প্রতিহিংসার রাজনীতি করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না

নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:০২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। প্রতিহিংসার রাজনীতিতেও বিশ্বাসী নয়। আমরা যদি তা-ই বিশ্বাস করতাম, তা হলে এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না। কারণ বিএনপির দ্বারা আমরা যে পরিমাণ হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছিÑ তা আর কেউ হয়নি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

রুমিন তার প্রশ্নে দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা থেকে মশা মারা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রয়োজন

হয় দাবি করে এটাকে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া, অকার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত। এ অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার চিত্র বহন করে না?

জবাবে সংসদ নেতা বলেন, বিএনপির এমপির প্রশ্ন অনাকাক্সিক্ষত, অসংসদীয় ও অবান্তর। ওই সংসদ সদস্য মানুষ হত্যা ও মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, জনগণ আমাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম-আয়েশে আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার একটি আলাদা জায়গা রয়েছে। সেটিই আমি প্রতিপালন করার চেষ্টা করি। সে জন্যই দিন-রাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় রাখার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকি।

তিনি দেশের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করছে বলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তা না করে সংসদ সদস্যের (রুমিন) নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেই কি প্রশ্নকারী খুশি হতেন?

অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ বিএনপি সৃষ্টি করেছিল মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী (খালেদা জিয়া) ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত নিত তার পুত্র হাওয়া ভবন থেকে। মন্ত্রী-সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ত থাকার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ আমার মা, তিন ভাই এবং ভাইয়ের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনিদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিহিংসার বলি হয়ে জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হন জাতীয় চার নেতা। জিয়াউর রহমান এ দেশে হত্যা, ক্যু, অপরাজনীতি শুরু করেন। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করেন। একটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেন। এ কারণে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলীলায় চলে আসে। এটা তো তাদের দলীয় আদর্শ।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের চেয়েও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া এককাঠি সরেস, সে প্রমাণ তিনি রেখেছেন। এ দেশে জঙ্গি সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানি লন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাৎসহ হেন অপকর্ম নেই যা তিনি ও তার পুত্রদ্বয় এবং দলের নেতারা করেননি। এসব ধারণা থেকেই প্রশ্নকারী (রুমিন) আমাকে খালেদা জিয়ার সমান্তরালে ফেলেছেন।

গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ নির্বাচিত করে আমাকে সংসদে পাঠিয়েছে, আমি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিÑ যেখানেই থাকি না কেন আমি সব সময় মনে করি, জনগণের ভালো-মন্দ দেখা আমার দায়িত্ব। আমি তো আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না; দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে উঠি না। বলতে গেলে আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টা ঘুমের সময় পাই।

ডেঙ্গু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে নয়, আশপাশের দেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে। মহামারী আকার বলা হচ্ছে, প্রকৃত অর্থে মহামারী আকারে হয়েছে ফিলিপাইনে। আমাদের ১৬ কোটি ৩৫ লাখ মানুষের দেশে যে সংখ্যা দেখছি, ফিলিপাইনে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৫শ লোক মারা গেছে। আমাদের দেশে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে দেইনি, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওষুধ কেনার ব্যাপারে যারা দায়ী বা সত্যি কেন কাজ হয়নিÑ এ ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ নেতা বলেন, ৬ আগস্ট থেকে বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে দেশেই ডেঙ্গু শনাক্তের কিট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে দিনে প্রায় ৩৫ হাজার কিট সরবরাহ সম্ভব হবে।

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নুর প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশ যাতে ন্যায্য হিস্যা পায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ হ্রাসের বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং এটি সুরাহার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ভারতের সঙ্গে আমাদের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে এখনো তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। অক্টোবরে ভারত সফরের সময়ও আমি এ বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করব।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সংরক্ষিত আসনের রুমানা আলীর প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জানান, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন না হওয়া, রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ পরিবার অনুযায়ী ভেরিফিকেশন না করা, নিজ বাসস্থান বা গ্রামে ফেরত ও স্থাবর সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবিকার অধিকারসহ অন্যান্য নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তার অভাব এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া।