‘আল্লায় নিলে এমনি মরমু’

জনি রায়হান
২৬ মার্চ ২০২০ ১৯:৩৯ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০ ২২:০৮
স্থানীয় বাজারে আগের মতোই চলছে কেনাকাটা। ছবি : আমাদের সময়

‘আরে ভাই এগলে ( এগুলো) করে কোনো লাভ নাই, আল্লায় নিলে এমনি মরমু। করোনা-মরনা সব ওছিলা। হামরা ( আমরা) গাও গ্রামের মানুষ কি বাড়িত বসে থাকার অভ্যেস আছে। হাট বাজারজাত না আলে (আসলে) কি পেট চলে।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন উত্তরবঙ্গের এক গ্রাম্য হাটে আসা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মকবুল হোসেন। ওই হাটে এসময় তার আশেপাশে তখন শতাধিক মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিল। নানা রকমের জিনিসপত্র কেনাবেচা করতে এই হাটে ভিড় জমিয়েছেন শত শত মানুষ। তবে ওই হাট এলাকার হোটেল, রেস্টুরেন্টে ও অন্যান্য দোকানপাট গতকাল বুধবার রাতেই বন্ধ করে জনসমাগম সীমিত করার চেষ্টা করেছিল স্থানীয় প্রশাসন।

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার ৬নং ইউনিয়নের ধাপের হাট নামক স্থানে ওই হাটটি বসে প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার। আর সেই হাটটি ঘিরে আশেপাশের তিন উপজেলার ২০/২২ গ্রামের মানুষ সেখানে জড়ো হন। যদিও গত কয়েক দিন আগে গাইবান্ধা জেলার এই সাদুল্যাপুর উপজেলাতেই বিয়ের দাওয়াত খেতে আসা দুই প্রবাসীর শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছে আইইডিসিআর।

এছাড়াও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গাইবান্ধায় ওই দুই প্রবাসীর সংস্পর্শে আসা ১০৫ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ৮৯ জনকে শনাক্ত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল। বাকি ১৬ জনকে শনাক্ত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

‘করোনার সতর্ক মানতে চাইছেন না কেউই’

শুধুমাত্র এই ধাপের হাট বাজারে নয়, আশেপাশের অনেক গ্রামের মানুষই এখনো করোনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারছেন না। তাই সচেতনতা তো দূরের কথা উল্টো করোনা নিয়ে হাসি-ঠাট্টাও করছেন গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো।
লিজা বেগম নামে এক নারী দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘দুর বাবা, একলা বাড়িত কি বসে থাকা যায়। মরন হলে কেউ ঠেকাবার পারবো। সতর্ক হইয়া কি হইবো। ভাইরাসকে ভয় কইরা লাভ নাই।’

মোমেনা বেগম নামে ৬০ বছর বয়সী আরেক নারী দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘মরনোক ভয় কইরা লাভ আছে। মরণ হবোই। সাবান দিয়ে হাত ধুলেও হইবো, না ধুইলাও হইবো। তাই কি এবাড়ি ওবাড়ি বেড়ামু না।’

গ্রামের মোড়ের দোকানেও চলছে আড্ডা

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর, পলাশবাড়ী উপজেলার একাধিক গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বসানো চা ও মুদি দোকানগুলোর সামনেও নিয়মিত জড়ো হচ্ছেন উঠতি বয়সের তরুণরা। সবার মুখে মুখে করোনার আলোচনা থাকলেও একসাথে জড়ো হয়ে আড্ডা দিচ্ছেন তারাই। কারণ সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে চলার কথা বলা হলেও সেটা বুঝতে অক্ষম অনেকে। আবার অনেকে বুঝলেও মানতে নারাজ।

প্রচারণার বড়ই অভাব

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কথা এখন কারোরই অজানা নেই। কিন্তু কীভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব তা নিয়ে শহরগুলোতে ব্যাপক প্রচারণা করা হলেও গ্রামের অবস্থা প্রায় শূন্য।

গত কয়েক দিনে আশেপাশের কমপক্ষে ১০ গ্রামের কোথাও কোনো সচেতনমূলক প্রচারণা চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পীরগঞ্জ উপজেলায় দোকানপাট বন্ধ করাসহ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অপর দিকে পাশের পলাশবাড়ী উপজেলাতেও দোকান পাট বন্ধ করাসহ মাইকিং এর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে৷ কিন্তু এসব গ্রামেগুলোতে এখনো মাইকিং পর্যন্ত কেউ করেনি বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

সারা দেশে যখন করোনার সর্তকতামূলক নানা প্রচারণা করছে সরকার, তখন এই এলাকার স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের এসব গ্রামাঞ্চলে সচেতনতামূলক কোনো প্রচারণা করতে দেখা যায়নি। বরং কোনো সচেতন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কাউকে সচেতনতামূলক বার্তা দিতে গেলে অনেকেই তা নিয়ে মশকরা করছেন।