advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেন

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
৮ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৮ এপ্রিল ২০২১ ০৯:৪০
advertisement

দেশে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। প্রথম ঢেউ সফলভাবে সামলে নেওয়া সম্ভব হলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে দেশে কী পরিস্থিতি উদ্ভব হবে, তা আমাদের এখনো অজানা। কিন্তু একটি বিষয় এই এক বছরে দেশের আপামর জনসাধারণের উপলব্ধি করার সুযোগ হয়েছে, ‘স্বাস্থ্যসেবা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।’ এই সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নিপুণ ব্যবস্থাপনা। সব প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে না করা গেলে শুধু চিকিৎসক কোনোভাবেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে সফল হতে পারবেন না।

কোভিড-১৯ মোকাবিলা করে আমরা শিক্ষা পেলাম কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত রাখলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে আরও দক্ষ করে তোলা যাবে। এই আলোকে আজ যে প্রসঙ্গটি আলোচনা করতে চাই, তা হচ্ছে অক্সিজেন ও অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা।

অক্সিজেন কী : অক্সিজেন একটি গ্যাস, বাতাসে স্বাভাবিকভাবে ২১ শতাংশ অক্সিজেন থাকে। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণী প্রাণ রক্ষার্থে বিপাকীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অক্সিজেন গ্রহণ করে। মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় অক্সিজেনের ব্যবহার সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু বর্তমান বিশ^ পরিস্থিতিতে এই ‘অক্সিজেন’ চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্ব ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মেডিক্যাল অক্সিজেন কী : যে অক্সিজেন উৎসে কমপক্ষে ৮২ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন থাকে, যা কোনো রোগজীবাণুর সংস্পর্শমুক্ত এবং যা তেলবিহীন কম্প্রেসরের মাধ্যমে প্রদান করা হয়- এমন উন্নতমানের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাকে মেডিক্যাল অক্সিজেন বলে।

কোভিড-১৯ ও অক্সিজেন : ইতোমধ্যে আমরা অনেকে জেনে ফেলেছি, কোভিড-১৯ রোগটি ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃদু, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাঝারি ও ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে মারাত্মক রূপ ধারণ করে। এ ছাড়া আমরা অনেকেই এটাও জানি, এখন পর্যন্ত কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে কার্যকর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধই আমাদের হাতে নেই। অর্থাৎ যে ২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ মারাত্মক লক্ষণ নিয়ে প্রকাশ পায়, তাদের জন্য অক্সিজেনই একমাত্র ওষুধ, শেষ চিকিৎসা।

কেন কোভিড রোগীদের জন্য অক্সিজেন আবশ্যক : ঝঅজঝ ঈড়ঠ-২ ভাইরাসটি ফুসফুসে প্রবেশের পর সেখানে নানা রকম ক্ষতি সাধন করে। কখনো ভাইরাল নিউমোনিয়া বা প্রদাহ, কখনো সেপটিসেমিয়া, কখনো এআরডিএস (অজউঝ) কিংবা গুরুতর শ^াসজনিত সমস্যা, কখনো পালমোনারি এমবোলিজম অথবা রক্ত জমাটবাঁধাজনিত ক্ষতি। ক্ষতির ধরন যেটিই হোক, শেষ পর্যন্ত সমস্যা হয় ফুসফুস থেকে অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া- যেহেতু বাতাস থেকে অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করানো এবং শরীর থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করাই ফুসফুসের প্রধান কাজ। এমন পরিস্থিতিতে এ সমস্যার এখন পর্যন্ত একটিই সমাধান হলো বাড়তি অক্সিজেন প্রবেশ করিয়ে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য ব্যবস্থা করা।

কীভাবে অক্সিজেন চিকিৎসা দেওয়া হয় : মনে রাখতে হবে, অন্যান্য ওষুধের মতোই অক্সিজেন একটি বিধিবদ্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সরবরাহ মাস্ক বা যন্ত্রের সাহায্যে দিতে হয়- যেন রোগী সর্বোচ্চ আকাক্সিক্ষত অক্সিজেন মাত্রা অর্জন করতে পারেন। অক্সিজেনের কাক্সিক্ষত মাত্রা নির্ধারণের জন্য পালস অক্সিমিটার নামের ছোট একটি যন্ত্র আঙুলে লাগিয়ে দেখতে হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে রক্ত (অইএ) পরীক্ষা করে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের অম্লতাও নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসক শরীরে অক্সিজেনের সম্পৃক্ততা বা শতাংশ নির্ণয়ের পর ঠিক করেন কোন পদ্ধতিতে কাকে কী পরিমাণ অক্সিজেন দিতে হবে। যেমন- যখন সম্পৃক্ততা শতকরা ৯২ শতাংশের নিচে চলে যায়, তখন রোগীকে ন্যাসাল ক্যানুলারের মাধ্যমে ০-৬ লিটার/মি. (২৫-৪৫ শতাংশ অক্সিজেন) পর্যন্ত অক্সিজেন দেওয়া যায়। পরে অক্সিজেন ঘাটতির পরিমাণ সাপেক্ষে ফেস মাস্ক, নন-রিব্রিদার মাস্ক, হাইফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা ইত্যাদির মাধ্যমে যথাক্রমে ৬-১০ লিটার/মি. (৩৫-৬০ শতাংশ অক্সিজেন), ৬-১৫ লিটার/মি. (৮০-১০০ ভাগ অক্সিজেন), ৩০-৭০ লিটার/মি. (১০০ ভাগ) পর্যন্ত অক্সিজেন দেওয়া যায়। আবার ভেন্টুরি মাস্ক নামক ছোট একটি প্লাস্টিকের ভাল্বযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করলে অক্সিজেন ফ্লো ও বাতাসের সঙ্গে এর সংমিশ্রণের মাত্রা (ঋরঙ২)- উভয়ই সুনিয়ন্ত্রিত করা যায়। এখানে আলোচিত ডিভাইসগুলো প্রতিটি প্লাস্টিকের তৈরি অত্যন্ত সাধারণ অনুষঙ্গ। কিন্তু অক্সিজেনথেরাপি দেওয়ার জন্য এগুলো অত্যাবশ্যক। এর পরও রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে অথবা রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়ার কারণে অম্লতা বৃদ্ধি পেলে রোগ মারাত্মক জটিল অবস্থা বা ‘রেসপিরেটরি ফেইলিউর’ পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেটর মেশিন (যেমন- ঈচঅচ বা ইওচঅচ) অথবা ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন প্রয়োজন হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে কখন কতটুকু অক্সিজেন কীভাবে দিতে হবে, তা একান্ত কৌশলগত ব্যাপার এবং এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। বিশেষত যে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি শ^াসকষ্টের সমস্যাযুক্ত রোগে ভুগছেন (ঈঙচউ, উচখউ ইত্যাদি), তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট মাত্রার অধিক অক্সিজেন প্রয়োগ করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে।

অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা : কোভিড-১৯ দ্বারা সৃষ্ট জরুরি অবস্থা আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার একটি পরীক্ষা। ব্যবস্থাপকরা কতটা দ্রুততা ও সাফল্যের সঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে পারবেন, সেটি তাদের দক্ষতার নির্ণয়াক হতে পারে। এ জন্য সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতাল সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা তৈরি করার এখনই সময়। জাতীয় বাজেটে কোভিড ১৯-এর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ এ খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা (যেমন- মেলিন্ডা-গেটস ফাউন্ডেশন) অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য কোভিড-পূর্ব থেকে বিপুল সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করে। তাদের এই সহযোগিতার মূল উদ্দেশ্য- অক্সিজেন একটি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা। তাই যে কোনো মুমূর্ষু রোগীর জন্য এটা অত্যাবশ্যক। যেমন- শিশুদের নিমোনিয়াজাতীয় রোগে অক্সিজেনের ব্যবহার শিশুমৃত্যু কমিয়ে দিতে পারে। তা ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষ অর্জনে সহায়ক। অর্থাৎ বর্তমানে কোভিড-১৯ উপলক্ষে এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে কোভিড-পরবর্তী আমরা এর সুবিধা ভোগ করব এবং তা টেকসই উন্নয়নে সঠিক বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

কীভাবে পরিকল্পনা করতে হবে : কোভিড-১৯ পৃথিবীতে আবির্ভাবের ১৫ মাস হলেও হয়তো আগামী বেশ কিছুদিন এই কঠিন সময় বজায় থাকবে। গত ১৫ মাসে আমাদের দায়িত্ব ছিল সম্ভাব্য রোগীর সংখ্যা, সে অনুপাতে সম্ভাব্য হাসপাতাল বেড সংখ্যা এবং প্রতি বেডে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন হিসেবে সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় সর্বমোট অক্সিজেনের পরিমান নির্ধারণ করা। এই পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। যেমন- ১০০ বেডের একটি কোভিড হাসপাতালের জন্য মোট ২.৫ ঘনমিটার প্রতিদিন লিকুইড অক্সিজেন অথবা ৯০ ঘনমিটার প্রতিঘণ্টা জেনারেটর প্লান্ট অক্সিজেন সরবরাহ প্রয়োজন। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এবং সম্ভাব্য গাইডলাইন অনেক আগেই প্রণয়ন করেছে। যেহেতু কোভিড একটি জনযুদ্ধ, সেহেতু অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে সবপর্যায়ে অনেকেই অবদান রাখতে পারেন। যেমন- দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিরা হাসপাতালগুলোর জন্য অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনে অনুদান দিতে পারেন। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার মালিক- যাদের শিল্প উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিক অক্সিজেন তৈরি করতে হয়, তারা সেটিকে মেডিক্যাল অক্সিজেনে রূপান্তরিত করে সরবরাহ করতে পারেন। এই অক্সিজেন পরিবহনের জন্য বিভিন্ন সাইজের সিলিন্ডার প্রয়োজন। এর অপ্রতুলতা রয়েছে। আমাদের প্রকৌশলীরা ভেবে দেখতে পারেন স্টিল মিলগুলোয় এগুলো তৈরি করা সম্ভব কিনা। এতে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমতে পারে।

ব্যবহারকারীদের জন্য তথ্য- যা অবশ্যই মনে রাখতে হবে :

১. অক্সিজেন একটি ওষুধ। এটি সঠিক মাত্রা ও নিয়মে দিতে হবে। তাই হাসপাতালে ও চিকিৎসকের পরামর্শে অক্সিজেনথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন। ২. অক্সিজেনথেরাপি দেওয়া হচ্ছে- এমন রোগীর সামনে ধূমপান অথবা অন্য কোনো আগুনের উৎস্য সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। ৩. মনে রাখবেন- যেহেতু কোভিড-১৯ রোগীদের উচ্চমাত্রার অক্সিজেন প্রয়োজন, সেহেতু একটি মাঝারি সাইজের অক্সিজেন ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে খালি হয়ে যায়। এ সময় অক্সিজেনের অভাবে রোগী খারাপ হয়ে যাবেন। তাই বাড়িতে সিলিন্ডারের মাধ্যমে এই চিকিৎসা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ৪. অক্সিজেন সিলিন্ডার বাড়িতে মজুদ করবেন না। আপনার এই মানসিকতার জন্য হয়তো একজন মুমূর্ষু রোগী অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হবেন।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সবার উপলব্ধি, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার ও সঠিক বিনিয়োগ ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সব সময় অগ্রাধিকারভিত্তিক বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেন। অক্সিজেনব্যবস্থার উন্নয়ন স্বাস্থ্য খাতে শুধু বর্তমান চাহিদাই মেটাবে না, বরং ভবিষ্যতে এ খাতে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষ বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ যেভাবে বিশে^ দুর্যোগ মোকাবিলা, শতাব্দী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কিংবা ডিজিটালব্যবস্থা উন্নয়নের বিশে^ রোল মডেল, একইভাবে এ দেশ প্রধানমন্ত্রীর সঠিক নির্দেশনা ও সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় কোভিড ১৯-এর প্রথম ঢেউ মোকাবিলায় রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর প্রমাণ ব্লুমবার্গ কোভিড সহনশীলতাক্রম অনুযায়ী আমাদের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম এবং বিশে^র ২০তম। তাই কোভিড ১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় আবারও আমরা সফল হব- এটিই আমাদের বিশ^াস।

 

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ এবং কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

 

 

 

 

advertisement