চেতনায় ভাসানী -মযহারুল ইসলাম বাবলা

১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০৫

১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ শোক এবং বেদনাবিধুর স্মৃতিময় একটি দিন। এ দিনের শোক ব্যক্তিবিশেষের একার নয়, সামষ্টিক। এই দিনে এ দেশের অগণিত মানুষকে শোকবিহ্বল করে চিরবিদায় নেন মেহনতি-শ্রমজীবী, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের কা-ারি, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু আপসহীন সংগ্রামী জননেতা মওলানা ভাসানী। সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারে তার জন্ম। শৈশবেই পিতৃ-মাতৃস্নেহবঞ্চিত অনাথ চেগা মিয়া চাচার আশ্রিত এবং চাচাই তাকে প্রতিপালন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি বেশি দূর এগোতে পারেননি। পরে ভর্তি হন পশ্চাৎপদ মাদ্রাসা শিক্ষায়। ভারতের দেওবন্দ থেকে শিক্ষা সমাপ্ত শেষে হতে পারতেন মাদ্রাসাশিক্ষক অথবা মসজিদের পেশ ইমাম-মুয়াজ্জিম । অথচ তিনি এর কোনোটি হননি। তার শিক্ষার বৃত্ত ও সময়কে অতিক্রম করে মানব মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। তার অসীম সাহস আর নির্ভীক চেতনালব্ধ রাজনীতি আতঙ্কিত করেছিল স্থানীয় সামন্তদের যেমন, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী চক্রকেও। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আপসহীন তার সংগ্রাম আমৃত্যু সক্রিয় ছিল। কখনো ছন্দপতন ঘটেনি। জনগণের মুক্তি সংগ্রামে সারাজীবন অকুতোভয় মওলানা ভাসানী। কখনো বিচ্যুত হননি। আত্মসমপর্ণও করেননি। অবিচল ছিলেন মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ শাসকদের অনুগত-আজ্ঞাবহ সামন্ত জমিদারবিরোধী নানা কর্মকা-ের কারণে নিজ পৈতৃক ভূমি থেকে বিতাড়িত চেগা মিয়ার নতুন আশ্রয় আসামের ধুবড়ির নিকটবর্তী ভাসানচর। সেখানেও সামন্তবিরোধী লড়াই থেমে যায়নি। ভাসানচরের দারিদ্র্যপীড়িত কৃষক-শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠিত করে জোতদার-সামন্তদের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনে চেগা মিয়া হয়ে ওঠেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সেই থেকে পৈতৃক চেগা মিয়া নামটি ছাপিয়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী নামে পরিচিতি লাভ করে। আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ববাংলায় ফিরে আসেন এবং দ্রুত মোহভঙ্গে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে তারই নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লীগের লড়াই-সংগ্রামে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীই নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেল-জুলুমসহ নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তবে আপস-সমঝোতার নজির রেখে যাননি। আন্দোলনেই মুক্তি সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে নয়Ñ এ সত্যটি তিনি সারাজীবন ধারণ করেছেন। ক্ষমতার রাজনীতির শৃঙ্খলমুক্ত ছিলেন বলেই মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সারাটি জীবন অবিচল ছিলেন। কখনো সমাঝোতা বা আত্মসমর্পণ কোনোটি করেননি।

১৯৫৭ সালেই বক্তৃতা মঞ্চ থেকে পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আচ্ছালামু আলাইকুম’। বৈষম্যপূর্ণ পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর অধীন পূর্ব বাংলার মানুষের পক্ষে থাকা সম্ভব নয়, এ সত্যটি তিনি তখনই উপলব্ধি করেছিলেন বলেই পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে নির্ভয়ে ১৯৫৭ সালেই ঘোষণাটি দিয়েছিলেন। ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামো থেকে পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু এই স্বাধীনতা সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সে কারণে স্বাধীন দেশে তার সংগ্রাম থেমে যায়নি। আমৃত্যু জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিচল থেকেছেন।

মওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে প্রকৃত শত্রুকে তিনি যথার্থই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদবিরোধী তার অনড় অবস্থান সে প্রমাণই দেয়। বৈষম্যপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্রের অবসানে সারাটি জীবন লড়েছেন। আত্মসমর্পণ করেননি। নিজ দলের বর্ণচোরা চরম সুবিধাবাদী ডানপন্থিদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত বামরা দলে টিকতে না পেরে ভাসানীকে ডানপন্থি-সুবিধাবাদীদের কবলে ফেলে জনবিচ্ছিন্ন গোপন রাজনীতিতে চলে যায়। সে কারণে একার পক্ষে ভাসানীর কাক্সিক্ষত সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ন্যাপেও ভাসানী আজীবন থাকেননি। ন্যাপের সুবিধাবাদী চক্রের মতলব আঁচ করেই ন্যাপ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ সম্ভবত রাত সোয়া ৮টায় ভাসানীর মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্র ছুটে যাই ঢাকা মেডিক্যালের তিনতলার পরিচিত কেবিনে। করিডোরে উৎসুক মানুষ আর ভাসানীর অনুসারীদের ভিড়। ভিড় ঠেলে কেবিনের দরজায় ধাক্কা দিই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা খোলামাত্র ভেতরে ঢুকে দেখি চিরশয়ানে নিথর ভাসানী।

রাত ১০টায় ঢাকা মেডিক্যাল চত্বর লোকে লোকারণ্য। সামরিক শাসনের সেই ক্রান্তিকালে অত রাতে কেউ ঘরের বাইরে থাকার সাহস করত না। কিন্তু সেদিনের রাতটি হাজারো মানুষের সরব উপস্থিতি-আহাজারিতে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। কাফনে আবৃত করে বারান্দার মাঝখানে লাশ এনে রাখা হলো। লাশের চারপাশে বড় বড় বরফের চাঁই দেওয়া হলো। ডিউটিরত পুলিশ সদস্যরা দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছে। মরদেহের সামান্য দূরে বসে প্রখ্যাত শিল্পী মোস্তফা আজিজ এঁকে চলেছেন ভাসানীর শব ও পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলি। নিদ্রাচ্ছলে দেয়ালে হেলান দেওয়া পুলিশের স্কেচ শিল্পীর খাতায় দেখে কতিপয় পুলিশ তীব্র আপত্তি জানালে আমাদের প্রতিরোধে চুপ হয়ে যায়। ভোরের আগে ট্রাক এলো। মরদেহ ও বরফের চাঁই তুলে রওনা হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। ভাসানীর মরদেহ রাখা হলো টিএসসির অডিটোরিয়ামের পূর্ব-উত্তর কোণে। অন্ধকার কেটে ভোরের আকাশে আলো ফোটামাত্র নেমে আসে অগণিত মানুষের ঢল। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের লাইন দ্রুত দীর্ঘতর হয়ে যায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু দর্শনার্থী কমছে না। ক্রমেই মানুষের ঢল বাড়ছেই। সকাল সাড়ে ৯টায় প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীরের সঙ্গে এলেন প্রয়াত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা। আলমগীর কবীরের ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির সংগীতের কাজে তখন তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ভূপেন হাজারিকা টিএসসির উত্তর-দক্ষিণের লম্বা বারান্দার মাঝামাঝিতে অনেকক্ষণ থাকায় তার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাসানী সম্পর্কে। তিনি আসামের অধিবাসী। মওলানা ভাসানী দীর্ঘকাল আসামে ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসও ভারতে নজরবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ভাসানী ও তার রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ভূপেনের ছিল বলেই অকপটে বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভাসানীর অনড় অবস্থানের কারণে ভাসানীর প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার কথা। ভারতবর্ষের বড় মাপের শীর্ষ জাতীয়তাবাদী নেতাদের থেকে ভাসানীকে সহজে চেনা যায় তার রাজনীতির কারণেই। মেহনতি-শোষিত মানুষের মুক্তি সংগ্রামে আজীবন লড়েছেন। বিচ্যুত হননি কখনো।

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে জানাজা শেষে ট্রাকে করে লাশ হেলিপোর্টে রওনা হলে আমরা গাড়িতে রওনা হলাম সন্তোষ অভিমুখে। সন্তোষে দাফন শেষে শেষ বিকালে আবার ঢাকার পথে পাড়ি দিই। মওলানা ভাসানী কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধীই ছিলেন না, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তায় কীভাবে লড়তে হয়, সে শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। কেননা আগামী প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব ভাসানীর আজন্ম আকাক্সিক্ষত শ্রেণিহীন-বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তরুণরাই তো আমাদের ভরসার কেন্দ্রে। তাদের প্রতিই আমাদের সব প্রত্যাশা।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত