আশ্বাস নয়, শিক্ষার্থীরা চান দাবির বাস্তবায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ মার্চ ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৯ ০৮:৪২

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাদের সকল দাবিপূরণের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করলেও আরেকটি অংশ গতকালও ছিল রাজপথে। কোনো আশ্বাস নয়, তাদের আনীত সব দাবির বাস্তবায়ন দেখে তবেই রাজপথ ছেড়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহাম্মেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটে নামেন বিইউপি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শতাধিক শিক্ষার্থী। তবে পুলিশ অনুরোধ করায় তারা সড়ক অবরোধ করেননি। নিরাপদ সড়কের বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার হাতে শান্তিপূর্ণভাবে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন আন্দোলনকারীরা। শুধু তাই নয়, পুলিশ সদস্যদের লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি দুপুরের কড়া রোদে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনরতদের খাবার পানিও এগিয়ে দিয়েছেন মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা।

প্রসঙ্গত, গত বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অপর একটি অংশের ভাষ্য, ৯ মাস আগে যে আন্দোলন হয়েছিল, বিভিন্ন আশ্বাসে সে আন্দোলন স্থগিত করা হয়। কিন্তু সে সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটিই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাই তারা রাজপথ ছাড়ছেন না। এদিকে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গতকাল সকাল থেকেই বসুন্ধরা গেট এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সাইন্সল্যাব মোড়েও অবরোধের চেষ্টা চালান ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী। তবে পুলিশ তাদের সড়ক অবরোধে বাধা দেয়। এর পর আন্দোলনকারীরা সড়কের এক পাশে অবস্থান নেন।

তবে আন্দোলনে শামিল থাকার ঘোষণা দিলেও ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এবং কলাবাগান এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের গতকাল সড়কে দেখা যায়নি; এসব এলাকার সড়কে তাই যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বেলা সোয়া ১১টার দিকে প্রগতি সরণিতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী জড়ো হলে পুলিশ তাদের চলে যেতে অনুরোধ করে। পুলিশের সঙ্গে কিছু সময় আলোচনার পর তারা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ৮ দফা দাবি আদায়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। দুপুরে ডিএমপির বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) আহমেদ হুমায়ূন বলেন, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন করছে। এতে যান চালাচলে কোনো সমস্যা না হওয়ায় আমরা তাদের বাধা দিচ্ছি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

প্রগতি সরণিতে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ইউআইইউ শিক্ষার্থী ফয়সাল কবীর, তামান্নাসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, আমরা অনেক আন্দোলন দেখেছি। শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। আমরা তাই বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে নেমেছি। আমরা দেখতে চাই, সরকারের দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন। মানববন্ধন থেকে বিইউপির বিবিএ শিক্ষার্থী নাজমুল করিম বলেন, ডিএনসিসি মেয়র বলেছেন, আমাদের দাবিগুলো পূরণে সাত দিনের মধ্যে তারা পরিকল্পনা করবেন। আমাদের প্রশ্ন, মেয়র সাহেব সাত দিন সময় চেয়েছেন পরিকল্পনা করার জন্য। তা হলে বিগত আট মাস সরকার কী করেছে? তিনি প্রশ্ন রাখেন, সেনানিবাস এলাকায় যেভাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যানবাহন চলে, সারাদেশে কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না?

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া একই প্রতিষ্ঠানের অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, বুধবার মেয়রের সঙ্গে যারা মিটিং করেছেন, তারা কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ না। আমাদের এ আন্দোলনের কোনো মুখপাত্র নেই। যারা প্রেস ব্রিফিং করেছেন, তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই করেছেন। আমরা যেহেতু সবাই আন্দোলন করছি, সবার মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। তারা আন্দোলনে আসেননি। তাদের কথায় মানুষ আরও বিভ্রান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দাবি বাস্তবায়নের পরই আমরা আন্দোলন স্থগিত করব। দুপুর দেড়টার দিকে মানববন্ধনস্থলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন ডিএমপির গুলশান জোনের ডিসি মোস্তাক আহমেদ। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাকে ও অন্য পুলিশ সদস্যদের লাল গোলাপ দিয়ে স্বাগত জানান। এর পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি দাবির বিষয়ে কথা বলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ শেষে মোস্তাক আহমেদ বলেন, আমরা অনুরোধ করেছি, তারা যেন রাস্তা ব্লক না করেন, জনভোগান্তি সৃষ্টি না করেন। তাদের কর্মসূচি যাতে শান্তিপূর্ণ থাকে। শিক্ষার্থীরা পুলিশের ডাকে শুধু সাড়াই দেয়নি, তারা পুলিশকে লাল গোলাপ দিয়েও শুভেচ্ছা জানিয়েছে। পরিশ্রান্ত পুলিশদের তারা পানিও সরবরাহ করেছেন।

বিক্ষোভে রাবি শিক্ষার্থীরাও রাবি প্রতিনিধির গতকাল পাঠানো খবরে বলা হয়, বাসচাপায় আবরারের মৃত্যুর প্রতিবাদ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা।

এদিন বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। মিছিল থেকে শিক্ষার্থীরা আবরার নিহতের ঘটনাকে তদন্ত করা এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান।

সেই বাসটির বিরুদ্ধে ছিল ২৭ মামলা ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতাবিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় গতকাল ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া জানান, আবরার আহাম্মেদ চৌধুরীকে চাপা দেওয়া বাসটি যে রুটে চলছিল, সেই রুটের রুট পারমিট ছিল না। ছিল ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুট পারমিট। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করায় এর আগে ২৭ বার মামলাও হয়েছে বাসটির বিরুদ্ধে। তা হলে বাসটি রাজধানীতে কীভাবে চলাচল করছিল? ডিএমপি কমিশনার এমন প্রশ্ন রেখে মন্তব্য করেন, এ অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই দায়ী।