advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অন্ধকার থেকে আলোয়

ড. আতিউর রহমান
৭ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২১ ০০:৩৮
advertisement

দীর্ঘ ৯ মাসের বেশি সময় কারাগারে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। আর তার ফিরে আসার মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ হয় বাংলাদেশের বিজয়। যে দেশকে তিনি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন, সে দেশ থেকে ৯ মাস দূরে থাকাটা তার কাছে কয়েক শতাব্দীর বিচ্ছেদের মতো মনে হয়েছিল। স্বভাবতই দেশের মানুষ তাকে ফিরে পেয়ে যেমন আবেগে আপ্লুত হয়েছিল, তিনিও তেমনি উদ্বেলিত হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়েছিলেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ভারতের চাপের মুখে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় এসে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। তবু বঙ্গবন্ধু দেশে না থাকায় এ বিজয় তখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি বাঙালির জন্য। বিজয় দিবসে বাঙালি আনন্দিত হলেও তখনো তাদের মনে উৎকণ্ঠা ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য।

বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারে। সামরিক আদালতে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তবে তিনি মৃত্যুর ভয়ে ভীত ছিলেন না। বরং পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষকে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা যেন তার মৃতদেহ বাংলাদেশে পৌঁছে দেয়। জীবিত না হলেও মৃত্যুর পর অন্তত নিজ দেশের মাটিতে শেষ নিদ্রায় শায়িত হতে চেয়েছিলেন। তার পক্ষে এমন চাওয়াটাই স্বাভাবিক। বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় কারাবন্দি বঙ্গবন্ধু জানতেন না, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ওপর তার মুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি এও জানতেন না, পাকিস্তানিরা তাকে জীবিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় স্বীকার করার পর ১৯৭১ সালেই জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে জেলখানা থেকে বের করে রাওয়ালপিন্ডিতে সিহালা রেস্ট হাউসে নিয়ে আসেন (এসএ করিম, ‘শেখ মুজিব : ট্রায়াম্পফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’, সংশোধিত সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫১, ইউপিএল, ২০০৯)। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭১ সালের ২৮ ডিসেম্বর হরিপুর কারাগারে বন্দি ব্যারিস্টার কামাল হোসেনকেও সিহালা নিয়ে আসা হয়। কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু জানান, ১৬ ডিসেম্বরের পর পরই তাকে একটি ফাঁকা বাংলোবাড়িতে নিয়ে রাখা হয়েছিল এবং ২৬ ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে করে সিহালা নিয়ে আসা হয়। ভুট্টো তার সঙ্গে দেখা করে তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

পাকিস্তনের পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকা-ের দায়িত্বে থাকা ভুট্টোর এক সহযোগী আজিজ আহমেদ বঙ্গবন্ধু ও ব্যারিস্টার কামাল হোসেনের সঙ্গে দেখার করতে আসেন। আজিজ আহমেদ তাদের প্রস্তাব দেন, তারা যেন ইরানের রাজধানী তেহরানে ট্রানজিটের জন্য থামবে এমন একটি পাকিস্তানি বিমানে করে দেশে ফেরেন। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, তেহরানে যাত্রাবিরতির জন্য থামলে ইরানের শাহ তার ওপর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করবেন। তাই তিনি এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এ প্রসঙ্গে আরও আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, একটি পাকিস্তানি বিমান বঙ্গবন্ধু ও ব্যারিস্টার কামালকে লন্ডনে দিয়ে আসবে এবং সেখান থেকে তারা দেশে ফিরবেন। ১৯৭১ সালের ৭ জানুয়ারি ভুট্টোর আমন্ত্রণে প্রেসিডেন্টের গেস্ট হাউসে নৈশভোজে যান বঙ্গবন্ধু ও ব্যারিস্টার কামাল। সেখানে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে জানিয়ে দেন, তিনি দেশে ফিরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। একপর্যায়ে ভুট্টো জানান, ইরানের শাহ পরদিন পাকিস্তানে আসছেন এবং এ জন্য বঙ্গবন্ধুকে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একদিন পিছিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। আবারও তার ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ফন্দি টের পেয়ে বঙ্গবন্ধু এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং সে রাতেই তিনি ও ব্যারিস্টার কামাল লন্ডনের উদ্দেশে বিমানে ওঠেন (কামাল হোসেন, ‘বাংলাদেশ : কোয়েস্ট ফর ফ্রিডম’, চতুর্থ মুদ্রণ, পৃষ্ঠা ১১৩-১১৬, ইউপিএল, ২০১৯)।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি খুব ভোরে বঙ্গবন্ধু ও ব্যারিস্টার কামাল লন্ডনে পৌঁছান। সেদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় লন্ডনের অধিকাংশ মানুষ ঘুমন্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান লন্ডনে অবতরণের মাত্র এক ঘণ্টা আগে ব্রিটিশ ফরেন অফিস তার লন্ডন আসার খবর পেয়েছিল। ওই দপ্তরের ইয়ান সাদারল্যান্ড দ্রুত বিমানবন্দরে পৌঁছান এবং বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি ভিআইপি কক্ষ ও লিমুজিন গাড়ির ব্যবস্থা করেন। ফরেন অফিসের পক্ষ থেকে লন্ডনে অনানুষ্ঠানিক বাংলাদেশ মিশনের প্রধান রেজাউল করিমের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয় (এসএ করিম, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৫৯)।

এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার কামাল হোসেন লিখেছেন, “আমাদেরকে যখন লন্ডনে ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা একটি কথা বলেন- যা আমি ভুলতে পারব না। হঠাৎ তিনি সজল চোখে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেন- ‘স্যার, আমরা সকলে আপনার জন্য প্রার্থনা করছিলাম” (কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১১৬)।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ক্লারিজ’স হোটেলে যাওয়ার সময় রেজাউল করিম বঙ্গবন্ধুকে বিগত ৯ মাসের খবরাখবর দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার দেশবাসীকে যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা শুনে বঙ্গবন্ধু বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন (এসএ করিম, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৬০)। হোটেলে পৌঁছার পর বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল। তার অনুপস্থিতিতে দেশ সামাল দিচ্ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধু ফোনে তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপ করেন। সেদিন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু জানান, তার দেশবাসী দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছেন জেনে তিনি আনন্দিত এবং তিনি একটি সমৃদ্ধ সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করতে চান। বিভিন্ন দেশের সরকার এবং জনগণ- যারা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। এর পাশাপাশি যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসার জন্য তিনি বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান। বাংলা অতীতে ব্রিটেনের শিল্প বিকাশে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি গ্রেট ব্রিটেনকে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন (৮ জানুয়ারি ১৯৭২, লন্ডনের ক্লারিজস’স হোটেলে বঙ্গবন্ধুর সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও, ইউটিউব থেকে)।

ক্লারিজ’স হোটেলে অবস্থানকালে প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকেও একটি সাক্ষাৎকার দেন বঙ্গবন্ধু। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মূলত স্বাধীনতার জন্য নিজ দেশের মানুষকে যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে, সেটিই তুলে ধরেন। ফ্রস্ট যখন বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বিগত এক বছরে তার জন্য সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত কোনটি ছিল। এর জবাবে তাৎক্ষণিক বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন- যখন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার খবরটি জেনেছিলেন, সেটিই ছিল তার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। তিনি জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালির মৃত্যুর খবরটি যখন জেনেছিলেন, তখন সেটি ছিল তার জীবনে সবচেয়ে অসহনীয় সময়। ফ্রস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিদের গণহত্যার কিছু ছবি দেখান, তখন বঙ্গবন্ধুর চোখে জল চলে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন- এই যুদ্ধে যে বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে, এ জন্য অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। তিনি আরও জানিয়েছিলে, দেশের মানুষ তাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, এর তুলনায় রাষ্ট্রপতির মর্যাদা বা প্রধানমন্ত্রিত্ব কোনো গুরুত্বই বহন করে না। তিনি ভারতের প্রধামন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ওই দেশের জনগণের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’- এটিই হতে যাচ্ছে তার পররাষ্ট্রনীতি (ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারের ভিডিও, ইউটিউব থেকে)।

ব্রিটিশ সরকার তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ সম্মান ও প্রটোকল দিতে পিছপা হননি। যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়, তখন জানতে চেয়েছিলেন- বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি কী করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছিলেন, একটি বিমানে করে তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা মিস্টার হিথের পক্ষে সম্ভব কিনা। পরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব বিমানে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি সকালে বিমানটি লন্ডন ত্যাগ করে। সাইপ্রাস ও শারজাহে জ্বালানির জন্য বিমানটি থেমেছিল। শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি দিয়ে বিমানটি ঢাকা পৌঁছে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি (কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১১৯-১২১)। দিল্লিতে যাত্রাবিরতির সময় বঙ্গবন্ধু একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। ওই বক্তব্যে বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের সহায়তা করার জন্য তিনি ভারতের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার মুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন (নিউইয়র্ক টাইমস, ১১ জানুয়ারি ১৯৭২)। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধি’র বাংলাদেশের অভিমুখে যাত্রা করার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে আছেন। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেই বঙ্গবন্ধু ঢাকা আসার জন্য বিমানে ওঠেন। কলকাতায় একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির প্রস্তাব তিনি এড়িয়ে যান। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য কলকাতাবাসীর আরও দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য হয়েছিল। পরে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফরে তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন।

দিল্লি থেকে ব্রিটিশ বিমানটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঢাকা পৌঁছায় দুপুর আড়াইটায়। বঙ্গবন্ধু ও তার সহযাত্রীদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন বিপুল সংখ্যক মানুষ (এসএ করিম, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৬২)। এ প্রসঙ্গে কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘এমনকি আকাশ থেকেই এই জনসমাগমের দৃশ্য ছিল বিমোহিত করার মতো। আকাশ থেকে নিচে শুধু মানুষের সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল’ (কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১২১)। বিমানবন্দর থেকে একটি ট্রাকে করে বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানে নেওয়া হয়েছিল। হাসতে হাসতে আর আনন্দে স্লোগান দিতে দিতে লাখো মানুষে সেদিন রেসকোর্সে হাজির হয়েছিল।

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু সেদিন ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি চোখের জল সামলাতে পারছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের জন্য সেদিন তিনি প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনা করেছিলেন। সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি সেদিন জানান- তিনি নিজে আর দেশে ফিরতে পারবেন কিনা, এ বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে আসবে, এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী সবাইকে তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম থাকবে। সেদিন ‘বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে- এমন কোনো শক্তি নাই’ বলে তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে’ (আতিউর রহমান, ‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, পৃষ্ঠা ৩৬০, আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৮)। সেদিন তিনি কেঁদেছিলেন। তার সঙ্গে কেঁদেছিল পুরো বাংলাদেশ। (চলবে)

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

advertisement