মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় আতঙ্কে বাংলাদেশি প্রবাসীরা

বাইজিদ আল-হাসান,ওমান প্রতিনিধি
১৩ জানুয়ারি ২০২০ ১৭:০৮ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ ২০:৩৯

ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দেশটি। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে। ইরান যে কোনো ধরনের পাল্টা জবাব দেবে বলছেন বিশ্লেষকরাও।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হুমকি দিয়েছে- নতুন কোনো হামলা হলে ইরানের ভেতরে হামলা করবে ওয়াশিংটন। ৫২টি বিশেষ ইরানি স্থাপনায় হামলার জন্য ৫২টি বিশেষ যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

জাতিসংঘ দুটি দেশকে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বললেও তেমন কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। ইউরোপিয়ান দেশগুলো ট্রাম্পের আচরণে কিছুটা অখুশি হলেও সোলাইমানির হত্যাকে সবাই সমর্থন জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এমন টানটান উত্তেজনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশি প্রবাসীরা। যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে গোটা বিশ্বের তেলের বাজার পরিচালিত হয়, সেটি ওমান ও দুবাইর মধ্যবর্তী আরব সাগরে অবস্থিত। এ অবস্থায় ওমানের আট লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ওমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা বাংলাদেশ সোশ্যাল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সিরাজুল হক বলেন, ‘ইরান-আমেরিকা উত্তেজনায় আমরা ওমান প্রবাসীরা আতঙ্কে আছি। কারণ, এ যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের প্রবাসীদের ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়বে, সেইসঙ্গে এর প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সের উপর।’

তিনি আরও বলেন, ওমানে বাংলাদেশিদের বড় একটা শ্রম বাজার রয়েছে। এই শ্রম বাজারও কঠিন হুমকির মুখে পড়বে। আর এতে আমাদের দেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধের সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ওমানের সঙ্গে ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে যেমন, আছে আমেরিকার সঙ্গেও। একটা মধ্যস্ততা করবে দেশটি।’

ওমানে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ব্যবসা করছেন সাইফুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি। তিনি বলেন, ‘সমস্যা আপাতত দেখা না গেলেও স্বর্ণের দাম বেড়েছে। যুদ্ধ বাধলে আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে। জীবন-প্রতিষ্ঠান সবকিছুই হুমকির মুখে পড়বে।’

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। এমনিতেই ব্যাপক মাত্রায় দেশটি থেকে নিয়মিত ফেরত আসছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপড়েনেও মার্কিন মিত্র দেশ সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে কর্মসংস্থান হারানোর আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্য রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আবার অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে সাড়ে ৭ লাখের মতো প্রবাসী রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিয়ে আসছে দেশটি। এ কারণে সম্প্রতি ইরান সৌদি আরবের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলার হুমকি দিয়েছে। চলমান এই অস্থিরতায় বেশ আতঙ্কে আমিরাত প্রবাসীরাও।

ওমান প্রবাসীদের এমন উদ্বেগের ব্যাপারে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মাদ গোলাম সারোয়ারের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

তবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ও ওমানের বাংলাদেশ স্কুল মাস্কাটের সাবেক প্রিন্সিপ্যাল ড. মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদ (অব.) বলেন, ‘গত শুক্রবার ওমানের সুলতান কাবুসের মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কাবুস শুধুমাত্র ওমান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের স্থায়িত্ব, স্থিতিশীলতা বা পরিপক্কতার প্রতীক ছিলেন। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় অত্যন্ত গোপনে ইরান, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কাতার ও সৌদি আরবের মাঝে বিরোধ, ইরানের পারমাণবিক শক্তি নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের উত্তেজনা কমাতে ও সুলতান বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্য এখন কোন দিকে মোড় নেবে তা বোঝা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ইরান-আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ওমানে যে প্রবাসীরা হুমকির মুখে পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ নাই। ওমান ছাড়াও গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের মধ্যে হুমকি বিরাজ করবে। এর প্রভাব পড়বে রেমিটেন্সের উপরেও।