গোলাভরা মশা

জয়া ফারহানা
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:০৭

ধীচৈত্রলক্ষ্মীর ব্রত কথায় আছে গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গাই, পুকুরভরা মাছ, বাড়ির পাঁদারে গাছা, বউবেটির কোলে বাছা, গাইয়ের কোলে নই, লক্ষ্মী বলেন ওখানেই রই। দিন বদলেছে, যুগ বদলেছে, মূল্যবোধ বদলেছে। লক্ষ্মীর লক্ষণও গেছে বদলে। গৃহস্থঘরের গোলায় আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। লক্ষ্মী এখন বড়ই চঞ্চলা; এই তিনি শামীম সাহেবের ভল্টে তো ক’মাস বাদে আবার শামীমা নূর পাপিয়া প্যালেসে। এসব শুনে লক্ষ্মী হয়তো অলক্ষ্যে হাসছেন। আসল কৃপা যে কোথায় বিলিয়েছেন সে খবর কি আর আমাদের মতো বেখবরদের জানার কথা! বাংলার দেবী লক্ষ্মী এখন বাংলাদেশিদের আশীর্বাদ দিচ্ছেন সুইস ব্যাংকে গিয়েও। লক্ষ্মীর কৃপা না হয় ভাগ্যবানদের পাওনা। সে আমরা দুর্ভাগারা পাব না জানি। কিন্তু নগর কর পরিশোধের সূত্রে নগর কর্তৃপক্ষের পরিসেবার ন্যায্য পাওনা তো আমরা পেতে পারি। সেটুকু পেলেও তো বর্তে যাই। তাও কি পাচ্ছি? পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ ডজনখানেক পৌর করের বাড়তি বোঝা টানতে টানতে নাকাল; মাত্র কদিন আগেই পানির কর বাড়ানো হয়েছে (কমেছে কোনটা?) অথচ আমাদের গোলায় কেবল মশা আর মশা। যে বৃষ্টির রিমঝিম সুর কয়েক বছর আগে বেটোফেনের নাইন্থ সিম্ফনির মতো শোনাত, এখন সে সুর মূর্ছনা রীতিমতো আতঙ্কজাগানিয়া। গত বছর ডেঙ্গু কোমর ভেঙে দিয়ে গেছে। মানে অবাঞ্ছিত ভাইরাস আক্রমণের প্রতিরোধক্ষমতা একদম শেষ করে দিয়ে গেছে। এখনো কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারি না। এরই মধ্যে শুনছি এবার নাকি ডেঙ্গু আসবে আরও তীব্রতা নিয়ে, আরও ভয়ঙ্কর মাত্রায়। যে সামান্য প্রতিরোধক্ষমতা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে কি সেই ক্ষমতাবান ডেঙ্গুকে মোকাবিলা করা যাবে? যে নেতারা আশ্বাস দিয়েছিলেন এ বছর ডেঙ্গুকে সমূলে নির্মূল করবেন; ডেঙ্গুর ‘ড’ বলে আর কিছু থাকবে না, তাদের এখন আর কোনো চায়ের দোকানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই মৌলিক সমস্যার কথা এখন কাকে জানাব? যেদিন নগরের ভার মেয়ররা হাতে পাবেন, ততদিন কি আর আমাদের শরীরে ডেঙ্গু মোকাবিলার অ্যান্টিবডি অবশিষ্ট থাকবে? ভোট শেষ। এখন ডেঙ্গুর ভাবনা ভাবার দায়িত্ব আমাদের। ভিআইপি-ভিভিআইপিদের আর কী। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া যেটাই হোক, তাদের জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তৈরিই থাকে। আমাদের জন্য হাসপাতালের সাধারণ সিটও থাকে না। হাসপাতালের দালালদের ঘুষ না দিয়ে কে কবে সিট পেয়েছে? হোমড়াচোমড়া নেতারা কি সরকারি হাসপাতালগুলোয় গিয়ে দেখেছে সেখানকার অবস্থা? তারা গেলেও অবশ্য হাসপাতালের মুমূর্ষু রূপের কিছু দেখতে পাবেন না। কারণ ওনাদের সামনে হাসপাতালের কর্মীরা পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরে থাকেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চাদর বদলে দেওয়া হয়। ওনারা গেলে হাসপাতাল চত্বরে বেশি করে ফুলের গাছ লাগানো হয়। হাসপাতালের অবর্ণনীয় দুর্দশা ওনাদের চোখে পড়ার কথা নয়।

কিছুদিন আগেও শুনেছিলাম ঢাকা লন্ডন হবে, সুইজারল্যান্ড হবে। এখন সেই ‘লন্ডনে’ দেখছি খালি মশা আর মশা। যেখানে সামান্য একটু পানি, সেখানেই মশার লার্ভা। এদের মধ্যে কত হাজার এডিসের, তা কে জানে। লার্ভা জন্মানোর স্থান হাজার হাজার। কয়টা জায়গায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কীটনাশক স্প্রে করা হয়েছে। এর পর ডেঙ্গু নির্মূল যখন আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে, তখন বলা হবে নগরবাসী বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখে না এবং সে কারণেই ডেঙ্গু নির্মূল অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। ভোটের আগে মশা নির্মূলের সব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ছিল, এখন হয়েছে নগরবাসীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব। প্রায়ই শুনি বাসাবাড়ি পরিষ্কার না রাখলে ডেঙ্গু নির্মূল হবে না। কিন্তু সেটুকুই কি যথেষ্ট? ব্যক্তিগত পরিধিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেই কি ডেঙ্গু থেকে মুক্তি মিলবে? এই নগরে অন্তত হাজারটা পানির আধার রয়েছে, যা ডেঙ্গুর জন্য শতভাগ প্রজননাগার। তার কী হবে?

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট ২০১৮-১৯ দেখিয়েছে, ১৪১টি দেশের মধ্যে পরিবেশবিষয়ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম। রিপোর্টে আরও দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিবিদরা ক্রমেই সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা হারাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের যদি বাদশাহ হারুনর রশিদের মতো ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের কথা শোনার ব্যবস্থা রাখতেন, তবে শুনতে পেতেন কী কষ্টে আছে মানুষ। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার জাঁতাকলে প্রতিদিন কীভাবে পিষ্ট হচ্ছে তাদের জীবন। না, তেমন কোনো ব্যবস্থা তারা রাখেননি। উল্টো আত্মতুষ্টিতে আত্মহারা। ভাগ্যিস ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে। নইলে দেখা যেত অধিকাংশই ‘না’ ভোটে টিক চিহ্ন দিয়েছে। বুথ অ্যাকশন প্ল্যানে সফল সরকার নাগরিকদের পরিষেবা প্রদানে ব্যর্থ।

দুই.

আমাদের এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ করি, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লুকানোর চেষ্টা। ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইটে গেলে দেখতে পাবেন বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গুঝুঁকিতে রয়েছে। সারাবিশ্বে প্রতিবছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে ৩৯ কোটি মানুষ। গ্রীষ্মপ্রধান এবং উন্নয়নশীল দেশে এ ঝুঁকি আরও বেশি। তবে সিঙ্গাপুর ও চীনও ডেঙ্গুঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টের ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যায়, প্রতি সপ্তাহে তারা জানিয়ে দিচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গ্রাফ এঁকে দেখিয়ে দিয়েছে গত পাঁচ বছরে কীভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে আর কমছে। পর্যবেক্ষণে কী করছে তাও পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জানা যায় না। গত বছর একেক সংস্থা একেক সংখ্যা দেখিয়েছে। পরিস্থিতি যেটাই হোক, সঠিক পরিসংখ্যানটা অন্তত থাকা দরকার। সঠিক পরিস্থিতি জানানো দরকার। তথ্যের অপূর্ণতা সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা, গণতন্ত্রহীনতাও বটে। সবচেয়ে বড় কথা, মশা মারার জন্য যে বা যারা অকার্যকর কীটনাশক এনেছিল, তাদের কোনো শাস্তি হয়নি। করপোরেশনের গাফিলতির জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো জানতে পারলাম না। উদাসীনতা, গাফিলতি শৈথিল্য যেটাই বলি না কেন, ডেঙ্গুতে যারা স্বজন হারিয়েছেন কেবল তারাই বুঝবেন এর মর্মবেদনা। শতকোটি টাকা দুর্নীতির জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই। অবশ্য একদম নেই তাও নয়। কখনো এ শাস্তি মনোনয়ন না দেওয়া, কখনো দল থেকে বহিষ্কার, কখনো সামান্য তিরস্কার। একেকটি অমূল্য প্রাণের কী অপূর্ব ক্ষতিপূরণ! এ যেন ‘সামান্য ক্ষতির’ কাশীর মহিষী করুণার মতো উপলব্ধি। ‘সামান্য ক্ষতির’ সামান্য শাস্তি।

তিন.

দুই সিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা, উদাসীনতা শৈথিল্যে গেল বর্ষায় নগরবাসীর অশেষ দুর্ভোগ হয়েছে। এবার বোধহয় কমবেশি সবাই ডেঙ্গু ফোবিয়ায় ভুগছেন। এ ফোবিয়া দূর করার জন্য নগরনেতাদের কাছে আমরা যতই আবেদন-নিবেদন করি, শেষ পর্যন্ত সবই হয়তো বৃথা যাবে। এখন মাঝেমধ্যেই হ্যামিলিয়নের সেই বাঁশিওয়ালার কথা মনে হয়। হ্যামিলন নগরের নিরাময়-অযোগ্য সমস্যা ইঁদুর নির্মূল করে দিয়েছিলেন যে বাঁশিওয়ালা। কথা ছিল, শহরে যদি আর একটি ইঁদুরও না থাকে তা হলে নগরের মেয়র পুরস্কৃত করবেন তাকে। কথা রাখেননি মেয়র। ক্ষুব্ধ অভিমানী বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজিয়ে নগর থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন সব নিষ্পাপ শিশু-কিশোরকে। কথা দিয়ে কথা না রাখা মেয়রের ওপর এক অলৌকিক বাঁশিওয়ালার এই ছিল প্রতিশোধ। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেনÑ যে নগরের অভিভাবক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী অকৃতজ্ঞ, সেই নগরে নিষ্পাপ শিশু-কিশোরদের না থাকাই শ্রেয়। এই নগরের মেয়রদেরও কথা দিয়ে কথা না রাখার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। ভয় হয়, রূপকথার পাতা থেকে আবার উঠে আসবে না তো সেই অলৌকিক বাঁশিওয়ালা? বাঁশির সুরে সুরে এই নগর থেকে নিয়ে যাবেন না তো নিষ্পাপ শিশু-কিশোরদের?

জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক