স্বাস্থ্যসেবায় বীমা ও আধুনিকায়ন সময়ের দাবি

ডা. ছায়েদুল হক
২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০৭

বর্তমান বিশ্বে জীবনব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই সমাজব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন নিরলস প্রচেষ্টা। মানুষ তার প্রতিটি কাজ সময়ের সঙ্গে সম্পন্ন করে এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে থাকে। এটিই স্বাভাবিক। এ জন্য সে প্রতিনিয়ত তার সক্ষমতা বাড়াতে চায়। তার জন্য প্রয়োজন সুস্থ থাকা। প্রত্যেক জাতির আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য নাগরিকের উন্নত স্বাস্থ্য একটি আবশ্যকীয় উপাদান। আর উন্নত স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে প্রত্যেক নাগরিকের অবাধ সুযোগ। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বলতে বোঝায় এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থাÑ যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের চিকিৎসা নিতে সক্ষম হবে এবং এখানে তার ব্যক্তিগত আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণ হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৪৯ সালে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘভুক্ত সব সদস্য দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় তিনটি বিষয়কে প্রাধিকারভুক্ত করা হয়ে থাকেÑ ১. স্বাস্থ্যসেবার সুযোগটি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা, ২. চিকিৎসাসেবার মান উন্নত রাখা ও ৩. আর্থিক টানাপড়েনে পড়ে কেউ যেন চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা মানে কেবলই ব্যক্তির চিকিৎসাপত্র প্রদান নয়, বরং আরও অনেক কিছু। চিকিৎসাপত্র প্রদান অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র ঘিরে একটি বিশাল আয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন চিকিৎসক, নার্সসহ বিশাল এক কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল। এটি সময়সাপেক্ষ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এর পরই আসবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ওষুধ, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। প্রযোজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করার জন্য বিশেষ যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও রোগ প্রতিরোধে বিশেষ পদক্ষেপও এর অন্তর্ভুক্ত। আর এসব কিছু বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ অর্থ।

সবার আর্থিক সামর্থ্য সমান নয়। আবার সামর্থ্য থাকলেও সবাই সব সময় অসুস্থতার জন্য তৈরি থাকে না। তাই দেখা যায়, হঠাৎ কখনো কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ছুটে যান। যখন খরচের বিলটা হাতে পান, তখন অনেকেই বিপদে পড়ে যান। কারণ তার কাছে ওই পরিমাণ টাকা নেই। কেউ হয়তো ধারদেনা করে চালিয়ে নেন। আবার কেউ সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন। যারা আগে থেকেই খরচের বিষয়টি আঁচ করতে পারেন, তারা চেষ্টা করেন স্বল্প খরচের কোনো হাসপাতালে অথবা চিকিৎসার বিষয়টি পিছিয়ে দিতে। অনেকেই হয়তো যথাযথ চিকিৎসা ছাড়াই সময় পার করে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেন। অর্থ সংকটের কারণে যেন কারো চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, এ জন্য অনেক দেশ আগে থেকেই এ ব্যাপারে একটি তহবিল গঠনের ব্যবস্থার প্রচলন করে। এটিকে বলা হয় স্বাস্থ্যবীমা। স্বাস্থ্যবীমাটি এক ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো। প্রত্যেকের নামে একটি করে অ্যাকাউন্ট থাকবে। এই অ্যাকাউন্টে ব্যক্তি বা তার পক্ষে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকার অথবা যৌথভাবে প্রতি মাসে বা বছরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ সঞ্চয় করে থাকে। আর এই তহবিল থেকে চিকিৎসার সময় ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা চিকিৎসার জন্য খরচ করতে পারে। ফলে চিকিৎসাকালীন ব্যক্তির পকেট থেকে অল্প পরিমাণ টাকা খরচ করলেই চলে।

১৮৮৩ সালে সর্বপ্রথম জার্মানিতে কারখানা শ্রমিকদের জন্য এ ব্যবস্থাটি চালু হয়। এতে শ্রমিকদের বেতন থেকে একটি অংশ এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান একটি অংশ জমা দিয়ে স্বাস্থ্যবীমা চালু করে। জার্মানির পথ ধরে ১৯১১ সালে ইংল্যান্ড, ১৯১২ সালে রাশিয়া, ১৯২৭ সালে জাপান স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থাটি চালু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর এটি পুরো পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভ করে। শুধু স্বাস্থ্যবীমা দিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবেÑ এমনটি অনেকেই ভাবেন না। সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করাও সহজ কোনো কাজ নয়। বিষয়টি খুবই জটিল। তাই অনেকেই বিকল্প চিন্তাও করতে থাকে। অস্ট্রেলিয়া ১৯৪০ সালে প্রথম স্বাস্থ্যবীমার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে এবং সাফল্য লাভ করে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া চিকিৎসাব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ সরকারিভাবে বহন করে থাকে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশও এ মডেলটিই বেছে নিয়েছে। তবে দেশটি স্বাস্থ্যসেবার খরচের এক-তৃতীয়াংশ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন করে থাকে। আবার ডেনমার্ক, সুইডেন, সৌদি আরবসহ অনেক দেশ সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। আমেরিকার মতো দেশ বেসরকারিভাবে মূলত বেসরকারি বীমার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশটিতে এখনো তিন কোটি লোক বীমা আওতার বাইরে। দেশটিতে স্বাস্থ্যবীমা ইস্যুটি বহু বছর ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে আছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, স্বাস্থ্যসেবা ইস্যুটির একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। কারণ এতে বিশাল অঙ্কের একটি তহবিলের বিষয় জড়িত। এই তহবিল সংগ্রহে করের বিষয়টি চলে আসে। আর কর কখনো কোনো সরকারের জন্যই আরামপ্রদ কোনো বিষয় নয়। কর আরোপ করায় যারা তাৎক্ষণিভাবে সুবিধাবঞ্চিত হবেন, তারা সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। সরকারের জনপ্রিয়তায় টান পড়তে পারে। এই ভয়ে অনেক সরকার এই পদক্ষেপ থেকে পিছু হটে। তবে এ কথাও তো সত্য, স্বাস্থ্যসেবার একটি নীতি-নৈতিকতার দিক আছে। প্রত্যেকের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। একই সঙ্গে আছে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। কেবল আর্থিকভাবে অসচ্ছলÑ এ দোহাই দিয়ে তাকে কোনোভাবেই চিকিৎসাবঞ্চিত করা যায় না। কারণ একটি সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনে ধনী-গরিব সব নাগরিকেরই ভূমিকা আছে। তাই রাষ্ট্র তার কোনো নাগরিককে বঞ্চিত করার কথা ভাবতে পারে না। এটি অনৈতিক। এটি কেউ অস্বীকার করে না। তবে দ্বন্দ্বটা কোথায়? দ্বন্দ্বটা হলো চিকিৎসা খরচ সমভাবে হচ্ছে না। এর দুটি কারণ। একটি হলো, অসুস্থ হলে একজন গরিব লোকের চিকিৎসা আর একজন ধনী লোকের চিকিৎসা একই। যেহেতু ধনী লোকটি বীমার মাধ্যমেই হোক আর কর প্রদানের মাধ্যমেই হোক, অধিকতর অর্থায়ন করে থাকে, সেহেতু তার মধ্যে একটি অগ্রাধিকার ভাব কাজ করে। অর্থাৎ সে মনে করে, চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে তার অগ্রাধিকার থাকা উচিত অথবা সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসাটা তার প্রাপ্য। আর একটি কারণ হলো, অসুস্থতা নিজেও সমাজে সমভাবে বিস্তৃত নয়। তাই দেখা যায়, সমাজে সবচেয়ে অসুস্থ ৫ শতাংশ লোকের পেছনে খরচ হয় মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৫০ শতাংশ। আর সুস্থ ৫০ শতাংশের পেছনে খরচ হয় মাত্র ৩ শতাংশ। আবার দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা যেমনÑ উচ্চরক্তচাপ ও এর জটিলতা, ডায়বেটিস ও এর জটিলতা, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসার, এইডস ইত্যাদির চিকিৎসা বাবদ খরচ প্রায় ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ সমভাবে সবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচ মেটাতে গেলে দেখা যায়, অধিকতর আয়কারীর প্রদেয় করের টাকা ব্যয় হচ্ছে স্বল্প রোজগারে বা রোজগারে অক্ষম জনগোষ্ঠীর পেছনে। অর্থাৎ আয়-রোজগারহীন লোকজনের চিকিৎসা খরচ প্রকারান্তরে বহন করছেন অন্য কেউ যারা ভালো রোজগার করেন। এ ব্যাপারটি অনেকেই মেনে নিতে পারেন না।

বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যবীমার একটি দুর্বলতা হলো সংস্থাগুলো এটিকে বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলে। তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেয়ে মুনাফাটাই মুখ্য। আর এই মুনাফালাভের জন্য তারা চিকিৎসা বিষয়টিকে নিত্যনতুন ওষুধসামগ্রী ও প্রযুক্তির সমাহার করে সাশ্রয়ীসম্ভব একটি চিকিৎসাব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তোলে। আর এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য উচ্চমূল্যে বীমা প্যাকেজ চালু করে এবং এর প্রধান লক্ষ্য স্থির করা হয় অপেক্ষাকৃত ধনী জনগোষ্ঠী এবং এই উচ্চমূল্যের বীমা প্যাকেজ অনেক সাধারণ জনগণের নাগালের বাইরে চলে যায়। তা ছাড়া বেসরকারি খাতে চিকিৎসক ও প্রসাশনিক খরচও তুলনামূলক অনেক বেশি। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও প্রণোদনা ছাড়া এ ব্যবস্থাটিকে সাধারণের নাগালে আনা অসম্ভব।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার কাজটি সরকারের জন্য সহজতর, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের জন্য। সরকার এ ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করে থাকে। যেমনÑ ১. সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর আদায়ের মাধ্যমে তহবিল গঠন করতে পারে, ২. সরকার চাইলে স্বাস্থ্যবীমাকে বাধ্যতামূলক করতে পারে। আর এতে সরকার নিজে বিশেষ তহবিল গঠন করে এবং বেসরকারি চাকরি প্রদানকারী সংস্থাকে অনুরূপ তহবিল গঠন করে বীমার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। প্রয়োজনে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার চাইলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্যসেবা ফ্রি প্রদান করতে পারে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বীমাব্যবস্থা চালু করতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে সীমিতভাবে কিছু উচ্চমূল্যে বেসরকারি বীমার ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার আইন প্রণয়ন করে ওষুধ, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির হ্রাসকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। তবে নিশ্চিত সাফল্যলাভ করতে চাইলে সার্বিক নিয়ন্ত্রণটি সরকারের হাতে রাখতে হবে এবং একটি দক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে এটি পরিচালিত করতে হবে।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা পদ্ধতি সর্বোচ্চ সাফল্য বহন করলেও তুলনামূলক খরচ অনেক বেশি। আবার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অসুস্থতা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, বার্ধক্যজনিত সেবাশুশ্রƒষা ইত্যাদি বিষয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয় এবং বেশ ব্যয়বহুল। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জন্য দুই স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনাই শ্রেয়। যেমনটি অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুরে আছে। বাংলাদেশে বর্তমান যে স্বাস্থ্য কাঠামো আছে, সেটিকে আরও একটু আধুনিকায়ন করে এর সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা চালু করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বয় করতে পারলে এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও সংহত করতে পারলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক