advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ফজলুল হালিম চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুঃসময়ের কা-ারি

অজয় দাশগুপ্ত
৯ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৮ এপ্রিল ২০২১ ২১:৪৪
advertisement

অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকে নিষ্ঠুর সামরিক শাসন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছর ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। একটিতে ছিলেন অধ্যাপক ড. মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক কবির চৌধুরী ও ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী। ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান আইনবহির্ভূতভাবে উপাচার্য ড. আবদুল মতিন চৌধুরীকে পদত্যাগে বাধ্য করে। জনপ্রিয় এ উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানানো। আমি সে সময় ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সিনেট সদস্য ছিলাম। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর বিকেলে উপাচার্যের শূন্যপদ পূরণের জন্য সিনেট সভা আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু বাসভবন পর্যন্ত শোক মিছিল বের করা হয়। আমরা কয়েকজন উদ্যোগী হয়ে সিনেটে বঙ্গবন্ধু হত্যার নিন্দা ও হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে প্রস্তাব পাস করি। এর পর সিনেট সভা মুলতবি হয়ে যায়। উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের জন্য ২৯ জানুয়ারি (১৯৭৬) ফের সিনেট সভা আহ্বান করা হয়। দুটি প্যানেল উপস্থাপন হয়- বঙ্গবন্ধু সমর্থকদের প্যানেলে ছিলেন অধ্যাপক ড. মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক কবির চৌধুরী ও ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী। আমাদের ধারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দৃঢ় বিশ্বাসী ড. মতিন চৌধুরী কিংবা কবির চৌধুরীকে সামরিক সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে স্বীকৃত ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করবে না। এ জন্য তিনজনের প্যানেলে এমন একটি নাম নির্বাচন করা হয়- যিনি মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ সমর্থক কিন্তু তুলনামূলক কম পরিচিত। ফজলুল হালিম চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগেও শিক্ষকতা করেছেন। তবে ‘আওয়ামী মহলের লোক’- গোয়েন্দা নথিতে এমন ‘বদনাম’ কম। বয়সও তুলনামূলক কম- মাত্র ৪৬ বছর। আমাদের প্রতিপক্ষ যে প্যানেলটির প্রতি সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের একনিষ্ঠ সমর্থকরা সমর্থন দিয়েছিলেন, এতে এক ও দুই নম্বরে নাম ছিল বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ ও ইংরেজি বিভাগের ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর। জিয়াউর রহমান তখন ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক ভিত গড়ার জন্য চেষ্টা শুরু করেছেন। ড. মতিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কয়েকটি ‘মিথ্যা মামলা’ করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসে ‘আওয়ামী-বাকশালিদের কল্লা চাই’- প্রতিদিন এ স্লোগানসহ মিছিল চলছে। সংবাদপত্রে চলছে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিরামহীন কুৎসা রটনা। এমন পরিস্থিতিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সভায় ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক কবির চৌধুরী ও ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী উপাচার্য প্যানেলের সদস্য নির্বাচিত হন। সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান এ প্যানেলের কাউকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দিতে প্রবল আপত্তি তোলেন। উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ১৫ জানুয়ারি খুব ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রাবাস (রোকেয়া ও শামসুন্নাহার হলসহ) আর্মি-পুলিশ-বিডিআর দিয়ে ঘেরাও করে এক হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা অঙ্গনে আটক রাখা হয়। সারাদিন তাদের অভুক্ত রেখে সন্ধ্যার দিকে একদলকে আটক এবং অন্যদলকে বেত্রাঘাত করে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি ছিলাম বেত্রাঘাতপ্রাপ্তদের দলে। পরে জেনেছি, আমি জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য হলেও গোয়েন্দারা আমাকে ভিড়ের মধ্যে চিহ্নিত করতে পারেনি। এ কারণেই ২৯ নভেম্বর সিনেট সভায় আমি যোগদান করতে পারি।

সিনেটে আমাদের প্যানেল জয়ী হওয়ার পর শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র- বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের কাউকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া চলবে না। কিন্তু সে সময়ে চ্যান্সেলরের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ছিলেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল। এ দু’জনের ‘জেদের কারণে’ উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জিয়াউর রহমান আমাদের প্যানেলকে নাকচ করে দিতে পারেননি। তবে প্যানেলের শীর্ষ দুটি নাম বাদ দিয়ে ফজলুল হালিম চৌধুরীকে তারা বেছে নেন। আমরা চেয়েছি, বাংলাদেশের চরম দুঃসময়ের মধ্যেও এমন কেউ এই মহান প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে আসুন- যিনি সামরিক শাসকদের হাতের পুতুল হবেন না। ফজলুল হালিম চৌধুরী এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন।

আমি সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেই ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করছি। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের রাতেই ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (সিনেট সদস্য) মাহবুবজামান ও আমার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। কয়েকদিন পরই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। সামরিক শাসকরা বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের কর্মসূচি পালন করতে দেবে না। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরীর অনমুতি নিয়ে ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠান করি। ২০ ফেব্রুয়ারি ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করেন। এতে ঠিক হয়, জাতীয় ছাত্রলীগের সমর্থক ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ব্যানারে নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও আজিমপুর শহীদদের কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। এভাবে আমরা উপাচার্যের সহযোগিতায় ছাত্রনেতা-কর্মীদের মিছিল থেকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিতে পারি।

আমি ১৯৭৬ সালের শেষ সময় পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনে জড়িত ছিলাম। এ সময়ে গোয়েন্দারা উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরীর ওপর বহুবিধ চাপ সৃষ্টি করেছে- যাতে তিনি আমাদের হয়রানি ও ভোগান্তিতে ফেলেন। তিনি রাজি হননি, বরং নানাভাবে তার সহযোগিতা পেয়েছি। তিনি আমাকে গভীর রাতে বাসায় সময় দিয়েছেন। বিভিন্ন ছাত্রাবাস, টিএসসি এবং অন্যান্য স্থানে সভা করেছি। ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু বাসভবনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের ইমামকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকা-ের নিন্দা এবং তাদের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া পড়ানোর অনুমতি দিয়েছেন। সামরিক শাসকরা এসব ভালোভাবে নেয়নি। তার ওপর চাপ ছিল। কিন্তু তিনি আমাদের যতটা সম্ভব ছায়া দিতে চেষ্টা করেছেন।

আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীর প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা।

অজয় দাশগুপ্ত : সিনিয়র সাংবাদিক

advertisement