advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পাকিস্তানের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধাস্ত্র : ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে অস্থিতিশীল করে তুলছে দক্ষিণ এশিয়াকে

অনলাইন ডেস্ক
৮ এপ্রিল ২০২১ ১৮:১৫ | আপডেট: ৮ এপ্রিল ২০২১ ১৮:১৬
advertisement

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারের সময় প্রায়ই আমাদের সামনে কিছু ভিডিও বা সংবাদের লিংক চলে আসে। যেমন- ভারত-নেপাল সীমান্ত সংঘর্ষের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘গোর্খা সেনাদের নির্যাতনের’ ভিডিও দেখুন। অথবা ‘ভারতে ইসলামফোবিয়া’র নিন্দা জানিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিবেদন; ‘ভারত-চীন সীমান্ত বিবাদের সময় চীনের হাতে ভারতীয় সেনাদের হত্যার’ ভিডিও এবং ছবি দেখতে চান? এ ধরনের লিংকে ক্লিক করা মানেই আপনি দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ভুয়া খবরের ফাঁদে পা দিলেন। আর আপনি যদি এর একটিও বিশ্বাস করেন তাহলে যারা এ ধরনের ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেয় তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ হলো। কোথায় এবং কীভাবে এ ধরনের ভুয়া খবর তৈরি করা হয়। এসব খবর কীভাবে সহিংসতা ও উত্তেজনা উস্কে দিচ্ছে এবং এর পেছনে পরিকল্পিত নেটওয়ার্কগুলো সামনে নিয়ে আসতে গবেষণা করেছে ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)।

এমআইটির গবেষণায় দেখা গিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় মূল সংবাদের তুলনায় ভুয়া সংবাদগুলো ছয়গুণ বেশি দ্রুততগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, ‘সব ক্যাটাগরির সত্য তথ্যের তুলনায় মিথ্যা তথ্যগুলো আরও বিস্তৃতভাবে, দ্রুতগতিতে এবং গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।’

কোনো ভুয়া নিউজ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শনাক্ত করা খুব কঠিন বিষয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের সংঘবদ্ধ কাজের প্রথমদিকের উদাহারণ ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার বোমা হামলা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে পালনের সময় কয়েকদফা বোমা হামলায় বহুপ্রাণহানি হয়। এই হামলার পরপরই একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি দেশ থেকে শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কানদের লক্ষ্য করে বিপুল পরিমাণ ভুয়া খবর প্রকাশিত হতে থাকে।

এমআইটির গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি অথবা ভুলতথ্য ছড়িয়ে দিয়ে চলমান বিবাদকে আরও উসকে দিতে এ অঞ্চলে অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করা হয়েছে।

মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যেসব মাধ্যম ব্যবহার করা হয় তারমধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টুইটার লুফোল বা ফাঁকফোকর। এই অস্ত্রটি এতোটাই শক্তিশালী যে শুধুমাত্র এটির সুবিধা নেওয়ার জন্যই সাউথ এশিয়ান ইউনাইটেড সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রন্ট (এসএইউএসএমএফ) নামে একটি ভুয়া সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যমে কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় সহিংসতা আরও উসকে দেওয়া হয় এমআইটির গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হলো।

টুইটারের সুবিধা-দুর্বলতা

২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল অন্যতম ভয়াবহ বোমা হামলায় শ্রীলঙ্কায় ৩০০ জন নিহত এবং আরও ৫০০ জন আহত হন। ভয়াবহ এ হামরায় যখন পুরো বিশ্ব বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল এবং এর পেছনে ইসলামপন্থী চরমপন্থী দলগুলোর নাম শোনা যাচ্ছিল। শ্রীলঙ্কার একটি ‘বন্ধু প্রতিবেশি দেশ’ এ ট্র্যাজেডিটিকে ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা খবর ছড়াতে থাকে যে শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু তামিলদের নিশানা করে এই বোমা হামলার পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। নিজেদের পুরনো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা শ্রীলঙ্কার বোমাহামলার খবরগুলোয় মতামত জানাতে থাকে। ভারত এই বোমাহামলার সঙ্গে জড়িত এ ধরনের মতামতে ভেসে যেতে থাকে খবরের কমেন্ট বিভাগ। 

দক্ষিণ এশিয়ায় এই ‘বন্ধু প্রতিবেশীকে’ সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে কি? ধীরে ধীরে পাকিস্তানের একাশিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘বিশেষজ্ঞরা’ ভুয়া বিবরণ দিয়ে বোঝাতে থাকে যে এর পেছনে ভারতের আরএডব্লিউ এবং শ্রীলঙ্কার তামিলদের হাত রয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত জানা যায় এ হামলার পেছনে ইসলামি চরমপন্থী দল আইএসআইএস এবং ন্যাশনাল জামাত ছিলো। এ তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে পাকিস্তান তা আরও আগ্রাসীভাবে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। টুইটারের ‘নাম পরিবর্তনের সুবিধা’ কাজে লাগিয়ে শ্রীলঙ্কার আইডি ব্যবহার করে তারা এ খবরের বিপরীতে মিথ্যা খবরগুলো ছড়িয়ে দিতে থাকে। অনেক পাকিস্তানিই রাতারাতি তাদের টুইটার অ্যাকাউন্ট নাম, বিও পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কান হয়ে যান। এমনকি শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করেও এসব আইডি তৈরি করা হয়।

ভারতে ইসলামভীতি?

২০২০ সালে কোভিড লকডাউনের সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতে ইসলামভীতি নিয়ে একের পর এক খবর প্রকাশিত হতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং টুইট করতে বাধ্য হন। জানা যায়, পাকিস্তানের একটি নেটওয়ার্ক থেকে ভারতে ইসলামফোবিয়া নিয়ে ভুয়া খবর প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে তারা টুইটারের সেই নাম পরিবর্তনের সুবিধাটিই ব্যবহার করেছে। এসব পাকিস্তানি ভুয়া আইডির একটি ছিলো @সাইয়িদামোনা, ওমানের প্রিন্সেস মোনা বিনতে ফাহাদ আল সাইদের নামে। পরিস্থিতি  এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে প্রিন্সেস টুইট করে জানান তার নামের এই আইডি ভুয়া এবং প্রোফাইলে তার ছবিটিও নকল করা হয়েছে।

ভুয়া আইডি

এদিকে ইউজার নেম ও ডিসপ্লে নাম পরিবর্তনের বিষয়গুলো কোনোরকম ভেরিফিকেশন ছাড়াই টুইটার অনুমোদন দেওয়ার কারণে এ ধরনের ফেক আইডি তৈরি খুব সহজ। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ধনী ব্যক্তি অ্যালন মাস্কের নামে এ ধরনের ভুয়া অ্যাকাউন্ট পেয়ে টুইটার একটি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চালু করে। তবে এই সুবিধাটি মাস্ক শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে পাবেন। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করে পাকিস্তান ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়াকে নিশানা করে পাকিস্তানে ভুয়া সংবাদের কারখানা

পাকিস্তান থেকে ভুয়া খবর সরবরাহকারীরা যখন বোঝতে পারলেন টুইটারের নাম পরিবর্তনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় মিথ্যা তথ্যের বীজ রূপন এবং সমস্যা সৃষ্টি করতে পারছে তখন তারা নিজেদের এই কার্যক্রমকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইল। আর এভাবেই তারা এসএইউএসএমএফ গঠন করল। প্রথমেই সংগঠনটি টুইটারের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে তারা এটি ওয়েবসাইট তৈরি করে। পাকিস্তান থেকে প্লাটফর্মটি পরিচালিত হয় এবং মিথ্যা দাবি করা হয় যে ‘এটি পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার’ মতো দক্ষিণ এশিয়ার মতো দেশগুলো থেকে সদস্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে তারা এখানে কিছু ভুয়া রাশিয়ান ও শ্বেতাঙ্গদের অ্যাকাউন্ট খোলে। তবে এসব আইডির একটিও অন্যকোনো দেশের নয়, সবগুলোই পাকিস্তানের।

advertisement