বাংলাদেশ বনাম উন্নত বিশ্বের করোনা

রিজুয়ানা রিন্তী
২৯ মার্চ ২০২০ ০৭:৫২ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০ ১৭:১৭
মানুষের হাঁচি-কাশিতে ছড়ায় করোনাভাইরাস। প্রতীকী ছবি

অসুখ হলেই আমরা ছুটি সিঙ্গাপুর, লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রে। কেউবা আবার সামর্থ্য অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। কিন্তু মহামারি আকার ধারণ করা করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ এমন এক রোগ যার ভয়ে তটস্থ বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশ। নিস্তার নাই কারো। করোনার সংক্রমণে প্রাণ গেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক থেকে শুরু করে আইনপ্রণেতাদেরও। আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা তো আরও নাজুক। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় সংক্রমণের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। ইউরোপের দেশ ইতালিতেই প্রাণ গেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষের। সারা বিশ্বে সংক্রমিত হয়েছে ৬ লাখ ৬২ হাজার ৯৬৭ জন।

কিন্তু বাংলাদেশ? যেখানে মানুষ যত্র-তত্র থুতু আর পানের পিক ফেলে, চায়ের দোকানের মামা সর্দি ঝেড়ে কাপড়ে হাত মুছে চা দেয়, মৌসুমী ইনফ্লুয়েঞ্জার এই সময়ে প্রতিদিন কাউকে না কাউকে রাস্তাঘাটে নাক আঙুল ঢুকিয়ে শুকনো সর্দি পরিষ্কার করতে দেখা যায়, লোকজন মানুষের মুখের সামনে খোলা হাঁচি দিয়ে বসে- সেই বাংলাদেশে আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত মহামারি করোনাভাইরাসের নতুন কোনো সংক্রমণ নেই! যে ভাইরাস কিনা করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির জলীয় কণা থেকে ছড়ায়। আবার এমনও নয়, এই দেশে করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী নেই কিংবা আক্রান্ত দেশ থেকে ভাইরাস নিয়ে এ দেশে কেউ আসেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাত্র সপ্তাহখানেক আগে বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার আরও দ্রুত ও বিস্তৃত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে।

তাহলে, কীভাবে এত দ্রুত সংক্রমণ ও মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হলো বাংলাদেশে? প্রশ্ন আর সংশয় থেকেই যায়। সেইসঙ্গে ভীতিও। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) তাদের সর্বশেষ ব্রিফিংয়ে গতকাল শনিবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। সেইসঙ্গে সংক্রমিত ৪৮ জনের মধ্যে ১৫ জন এইমধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন। মৃতের সংখ্যা আগের পাঁচই আছে।

এমন খবরে দেশবাসীর খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তার বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। দেশে নতুন সংক্রমণ নেই- এই খবরে মানুষ আতঙ্কিত। কেউ কেউ বলছেন, কবে দেশের মানুষ এত সভ্য হলো যে নিয়মমতো সরকারি নির্দেশনা মেনে চলে দেশ আজ সংক্রমণ মুক্ত! যেখানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সবাইকে ঘরে থাকার কথা বলার পরও হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে করে গ্রামে ছুটে গেছে। প্রবাসীরা ভাইরাস নিয়ে দেশে এসে হোম কোয়ারেন্টিন না মেনে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

আবার কেউ ক্ষোভ ঝাড়ছেন- করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে বারবার আইইডিসিআরে ফোন করলেও তারা সাড়া দিচ্ছে না। পরীক্ষা তো পরের কথা।

এক ফেসুবক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘নো টেস্ট, নো রেজাল্ট, নো করোনা, সাবাশ বাংলাদেশ।’

আরেকজন বলছেন, ‘যাদের পরীক্ষা করা প্রয়োজন তাদেরকে কি পরীক্ষা করা হচ্ছে?’

মিস্টার কক্স নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় করোনা আক্রান্তের রেজাল্ট পরিকল্পিত। সঠিক রেজাল্ট প্রকাশ করছে না।’

কৌশিক নামে একজন লিখেছেন, ‘করোনা পরীক্ষা করার কিট নাই৷ করোনা পরীক্ষা না করলে আক্রান্ত লোক শূন্যই পাবেন।’

...এই হলো সাধারণ মানুষের মনের অবস্থা। ২৪ ঘণ্টায় ৪২ জনকে পরীক্ষা করে কী করে বলা সম্ভব বাংলাদেশে নতুন কোনো সংক্রমণ নেই! এ নিয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসের সুর আছে। তাদের ধারণা আক্রান্ত অনেক, কিন্তু তথ্য গোপন করা হচ্ছে। এমনটাই হয়ে থাকলে মহাবিস্ফোরণ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

আর যদি সরকার তথ্য গোপন না করে থাকে, এটিই যদি সত্য হয়- তবে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে উন্নত বিশ্বের কাছে রোল মডেল হতে পারে। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের প্রথম ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ২১ দিনের মাথায় দেশে নতুন কোনো সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। তাহলে বলতেই হয় সাবাশ বাংলাদেশ। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়ে মৃত্যুর হার কমাতে বহুদিন লেগেছে, সেখানে বাংলাদেশের লেগেছে মাত্র এই কদিন। এই ২১ দিনের মাথায় গতকাল শনিবার বাংলাদেশের কোভিড-১৯ রোগে কারও মৃত্যু হয়নি, কেউ সংক্রমিতও নয়। বরং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

এক নজরে দেখে নেই বিশ্বের নামীদামি দেশের চিত্র-

যুক্তরাষ্ট্র : করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে গত ২০ জানুয়ারি। এরইমধ্যে দেশটিতে সংক্রমণ লাখ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১৭শ’র বেশি মানুষের। সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এখন দেশটি।

ইতালি : সংক্রমণ শুরুর ২ মাসের মাথায় মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষের। প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছেন ইউরোপের এই উন্নত দেশটিতে। আক্রান্তের সংখ্যায় ৯২ হাজারের বেশি।

চীন : গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় চীনের উহানে। প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা এই দেশে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজারের বেশি মানুষের। সংক্রমণও ছড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৩৯ জনের মধ্যে। তবে করোনা মোকাবিলায় চীনকে এখন সফল বলা চলে। তারা মৃত্যুর হার কমিয়ে এনেছে, সঙ্গে সংক্রমণও।

স্পেন : স্পেনে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে।এ ছাড়া লাগামহীনভাবে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ৭৩ হাজারের বেশি। স্পেনে ভাইরাসটির এত বিস্তার ঘটার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে  ভাইরাসজনিত মহামারি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সেবার সরঞ্জামের অসম বণ্টনও একটা কারণ হিসেবে গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়।

ভারত : ভারতে সংক্রমণের সংখ্যা হাজার ছুঁই ছুঁই। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। গতকালের খবর-দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ পাঞ্জাবের কর্তৃপক্ষ সেখানকার ২০টি গ্রামের অন্তত ৪০ হাজার বাসিন্দাকে কোয়ারেন্টিনে আটক রেখেছে। কারণ সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের সবার দেহে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে মাত্র একজনের কাছ থেকে। ইতোমধ্যেই ৭০ বছর বয়সী বলদেব সিং নামে ওই ব্যক্তি সম্প্রতি করোনা ভাইরাসে মারা গেছেন। তিনি ইতালি ও জার্মানি সফর করে এসে কোয়ারেন্টিন না মেনে জনসমাবেশ করেছিলেন।

ইরান : ইরানের ৩১টি প্রদেশে করোনাভাইরাস ছড়াতে সময় নিয়েছে মাত্র ১৬ দিন। অন্যদিকে, ১৬টি দেশ দাবি করেছে ইরান থেকে তাদের দেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনী ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার ঘোষণা দেন করোনাভাইরাস নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই, এটা নিয়ে ইরানের শত্রুরা বাড়িয়ে বলছে। এক সপ্তাহ পরে ইরানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে যখন, তখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হাসান রুহানি একই কথা আবারও বলেন।

বিবিসির পারস্য বিভাগের তদন্তে জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট দিনে যে পরিমাণ মানুষ মারা গছে বলে সরকার বলছে তার তুলনায় সংখ্যা ছয়গুণ বেশি। এ পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন সাড়ে ৩৫ হাজার মানুষ। আর মৃত্যু হয়েছে আড়াইহাজার মানুষের।

সৌদি আরব : ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করার পরও করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ১২০৩ জন সংক্রমিত হয়েছে। এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের।

কসোভো : করোনাভাইরাস সংকটে প্রথমবারের মতো সরকার পতন হয়েছে ইউরোপের দেশ কসোভোয়। কসোভা স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৯১ জন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৭ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

 

রিজুয়ানা রিন্তী : সাংবাদিক