করোনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির মডেল কী হবে

হোসনেয়ারা ইসলাম মৌ
৩১ মার্চ ২০২০ ১৭:১৩ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২০ ২০:২৩

গোটা পৃথিবীকে নতুনকরে ভাবতে শেখাচ্ছে করোনাভাইরাস। অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পূণর্গঠন নিয়ে কাজ চলছে বিশ্বব্যাপী। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বে অর্থনীতির নতুন মডেল নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। সামনের দিনে কিভাবে বিশ্ব চলবে, কোন মডেলে অর্থনীতি আগাবে-সব এখন ভাবনার বিষয়। বিশ্ব অর্থনীতির মোড়ল হতে যাওয়া চীন থেকে জানুয়ারিতে বৃহৎ আকারে যখন এই ভাইরাস ছড়াল, তখন বিশ্ব নেতারা হয়তো অন্যভাবে ভেবেছেন। কিন্তু চীন এখন অনেকটা কাটিয়ে উঠছে সেই মহামারি থেকে। ইউরোপ-আমেরিকায় এখন এই ভাইরাস সবাইকে বেসামাল করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির চাবিকাঠি কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা।

নিম্ন আয়ের দেশ থেকে সবে উন্নয়শীল দেশের তালিকায় নাম লেখা বাংলাদেশও একই চ্যালেঞ্জে পড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এরই মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এটা আরও কতদিন চলবে, দেশের করোনা পরিস্থিতি হয়তো আগামীতে সেটা বলে দেবে। তবে এখন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার পাশাপাশি সবার খাদ্য নিশ্চিত করা। পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনীতির মডেল কী হবে, সেটা নির্ধারণ করা।

এরই মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ধারণা করেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১.১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার কর্মজীবী মানুষ চাকরি হারাতে পারেন।

শুধু যে বাংলাদেশের এমন পরিস্থিতি হবে, তা নয়। ২০২০ সালে সারা বিশ্বে করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বলছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ কোটি লোক তাদের চাকরি হারাতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের মানুষের খাদ্য ও বাসাভাড়া নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির দুটি মডেল হতে হবে। ১. গ্রামীণ অর্থনীতি ২. শহুরে অর্থনীতি। তার কারণ, করোনাভাইরাসের কারণে শুধু ঢাকার নয়, সারা পৃথিবী থেকে অনেকেই এখন গ্রামে বাস করছেন। তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিন্তা মাথায় রেখে আগাতে হবে। গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষদের সামনে খাদ্যই বড় সংকট, সেখানে এই মুহূর্তে বাসস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ নেই। তবে করোনাভাইরাস যদি বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত স্থায়ী হয় তাহলে গ্রামের বাসস্থান নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষ এবং শ্রমহারাদের খাদ্য পৌঁছে দিতে। তবে সেটা যে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক নগণ্য, তা বোঝাই যাচ্ছে। একইভাবে শহরের অনেক মানুষই এখন খাদ্য সংকটে। পাশাপাশি দেশ এভাবে লকডাউন থাকলে শ্রমহারা মানুষগুলো তাদের বাসাভাড়া দিতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের পরিবার নিয়ে উভয় সংকটে পড়তে হবে। তাই করোনাভাইরাস মোকাবিলার পাশাপাশি শহর ও গ্রামে খাদ্য সংকট ও বাসাভাড়া কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা নিয়ে নতুন মডেল তৈরি করতে হবে।

গ্রামে করোনার প্রভাব

পুরো দেশ কার্যত এখন লকডাউন। গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ। এতে করে এই সেক্টরে কাজ করা মানুষগুলো এখন অনেকাংশে বেকার। এসব খাতে বেসরকারি শ্রমজীবীদের জীবন কীভাবে চলছে, তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। একই সঙ্গে দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষগুলোর শ্রম এখন বিক্রি হচ্ছে না বা একদম কমে গেছে। প্রতিদিনের আহার যোগানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃষিনির্ভর এই দেশের কৃষকরা নিয়মিত ওষুধ ও সার না পেলে তাদের কৃষিকাজ ব্যাহত হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধের কারণে উঠানো ফসল বিক্রি করা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। তবে নিত্যপণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহনগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় কম সংকটে রয়েছেন টাকাওয়ালা কৃষকরা। তবে নিম্ন আয়ের কৃষকরা বেশ চিন্তায়। কেননা গ্রামীণ বাজারে ক্রেতা কমে যাচ্ছে, এতে করে তাদের উঠানো পণ্য গ্রামের বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। 

করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত এক মাসে ২০০ কোটি টাকার জীবন্ত কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। সবই নষ্ট হয়ে গেছে। রপ্তানি শুরু না হলে শুধু এই খাতেই ক্ষতি হতে পারে ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে বৃহত্তর রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও দিনাজপুরের আমচাষীরা এখন মহাচিন্তায়। আগামী মে মাসের মাঝামাঝিতে নতুন আম নামতে শুরু করবে। মার্চ ও এপ্রিলে অনেক চাষী তাদের বাগান বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এবার তা করতে অনেক কষ্ট হবে বা কেউ কেউ বাগান বিক্রি করতে পারবেন না। কেননা করোনা পরিস্থিতি কবে ভালো হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনো ব্যবসায়ী আম বাগান কিনতে চাইবে না। কিনলেও অনেক কম দাম দিতে চাইবেন চাষীদের। অনেকে বাধ্য হয়ে সেই কম দামেই বাগান বিক্রি করবেন।

একই সংকটে পড়ছেন মাছ ও মুরগী চাষীরা। দেশের এই সংকটে কাঁচামাল উৎপাদন ও আমদানি কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে বা চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া দিনমজুর থেকে শুরু করে আরও অনেক ধরনের শ্রমজীবী খাদ্য সংকটে পড়েছে। তাদের দিকে নজর দিতে হবে।     

শহরে করোনার প্রভাব

দেশের সব মার্কেট, বিপণীবিতান বন্ধ। এছাড়া ওষুধ ও নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া সব কিছু বন্ধ। এসব খাতে কাজ করা মানুষগুলো এখন বেকার। অথচ, ওটাই ছিল তাদের প্রতিদিনের আহার অন্বেষণের একমাত্র পথ। সেই পথ আজ রুদ্ধ। তাই এই মানুষগুলোর এখন থাকা-খাওয়ার সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের কারণে বাইরেও বের হতে পারছেন না।

দেশের পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও বিপদে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯৬৬টি কারখানার ৮২৮ মিলিয়ন পিস পোশাকপণ্যের অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এর মূল্য ২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এভাবে চলতে থাকলে সবকিছুই বেসামাল হয়ে যাবে। এ ছাড়া ঢাকা শহরসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে বিভিন্ন পেশার মানুষ বাস করেন। বস্তির বাসিন্দাদের কথাও এখানে উল্লেখ করার মতো। অনেক বাসায় তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে তারা কীভাবে খাদ্য সংগ্রহ করবেন, সেটা চিন্তার বিষয়। শহরে চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তদের অনেকে। খাদ্য ও বাসা ভাড়া নিয়ে তারা বেশি চিন্তায়। এসব নিয়ে কার্যকরী উদ্যোগ এখনই গ্রহণ করতে হবে।  

করোনা পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।  তাই আজ মঙ্গলবার কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদন যেন অব্যাহত থাকে। এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে, কোনো পুকুর যেন পড়ে না থাকে। তাতে করে আমরা নিজেরা চলতে পারব, অন্যদেরও সহায়তা করতে পারব। সে সক্ষমতা আমাদের আছে। যেখানে সম্ভব, ফসল ফলান। খামার করুন। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার, এখন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে।’      

সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিলে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও সংকটে পড়তে যাচ্ছে। এই সংকট থেকে বের হতে নতুন মডেলে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে মাঠপর্যায় থেকে কাজ শুরু করতে হবে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শহরের শ্রমজীবী পর্যন্ত সবার চিন্তা করতে হবে। টেকসই অর্থনীতির ধারণা গ্রহণ করে এখনই কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক তাকেশি কাসাই বলেছেন, ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ মহামারি শেষ হতে এখনো অনেক দেরি। এটি একটি দীর্ঘকালিন যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। আমরা কিছুতেই অসতর্ক হয়ে বসে থাকতে পারি না। বড় ধরনের গণসংক্রমণ রোধ করতে সব দেশকে প্রস্তুত হতে হবে।’

এই প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার সামগ্রিক উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তসহ সবাইকে একত্রে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই বাংলাদেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।

হোসনেয়ারা ইসলাম মৌ : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়