এক তারকা রাজনীতিকের পতন

ড. হুমায়ুন কবীর
২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০৭

আবদুল মান্নান ১৯৫৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার হিন্দুকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা মরহুম জালাল উদ্দিন সরদার। গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়ে তিনি পড়তে আসেন বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে তার ডাকে তিনি শৈশবে ছাত্রাবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। তার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর তিনি ছাত্রলীগের বিশ^স্ত সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। তিনি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় শাখার সভাপতি। তার সাংগঠনিক গুণের কারণেই এর পর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যখন সারাদেশে বঙ্গবন্ধু, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নাম নেওয়াটাই অনেক দুঃসাহসের কাজ ছিল, ঠিক ওই সময়ই তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে একটি বড় সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মনোনয়নে মান্নান-প্রদীপ প্যানেল বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়। তিনি ভিপি নির্বাচিত হন। এর পর তিনি শুধু বিশ^বিদ্যালয় নয়, হয়ে উঠতে থাকেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা সারাদেশের ছাত্রনেতা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তারা ১৯৮৩-৮৫ সময়ে এ গৌরবময় সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় ওই সময়কার স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন।

আজীবন পুরাদস্তুর এ রাজনীতিক পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন পাট সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তিনি নিজেকে পুরোপুরি রাজনীতিতে নিয়োজিত করেন। এর পর তার নেতৃত্ব শুরু হয় মূল দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে। শুরু করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। পরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সহ-প্রচার সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং সর্বশেষ সাংগঠনিক সম্পাদক পদে। আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাবিরোধী এলাকা হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় নিজ বাড়ি হওয়ার কারণে তিনি দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিফল হলেও নিজ যোগ্যতা ও কর্মগুণে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অসাধ্য সাধন করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সালে দশম ও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমপি নির্বাচিত হয়ে তার জনপ্রিয়তা প্রমাণে সমর্থ হন।

আমৃত্যু এমপি হিসেবে আবদুল মান্নান নিজ এলাকার ভোটারদের জন্য তো বটেই, সারাদেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। বগুড়ার মানুষ হলেও ময়মনসিংহের মানুষের প্রতি ছিল তার বিশেষ টান। তা ছাড়া কৃষিবিদ কমিউনিটি বলতে একেবারে অজ্ঞানই বলা চলে। যখনই কোনো কৃষিবিদ যে কোনো কাজে তার কাছে যেতেন, নিজ এলাকার চেয়েও বেশি গুরুত্বসহকারে দেখতেন তাদের সমস্যা। সমাধানও দিতেন সেভাবেই। পেশাগত জীবনে তিনি আমাদের সবার প্রিয় পেশাজীবী সংগঠন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের দুইবারের মহাসচিব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা আদায়সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করেছেন সর্বদা এ কৃষিবিদ নেতা।

এমপি হিসেবে আবদুল মান্নান প্রতিবারই কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়নে অবদান রেখেছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে তার অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে স্থাপিত কৃষি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে তিনি সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে থেকে কৃষিবিদদের কর্মসংস্থানসহ পেশাগত উৎকর্ষতা সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি সর্বদাই চেয়েছেন মানুষের কীভাবে কল্যাণ হয়। এ জন্য নিজে একটি বেসরকারি ব্যাংক এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম) পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত থেকেও শিক্ষাবৃত্তি দানসহ অন্যান্য দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

সর্বদা সদালাপী, নিরলস, সরলপ্রাণ, পরোপকারী, নির্লোভ, চেতনাবাদী নিবেদিতপ্রাণ এমন রাজনীতিক আজকের দিনে বিরল। তিনি (১৮ জানুয়ারি ২০২০) অকালে চলে গেলেন। তিনি পরপারে ভালো থাকুনÑ এ প্রত্যাশাই করি। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীর : ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়