ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা নিয়ে হতাশ প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৮:৪৪

বাংলাদেশের মাটিতে থেকে যারা বাংলা ভুলে ইংরেজি উচ্চারণে কথা বলেন, তাদের প্রতি করুণা করা ছাড়া আর কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে বসবাস, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি বা সাহিত্য সম্পর্কে জানতে অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে; কিন্তু মাতৃভাষা বাদ দিয়ে নয়। অন্য ভাষা শেখার জন্য ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল শুক্রবার বিকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আয়োজিত আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা কাজ করে। নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মিডিয়ামে না পড়ালে চাকরি পাবে না, সমাজে চলতে পারবে না। অনেকে এ ধরনের মানসিক দৈন্যে ভোগেন। অনেক ছেলেমেয়ে বাংলা ভাষা বা নিজেদের এলাকার ভাষায় কথা বলা ভুলে ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলার চেষ্টা করে। মনে হয় বাংলা ভাষাটা বলতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। যারা এ ধরনের লেখাপড়া শিখছে, তাদের জন্য করুণা ছাড়া আর কিছু নেই।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার।

উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিআরট্রিস কারডইন, বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ কূটনীতিকরা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মতো তো দুর্ভাগ্য কারো নেই। ’৭৫-এর পর বাবা-মা সব হারিয়ে দুটি বোন রিফিউজি হিসেবে বিদেশে ছিলাম। আমাদের এই সুযোগ হয়নি যে, ছেলে-মেয়েদের শুরু থেকেই বাংলা মিডিয়ামে পড়াব। তাদের পড়াতে হয়েছে বিদেশি স্কুলে, বিদেশের মাটিতে। তার পরও চেষ্টা করেছি বাংলা শেখাতে। ঘরে সবসময় বাংলা ভাষায় কথা বলেছি। তার পরও তাদের ভাষায় যদি উচ্চারণের সমস্যা হয়, সেখানে দোষ দেওয়ার কিছু নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মিটিংয়ে যখন বক্তৃতা করি, তখন চেষ্টা করি ভালোভাবে বাংলা বলতে; কিন্তু ঘরে যখন নিজেরা কথা বলি, গোপালগঞ্জের ভাষা আর ঢাকার ভাষা মিলিয়েই কথা বলি। কারণ ছোটবেলা চলে এসেছি ঢাকায়। সেই ভাষার একটা প্রভাব। টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে জন্ম নিয়েছি, সেখানের ভাষার প্রভাব- সবমিলিয়েই বলতে তো কোনো লজ্জা নেই। জাতির পিতাও তার ভাষণে গোপালগঞ্জের শব্দ বলে গেছেন অকপটে।

বাংলা ভাষার প্রতি জাতির পিতার প্রীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালে জাতির পিতা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পিকিংয়ে শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন। তখন তিনি নয়াচীন ভ্রমণ করেন। সেই ভ্রমণকাহিনি তিনি লিখেছেন। ’৫৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। কারাগারে তিনি নয়াচীন ভ্রমণ নিয়ে লিখেছিলেন। তার সেই ডায়েরিগুলো উদ্ধার করেছি। সেখানে জাতির পিতা লিখেছিলেন- পিকিংয়ে তাকে যখন শান্তি সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে দেওয়া হয়, তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম যখন জাতির পিতা জাতিসংঘে ভাষণ দেন, সেখানেও বাংলা ভাষাতেই ভাষণ দিয়েছেন। কাজেই বাংলা ভাষাকে ’৫২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন জাতির পিতা। ১৯৯৬ সালে আমি যখন প্রথম সরকার গঠন করি, তখন থেকে এ পর্যন্ত যতবার জাতিসংঘে গিয়েছি ততবারই জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে এসেছি।

অন্য ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে চাই, যার মাধ্যমে ভাষা শেখার জন্য বিভিন্ন ফেলোশিপ দেওয়া হবে, যেন বিভিন্ন ভাষা শেখা যায়। তিনি বলেন, যারা অন্য ভাষা শিখতে চায়, কোন ভাষা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি ইনস্টিটিউটেই ঠিক করে নেবে। যারা ভাষা শিখতে আসবে তাদের জন্য ফেলোশিপেরও ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে ৯টা ভাষা দিয়ে একটা অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। সেটা যে কেউ ব্যবহার করতে পারে।

নিরক্ষতা দূর করতে মোবাইল ফোন একটা বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোবাইল ফোনের কিবোর্ড এখন বাংলায় আছে। ফলে সাধারণ মানুষও এই মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করে। এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই, যে এ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। প্রযুক্তি আমাদের জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উদযাপনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মশতবাষির্কী। ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদযাপন করতে যাচ্ছি। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ- এই সময়টাকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে আমরা যেটা শুরু করব, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে আমরা সূবর্ণজয়ন্তী পালন করব।