‘ক্যাম্পাসের প্রাণ’ এনামুল ভাই

জাকির হোসেন তমাল
৮ জানুয়ারি ২০২০ ২২:১১ | আপডেট: ৮ জানুয়ারি ২০২০ ২২:৪৪
নিজের দোকানে এনামুল ভাই

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই চায়ের দোকান পরিচালনা করেন এনামুল ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটের সামনে তার চায়ের দোকানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা প্রতিদিন আড্ডা দেন। ছুটির দিনসহ যেকোনো দিন পাওয়া যায় এনামুল ভাইকে। এমনকি ঈদের ছুটি বা শীতকালীন-গ্রীষ্মকালীন ছুটিতেও ক্যাম্পাসে পাওয়া যায় এনামুল ভাইকে। তাই বলা যায়, এই এনামুল ভাইরা হলেন ‘ক্যাম্পাসের প্রাণ’।

এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুমের বাইরে এনামুল ভাইয়ের দোকান আরেকটি ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ ভাবলে ভুল হবে না। কেননা, এই দোকানে বসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষামূলক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে, দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীরা তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে এই দোকানে দিনের পর দিন আড্ডা দেন। অনেক সময় কাটিয়ে দেন গল্পের ছলে।

এই এনামুল ভাইয়ের দোকান সরিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পরিবহন মার্কেটের ছোট্ট খুপরিতে বসে তাকে ব্যবসা চালাতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে যেমন ব্যথিত হয়েছেন এনামুল ভাই, ঠিক তেমনি আমরা যারা সাবেক শিক্ষার্থী তারাও সমভাবে ব্যথিত হয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রশাসনের নয় যে, যখন যা ইচ্ছা তাই করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার আগে গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের। তারা যদি চান, এনামুল ভাইয়ের দোকান আগের স্থানে থাকবে, তাহলে সেটাই করতে হবে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক অনেক শিক্ষার্থী এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তারা চেয়েছেন, এনামুল ভাইয়ের দোকান আগের জায়গাতেই থাকুক। শিক্ষার্থীদের এই দাবি কোনোভাবেই ফেলে দিতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, শীতকালীন ছুটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক পুরোনো গাছ কেটে ফেলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই গাছগুলো যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ভালো রাখে তেমনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দিনের পর দিনে ছায়া দেয়। সেখানে বসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একের পর এক গাছ কেটে ফেলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেক বাধার মুখেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের এই ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটছে না। ক্যাম্পাসর পরিবেশ ঠিক রাখতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আরও জোর দাবি জানানো উচিত।

কিছু দিন আগে গণমাধ্যম খবর বেরিয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরগুলো সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির নামে ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাত পুকুর গবেষণা প্রকল্প’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও ফিসারিজ বিভাগের সহযোগিতায় এই প্রকল্প নিয়ে এরই মধ্যে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অথচ, এই প্রশাসনই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে নষ্ট করছে। শিক্ষার্থীদের আড্ডা স্থলগুলো দিনে দিনে সংকোচিত করছে। যা মোটেও কাম্য নয়।

ক্যাম্পাসে থাকতে এনামুল ভাইয়ের দোকানে দিনের কোনো না কোনো সময় আড্ডা দিয়েছি। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে, আবার কখনো বন্ধু বা রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এনামুল ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি। এখনো ক্যাম্পাসে গেলে এনামুল ভাইয়ের দোকানে বসি, তার হাতের চা খাই। আমার মতো অনেকেই হয়তো এনামুল ভাইয়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছেন, গল্প করেছেন। এনামুল ভাইয়ের দোকানের চা-সিগারেটে দিন পার করেছেন।

এনামুল ভাইয়ের আচরণ সম্পর্কে ক্যাম্পাসের সবাই হয়তো জানেন। তার মতো একজন শান্ত ও নরম স্বভাবের মানুষকে যে-কেউ ভালোবাসতে বাধ্য হবেন। শিক্ষার্থীরা তার কাছ থেকে যে কত ধরনের সহায়তা পেয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। তার দোকানের চা পান করেননি, এমন শিক্ষক-শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া যাবে না। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে যারা আছেন, তারাও যে কতদিন সেখানে বসে আড্ডা দিয়েছেন, সে কথা কি তারা ভুলে গেছেন? এমন খোলা-মেলা জায়গায় বসে আড্ডা দেওয়া নিশ্চয় তাদের খারাপ লাগেনি? তাহলে আজ কেন তার দোকান উঠিতে দিতে চাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তাই এনামুল ভাইয়ের দোকান যেখানে আছে, সেখানেই রাখা হোক। শিক্ষার্থীদের এই আবেগের জায়গাটি যেন নষ্ট করা না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুমেই শুধু শিক্ষা হয় না। ক্লাসের বাইরে এই এনামুল ভাইদের দোকানেও বিদ্যা অর্জন হয়। তাই এই বিদ্যা অর্জনের জায়গানি চালু থাকুক, সেই প্রত্যাশা।

জাকির হোসেন তমাল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র