্ভব জানা থাকতে হবে এবং ওই প্রয়োজনীয়তাগুলো পূরণ করার দক্ষতা থাকতে হবে।

মিলি সাহা : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement