পড়েছে দুধের দাম, বিপাকে খামারি

আতিক সিদ্দিকী শাহজাদপুর
৩০ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২০ ০০:৩৫

করোনার প্রভাবে দুধ সংগ্রহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে মিল্ক ভিটা। এতে বিপাকে পড়েছেন শাহজাদপুরের খামারিরা। তারা বাধ্য হয়ে গরুর দুধ খুচরা বাজারে ২৫ থেকে ৩০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করছেন। এমনকি অনেক খামারি গ্রাহক না পেয়ে ঘুরে ঘুরে ১০ থেকে ১৫ টাকা লিটার দরেও দুধ বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, দুধ সংগ্রহ তিন দিন বন্ধ করে দিয়েছিল দেশের বৃহত্তম সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ীতে অবস্থিত বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লি. (মিল্ক ভিটা)। বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে তাদের আওতাভুক্ত প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকরী সমবায় সমিতি থেকে আবার দুধ সংগ্রহ করে। তবে তা সীমিত পরিমাণ বা কোটা পদ্ধতিতে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান জানান, করোনা আতঙ্কে এবং সরকারি নির্দেশনায় মানুষ বাজারে কম আসছে, এ কারণে দুধ এবং মাংসের চাহিদা কমেছে। এতে কৃষক বা খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, শাহজাদপুরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু রয়েছে। আর খামার রয়েছে প্রায় ১১ হাজার। এর মধ্যে উন্নতজাতের দুধেল গাভী রয়েছে প্রায় দেড় লাখ।

পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ উদ্দীন জানান, দুধের রাজধানী খ্যাত সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের কৃষকরা করোনা ভাইরাসের প্রভাবে উৎপাদন মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর হঠাৎ করেই গোখাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বেড়ে গেছে। এতে কৃষকরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এলাকায় ২৫ হাজারেরও বেশি গরুর খামার রয়েছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কৃষকই তাদের বসতবাড়িতে ছোট পরিসরে গাভী লালন পালন করে থাকেন। ফলে প্রতিদিন এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিন হয়ে থাকে। প্রচুর দুধ উৎপাদিত হওয়ায় এ এলাকা থেকে মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেশ, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরিসহ প্রায় ২০টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান তরল দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারাদেশে বাজারজাত করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার। বাকি দুধ স্থানীয় ঘোষ বা দুধ ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পাস্তুরিত দুধসহ ঘি ও ছানা তৈরি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে থাকেন। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবেও মিষ্টিজাত কারখানা ও চায়ের দোকানে প্রচুর দুধের প্রয়োজন হয়।

খামারিদের অভিযোগ, দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো খামারি ও কৃষকদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান দুধ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। শুধু প্রাণ ডেইরি গুঁড়া দুধ তৈরির জন্য ১ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ অব্যাহত রাখলেও বাকি ৯ লাখ দুধ নিয়ে কৃষক বিপাকে পড়েছেন। কৃষকদের দাবি, প্রতিলিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ৪২ টাকা। কিন্তু দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিলিটার দুধের দাম দিচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এখন তারা তা-ও নিচ্ছে না। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্ত খামারিদের বাইরের কেউ সেখানে দুধ বিক্রি করতে পারছে না। এ অবস্থায় গত দুদিন হলো বেশিরভাগ কৃষক ও খামারিকে স্থানীয় বাজারগুলোয় ও ভ্যানে করে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া অনেক খামারি গ্রাহক না পাওয়ায় ১০ থেকে ১৫ টাকা লিটার দরেও দুধ বিক্রি করেছেন কলে জানা গেছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আখতারুজ্জামান ভূইয়া বলেন, দুধ এবং মাংসে প্রচুর পুষ্টিগুণ রয়েছে। করোনা প্রতিরোধে শরীরে দুধ এবং মাংসের প্রয়োজন। তবে যথাযথ সেদ্ধ করে খেতে হবে। আশা করছি দুধের বাজার খুব অল্প সময়েই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

মিল্ক ভিটার আওতাধীন শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী জানান, মিল্ক ভিটা কেবল বিকালে দুধ নিচ্ছে, সেটাও কোটা বা রেশনিং ব্যবস্থায়। এ জন্য তাদের সমিতিভুক্ত কৃষকরা দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তারা কম দরে ফেরি করে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন এসব কৃষক।

এ বিষয়ে বাঘাবাড়ী মিল্ক ভিটা কারখানার ডিজিএম ডা. ইদ্রিস আলী বলেন, করোনার প্রভাবে বাজারে দুধের চাহিদা কমে গেছে। এ ছাড়া সরকারি নির্দেশে ফ্যাক্টরির কার্যক্রম আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার আবার নির্দেশ দিলে ফ্যাক্টরি পুরোদমে চালু করা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘এদিকে ৯০০ মেট্রিক টন উৎপাদিত গুঁড়া দুধ অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে মজুদ রয়েছে। ফলে নতুন করে গুঁড়া দুধ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। এতে কৃষকের সাময়িক অসুবিধা হলেও আমাদের কিছু করার নেই।’

মিল্ক ভিটা সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায় মিল্ক ভিটার আওতায় ৭১৩টি প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমিতিতে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়ে থাকে। বাঘাবাড়ী কারখানায় প্রতিদিন পৌনে ২ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। এই এলাকার বাইরে উল্ল­াপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুর, শাহজাদপুর পূর্বাঞ্চল, পাবনার ভাঙগুড়া ও ঈশ্বরদী দুধ সংগ্রহকেন্দ্র থেকে আরও প্রায় ৫০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ হয়ে থাকে।

শাহজাদপুর পৌরসভার দ্বাবারিয়া গ্রামের কৃষক রহম আলী সরদার জানান, বৃহস্পতিবার সকালে দুধ বিক্রি করেছি ২৫ টাকায়, আর বিকালে বিক্রি করেছি ৩০ টাকায়। গতকাল শুক্রবার সকালে বিক্রি করেছি প্রতিলিটার ৩০ টাকা দরে।