তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি

মাহামুদ সেতু
৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১২:৫৫ | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৩:০০
ফাইল ছবি

তামাক এমন একটি পণ্য যা অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যজনিত-সব ধরনের ক্ষতিই করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৮ সালে তামাকজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা গেছে। একই সময়ে দেশে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ার কারণে বছরে ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ৪ শতাংশ।

এর বাইরেও তামাক চাষের পরিবেশগত ক্ষতি, তামাক চাষে কৃষিজমি ব্যবহারের ফলে খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি, অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা ও ক্ষতি, পরিবেশ দূষণ এবং অন্যান্য ক্ষতি রয়েছে, যা ওই গবেষণায় পরিমাপ করা হয়নি।

সার্বিকভাবে তামাক দেশের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড়ো বাধা। যদিও তামাক কোম্পানিগুলো দাবি করে, এ খাত থেকে আহরিত রাজস্ব দেশের উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক শিল্প থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এটা তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চেয়ে সাত হাজার ৭৬০ কোটি টাকা কম।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ তামাকপণ্য কেনার ফলে এই রাজস্ব আহরণ সম্ভব হয়। কিন্তু তামাকের পেছনে এই ব্যয় অন্য কোনো উৎপাদনশীল কাজে লাগছে না। ফলে মানুষ একদিকে তামাকের পেছনে অপব্যয় করছে, অন্যদিকে তামাকজনিত রোগের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে তামাকের এই বিষচক্র ভেঙে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এজন্য ২০১৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় স্পিকারদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। তার সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি) ২০১৭ সালে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির খসড়া প্রস্তুত করে।

প্রস্তাবিত নীতির লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠির মধ্যে তামাক ব্যবহার শুরুর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা; ২০৩০ সালের মধ্যে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে জনগণকে সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করা; ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে তামাক উৎপাদন শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা এবং ২০৪০ সালের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।

তবে খসড়াটি তৈরির তিন বছর হয়ে গেলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি, যা সত্যিই হতাশাজনক। যদিও খসড়াটি চূড়ান্ত করার জন্য ইতিমধ্যেই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তামাক কোম্পানিগুলোর পক্ষে তদবির শুরু করেছে। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে তামাক কোম্পানিগুলোর মতামত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। বিষয়টা অনেকটা, মুরগি রক্ষায় শেয়ালের পরামর্শ নেওয়ার মতোই! যা দেশের তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোকে হতাশ করেছে।

সর্বশেষ গত ৫ ডিসেম্বর জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি) নীতিটি চূড়ান্ত করার বিষয়ে বৈঠক করেছে। বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুসারে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করতে হলে, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই যত দ্রুত এই নীতিমালা চূড়ান্ত হবে, তত দ্রুত আমরা দেশকে তামাকমুক্ত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারব। তাই তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা, নতুন বছরের শুরুতেই নীতিটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে আলোর মুখ দেখবে।

মাহামুদ সেতু
মিডিয়া ম্যানেজার, অ্যান্টি-টোব্যাকো প্রোগ্রাম
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ