গবেষক ও গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে

২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০৭

উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এ হলো এমন এক প্রতিষ্ঠানÑ যেখানে বিদ্যা উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান সৃজন হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যতই বাড়ছে, ততই সেগুলো লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মূলত ডিগ্রি ও সনদপত্র বিপণনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ৪০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টিতে গত বছর কোনো জার্নাল প্রকাশিত হয়নি। গবেষণাকাজে বরাদ্দও অপ্রতুল ছিল। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাপ্ত বরাদ্দও খরচ করে না। গত বছর ব্যতিক্রম ছিল মাত্র ২টি বিশ্ববিদ্যালয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় গত বছর ২ হাজার ৩৫১টি জার্নাল প্রকাশ করেছে এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় করেছে ১৩২টি। অথচ ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো জার্নালই প্রকাশ করেনি গত বছর। বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ভবন নির্মাণের হিড়িক চলছে।

সম্প্রতি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক অসন্তোষ চলছে। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো কোনোটির শিক্ষা কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়ন ও দুর্নীতি চলছে অবাধে। অথচ শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করলেও কোনো জার্নাল প্রকাশ করেনি। ইউজিসির তদন্তে দেখা যাচ্ছে, গত বছর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় করেছে ৯০ লাখ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ৪০ লাখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ৭৫ লাখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় পৌনে ২ কোটি, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৭৫ লাখ এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১ কোটি টাকা। এভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কোনো গবেষণার খবর নেই। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যেমনÑ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে কোনো গবেষণাই হয়নি। এগুলো এ খাতে টাকাও নেয়নি, খরচও করেনি।

এভাবে চলতে থাকলে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। অথচ সরকারের কোটি কোটি টাকা এ খাতে ব্যয় হচ্ছে। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে ইউজিসিকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দিকনির্দেশনা দিতে হবে। এতে গবেষণাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে বাজেট বরাদ্দও বাড়াতে হবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলাদলিতে লিপ্ত শিক্ষকদের গুরুত্ব না দিয়ে প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ ও গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি। উন্নতমানের গবেষণা নিশ্চিত করার জন্য বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা দরকার। এর পাশাপাশি গবেষকদের জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও জ্ঞানবিনিময়ের জন্য দেশ-বিদেশে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করা গেলেই শিক্ষার সর্বস্তরে মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।