করোনাবন্দি রাজধানীবাসী ডেঙ্গু নিয়ে উৎকণ্ঠায়

সানাউল হক সানী
৩১ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২০ ০৭:২৭

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এখন চার দেয়ালে বন্দি রাজধানীবাসী। কিন্তু ঘরেও নিস্তার নেই। ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মশার উৎপাত। ক্রমেই তা বাড়ছে। করোনা মহামারীতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় নগরবাসীর দিন যখন কাটছে নিদারুণ উৎকণ্ঠায়, তখন গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে মশার যন্ত্রণা। চলতি মার্চ মাসের শুরুতেই রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

তবে করোনা নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ-আতঙ্কের নিচে সেটি চাপা পড়ে গেছে। গত বছর মার্চের শেষদিকে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে, যা পরে দেশের প্রতিটি জেলায় মহামারীর মতো ছড়িয়ে যায়। সেই প্রকোপ ছিল নভেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। মেঝেতে, বারান্দায় বা যেখানে একটু ফাঁকা পাওয়া যায়, সেখানেই শয্যা পেতে আশ্রয় নেয় রোগীরা। তিক্ত সেই অভিজ্ঞতার পরও এ বছর

এ পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। করোনা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নগরজুড়ে মশার ওষুধ ছিটানো বন্ধপ্রায়। নগরবাসীরা বলছেন, প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুবার ওষুধ ছিটানোর পরও মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার মেলা ভার। আর সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কর্মীদের তৎপরতা কদাচিৎ চোখে পড়ছে। কাজেই মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। তারা বলছেন, করোনা-সংকটের মধ্যেই এ বছরও যদি গত বছরের মতো ডেঙ্গু ছড়িয়ে যায়, তা হলে পরিস্থিতি হবে খুবই ভয়াবহ।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে বিজয়ী মেয়রদের শপথ অনুষ্ঠান হলেও তারা এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। আগামী ১৭ মে বর্তমান মেয়রদের দায়িত্বকাল শেষ হবে। এর পর নতুন মেয়ররা দায়িত্ব নেবেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র আর দক্ষিণের দায়িত্বে আছেন বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন। মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষ বেশ ঘটা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে জানালেও তা থেমে আছে সেখানেই। মাঠে তা এ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি, অভিযোগ সাধারণ মানুষের। উত্তরের কিছু এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও দক্ষিণে তা-ও হয়নি। এর বাইরে উত্তর কর্তৃপক্ষ মশক নিধনে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বেশকিছু ক্যাম্পেইন, সভা-সমাবেশও করেছে। মশা নির্র্মূলে কয়েকটি ওয়ার্ডে ক্রাশ প্রোগ্রামও চালানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বলে জানান নগরবাসী।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর এ সময়ে ডেঙ্গু ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। যদিও সেসব ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে ঢের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এ বছর নগর কর্তৃপক্ষের যাচ্ছেতাই ঢিলেমিতে এবং কোনো ক্রাশ প্রোগ্রাম না নেওয়ায় মশা বেড়ে গেছে অনেক। এক্ষেত্রে সর্বাধিক বিপাকে আছে দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলো। এসব ওয়ার্ডে মশক নিধনে কোনো ধরনের উদ্যোগই চোখে পড়েনি, বলছেন ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দারা।

গত দুদিন সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণে ভিআইপি এলাকা হিসেবে পরিচিত মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, রমনার কিছু এলাকায় নিয়মিত মশকনিধন কর্মীরা ওষুধ ছিটাচ্ছেন। তবে আজিমপুর, নিউমার্কেট, শাহবাগ, খিলগাঁও, যাত্রবাড়ী, লালবাগসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় এসব উদ্যোগ দেখা যায়নি।

শাহবাগ এলাকায় কয়েক দিন ধরে কোনো মশকনিধন কর্মীর তৎপরতা দেখা যায়নি। কেন? এমন প্রশ্নে এ এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজার মিজানুর রহমান ফোনে বলেন, আমি অসুস্থ। এসবের খবর রাখি না।

একই অবস্থা রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। গুলশান, বনানীসহ অপেক্ষাকৃত ভিআইপি এলাকাগুলোয় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও উত্তরা, মীরপুরসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় মশকনিধন কর্মীদের দেখা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় এডিস মশার পরিমাণ বেশি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জরিপেও রাজধানীর অন্তত ত্রিশটি স্থানে মশার ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে নতুন মেয়রদের প্রধান কাজ হবে, এসব স্থানকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো রাজধানীতেই মশার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। এডিস মশা নিধনে ওয়ার্ডভিত্তিক টিম গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পরিচ্ছন্ন সিটি গড়ার কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এডিস মশার উপদ্রব ছিল না। কিন্তু এ বছর জানুয়ারির শুরু থেকেই নগরীতে এডিস মশার উৎপাত দেখা গেছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশা বাড়বে, বাড়বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। তাই বৃষ্টি হওয়ার আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে গত বছর দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপের পর উত্তর সিটির উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে মেসার্স প্যারেন্টস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা হয় জার্মানির তৈরি দুশ ফগার মেশিন ও ৫টি ভীইকল মাউন্টেড ফগার মেশিন। কিন্তু এ পর্যন্ত মেশিনগুলোর যথার্থ ব্যবহার করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণ সিটিও সে সময় জরুরি ভিত্তিতে সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই রকম প্রায় আড়াইশ ফগার মেশিন আমদানি করে। এগুলোর দশা উত্তরের মেশিনগুলোর মতোই; এখনো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী ভা-ার ও ক্রয় কর্মকর্তা মনোজ কুমার রায় বলেন, আমরা আড়াইশর মতো মেশিন আমদানি করেছি। এর ব্যবহারের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না, স্বাস্থ্য বিভাগ বলতে পারবে। তার এ কথার পর প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল (ডা.) মো. শরীফ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়; কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ সিটির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় বলেন, মশকনিধন কর্মীদের দুবেলা ওষুধ ছিটানোর নির্দেশ রয়েছে। মনিটরিংও করা হচ্ছে। কেউ না ছিটালে তার বিরুদ্ধে করপোরেশন ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে গত মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মশার ওষুধ মিক্সিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে ভা-ার বিভাগ। উড়ন্ত মশা মারার জন্য দক্ষিণ সিটির নিজস্ব তত্ত্বাবধনে আমদানিকৃত ৬ লাখ ৪০ হাজার মেলাথিউন মশার ওষুধ মিক্সিং করার জন্য এ টেন্ডারে অংশ নেয় লিমিট এগ্রো, ফরওয়ার্ড ও জায়িন কনস্ট্রাকশন নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান। তিনটি প্রতিষ্ঠানই নানা কারণে বিতর্কিত। পরবর্তীতে আগের টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও করোনা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা ঝুলে গেছে।