advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সামাজিক মাধ্যম ‘সংবাদমাধ্যম’ নয়

সজীব সরকার
৭ এপ্রিল ২০২১ ১৮:০৩ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২১ ১৮:০৩
advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সহজে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি বেশ সুবিধাজনক হয়েছে। তবে মানুষ এখন সামাজিক মাধ্যম কেবল যোগাযোগ বা সামাজিকতা রক্ষার কাজেই ব্যবহার করে না; ব্যক্তিগত এবং পেশাগতসহ আরও অনেক কারণেই এর ব্যবহার হচ্ছে। এসবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হলো সামাজিক মাধ্যমকে খবরের উৎস হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। এই প্রবণতা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বেশ ঝুঁকিপূর্ণই বটে। কেন তা ঝুঁকিপূর্ণ, তা অবশ্যই ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

সামাজিক মাধ্যমকে খবরের উৎস হিসেবে ব্যবহারের নানা ধরন ও কারণ রয়েছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, মানুষ এখন সারাদিনের একটা বড় সময় অনলাইনে বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে কাটায়। গণমাধ্যমগুলো তাই সামাজিক মাধ্যমকে তাদের পাঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে মুদ্রিত পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলসহ প্রায় সব গণমাধ্যম নিজেদের একটি অনলাইন ভার্সন রাখার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও তাদের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করছে।

পুরো প্রক্রিয়াটি তাহলে এমন দাঁড়াচ্ছে : একটি মুদ্রিত পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল তাদের একটি অনলাইন ভার্সন চালু করছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই নামে অ্যাকাউন্ট ও পেজ চালু করছে। অনেকে ইউটিউব-এও নিজেদের নামে চ্যানেল খুলে এবং সেখানেও নিজেদের খবরগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করে। মুদ্রিত পত্রিকায় বা টিভির খবরে যেসব সংবাদ প্রকাশিত বা প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলো তাদের অনলাইন ভার্সনেও দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য অনলাইন ভার্সনে মূল পত্রিকা বা টিভি বুলেটিনের খবরগুলোর বাইরেও নতুন নতুন খবর সারাদিন ধরে প্রকাশিত হতে থাকে। আর মূল গণমাধ্যম ও সেটির অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত খবরগুলো ওই গণমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের যে অ্যাকাউন্ট ও পেজ থাকে, সেখানেও ‘শেয়ার’ করে। এ কারণে গণমাধ্যমগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্ট ও পেজে ফ্রেন্ড বা সাবস্ক্রাইবার এবং লাইক-এর সংখ্যা বাড়াতে সদা তৎপর থাকে।

যারা সামাজিক মাধ্যমে গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তারা ওইসব গণমাধ্যমের শেয়ার করা খবরগুলো নিজেদের অ্যাকাউন্টে পেয়ে যান। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো খবরের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের খবরগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে পাওয়া ও শেয়ার করাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অনলাইনের নানা প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অপেশাদার ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশনকারী অনেক ‘পত্রিকা’ বা ‘চ্যানেল’ ভুল বা মিথ্যা খবর ও গুজব ছড়িয়ে নিজেদের আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা আদায় করে নেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা অনেক সময় ওইসব ভুয়া খবর বা গুজবকে সত্য মনে করে এসবের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কেউ কেউ আবার সূত্রের উল্লেখ না করে নিজেই নিজের অ্যাকাউন্টে বা পেইজে নিজের মতামত বা বক্তব্যকে ‘খবর’ হিসেবে প্রচার করে। এই প্রবণতাগুলোই আসলে ঝুঁকিপূর্ণ; অনেক সময় এসব কারণে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা সহিংসতা এমনকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও ঘটে যায় এবং এমন অনেক ঘটনা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশসহ নানা দেশেই ঘটেছে।

তাহলে মূল কথা হলো, প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমগুলোর সূত্রে পাওয়া খবর নিরাপদ কিন্তু অসমর্থিত সূত্র বা সূত্র ছাড়া প্রচারিত বক্তব্যকে খবর হিসেবে প্রচার বা গ্রহণ করা বিপজ্জনক।

গণমাধ্যমের প্রচলিত ফরম্যাটে (পত্রিকা, টিভি, রেডিও বা অনলাইন পত্রিকা) সাংবাদিকতার সাধারণ চর্চা হলো কোনো তথ্য বা খবর প্রকাশ বা প্রচারের আগে তা যাচাই করে নেওয়া হয় এবং তা যথাযথভাবে সম্পাদিত হওয়ার পরই তা প্রকাশ বা প্রচার করা হয়। ফলে এসব গণমাধ্যমে পাওয়া খবর বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ওইসব খবর বিশ্বাস করতে বাধা নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্বীকৃত কোনো সংবাদমাধ্যম নয়; ফলে যে-কেউ তার মনগড়া কোনো বক্তব্য বা নিজের মতামতকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিনা বাধায় ‘খবর’ হিসেবে প্রচার করার অবাধ সুযোগ পায়। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কেবল প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের খবরগুলো বিশ্বাস করতে হবে; সূত্রবিহীন বা অসমর্থিত সূত্রের বরাতে দেওয়া তথ্য বা বক্তব্যকে বিশ্বাস করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে ওইসব তথ্য সত্য কিনা, তা বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর মারফতে যাচাই করে নেওয়া দরকার।

কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া তথ্যকে সঠিক খবর হিসেবে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা যাবে না; অবশ্যই এর সূত্র যাচাই করতে হবে। তাহলেই ভুয়া বা মিথ্যা খবরের (ফেইক নিউজ) হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

লেখক : সজীব সরকার : সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠাতা : মিডিয়াস্কুল ডট এক্সওয়াইজেড।

advertisement