করোনার বিস্তাররোধে শিথিলতা কখনই নয়

ডা. পলাশ বসু
৩১ মার্চ ২০২০ ১৯:১৮ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২০ ১৯:১৮

এখন সারা বিশ্বই  একটা   অস্থিরতা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কারণ করোনা নামক এক ভাইরাসের ‘বৈশ্বিক সংক্রমণ’ এর ভেতর দিয়েই আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে সময়ের কাটার  সাথে আমরা আর তাল মেলাতে পারছি না। যেন স্থবির হয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছে, সামনে আগানোর পথটা আপাতত রুদ্ধ হয়ে গেছে।  করোনার ভয়াল থাবায় আমরা বেশ অসহায় হয়ে পড়েছি। আমরা মানে হচ্ছে আলাদাভাবে বাংলাদেশ নয়; পুরো মানব সভ্যতাই আজ এ চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে।

চীন থেকে শুরু হয়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সকল প্রান্তে। কোনো দেশে পৌঁছাতে আর বাকি নেই। এরকমভাবে  একযোগে পৃথিবীর সকল দেশ একটা রোগে আক্রান্ত হয়েছে, এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। আগে নানাদেশে মহামারি হতো। অনেক মানুষ মারা যেত। কিন্তু এভাবে একসাথে সব দেশে আক্রান্ত হওয়ার কোনো নজির ছিল না। অবশ্য এখন এর পেছনে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ এর কার্যকারণ যে জড়িত  তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আগে পৃথিবীটা এই গ্লোবাল ভিলেজ নামক তত্ত্বের সাথে পরিচিতই ছিল না। ফলে মহামারি হলে সেটা বৈশ্বিকভাবে ছড়ানোর সুযোগ পেত না।

করোনা ভাইরাস যে এত দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং মানুষকে আক্রান্ত করছে এটা খুবই চিন্তার বিষয়। বিশেষজ্ঞরা এই বৃদ্ধিকে ইংরেজিতে বলছেন ‘এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ’।  বাংলায় যাকে ‘সূচকীয় বৃদ্ধি’ বলা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কী এই ‘এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ’ বা ‘সূচকীয় বৃদ্ধি’? সেটা একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে আশা করি। এখন মানে ২০২০ সালে আমাদের পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা কত? ধরুন এটা (কম-বেশি)  সাড়ে ৭০০ কোটি। আসুন এবার একটু পেছনে ফিরে যাই। দেখে আসি কিভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে।

বলা হচ্ছে, ১৬৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ কোটি। এই ৫০ কোটি থেকে জনসংখ্যা ১০০ কোটি মানে দ্বিগুণ হতে সময় লেগেছে ২০০ বছর। মানে ১৮৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১০০ কোটি। তারপর দেখুন জনসংখ্যা আবার দ্বিগুণ বা ২০০ কোটি হতে সময় লেগেছে মাত্র ৮০ বছর। ১৯৩০ সালে তা দ্বিগুণ হয়। এর ৪৫ বছর পরে মানে ১৯৭৫ সালে এ জনসংখ্যা ৪০০ কোটি হয়েছে। ৪০০ থেকে ৮০০ কোটিতে আবার প্রায় ৪৫ বছরেই আমরা পৌঁছে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। অর্থাৎ কত দ্রুত আমাদের বৃদ্ধি হয়েছে খেয়াল করেছেন?  এটাই হচ্ছে ‘এক্সপোনেনশিয়ালন গ্রোথ’ বা ‘সূচকীয় বৃদ্ধি’।

ঠিক একইরকমভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওদের জন্য বছর লাগে না। ২-৪ দিন হলেই হয়। তাতেই ওরা আক্রান্ত করার ক্ষেত্রে সূচকীয় বৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে। এখন করোনার জন্য আসুন উদাহরণ হিসেবে জার্মানিকে ধরি। যদিও ইটালি এখন এ মহামারির সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে মৃত্যুর দিক দিয়ে। আক্রান্তও হয়েছে অনেক মানুষ। তবুও মৃত্যুর এ ভয়ার্ত মিছিলের দেশ ইটালির উদাহরণ না দিয়ে আমি অনেক আক্রান্ত কিন্তু অল্পমৃত্যু হয়েছে এমন দেশ হিসেবে জার্মানিকে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে চাই। তাতে আমরা আমাদের করণীয়টুকু অন্তত বুঝতে পারব। আর কেনই বা আমাদেরও এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই, সেটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দৈনিক আমাদের সময়র আজকের অনলাইনে আছে, জার্মানিতে প্রথম করোনা রোগী পাওয়া যায় ২৮ জানুয়ারি। ভাবারিয়া অঙ্গরাজ্যের এক ব্যক্তি এতে আক্রান্ত হন। তিনি একটি গাড়ি যন্ত্রাংশ কোম্পানিতে কাজ করতেন। ওই কোম্পানির  নাকি আবার চীনের উহানে দুটি কারখানা আছে। যাই হোক, এ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার দুই দিনের মাথায় কর্তৃপক্ষ বের করে ফেলে যে-কার মাধ্যমে ওই ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি, ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা ছিলেন, তাদেরও খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়। কি তড়িৎ পদক্ষেপ তাই না?  অথচ দেখুন এরপরেও আজ ঠিক প্রায় ২ মাসের মাথায় সেখানে আক্রান্ত হয়েছে মোট ৬৩ হাজার ৯২৯ জন। আর মারা গেছে ৬০০ জনের কম।

সেদিক বিবেচনায় নিলে আমাদের এখানে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পরে ১ মাসও কিন্তু পার হয়নি। আরও ৭ দিন লাগবে ১ মাস পূরণ হতে। তাই এখন অবধি করোনার যে চিত্র আমরা আমাদের দেশে দেখতে পাচ্ছি, তা আশাব্যঞ্জক হলেও  তাতে আমাদের তৃপ্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। ঢিলামি করা বা গা ছাড়া ভাব দেখানোর প্রসঙ্গও তাই নিতান্তই বেমানান। কারণ একটুখানি শিথিলতা দেখালেই এ অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে। তখন প্রচুর মানুষ  আক্রান্ত হয়ে যাবে খুব অল্প সময়েই।

এখন পত্রিকা বা টিভির খবরে দেখতে পাচ্ছি, মানুষ এই সময়ে আবার রাস্তায় বেরোতে শুরু করেছে। কোয়ারেন্টিনের এ সময়েই যদি মানুষ ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়ে, তাহলে কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটাই গুবলেট হয়ে যাবে। কোয়ারেন্টিন বা ছুটি শেষে সবাই যখন আবার তাদের স্ব স্ব কাজে ফেরত যাবে তখন কিন্তু এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। আর তখনই হবে এদের সূচকীয় বৃদ্ধি বা এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ।

তাই কোয়ারেন্টিন বা ঘরে থাকার এ সময়ে প্রতিটা মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য বা উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শুরুতে এটা বেশ কঠিনভাবেই হচ্ছিল। এখন সেটাতে কিছুটা শিথিলতা মনে হয় শুরু হয়েছে। এটা হলে কিন্তু খুবই খারাপ  ফল বয়ে আনবে আমাদের জন্য। তাই এ ব্যাপারে শিথিলতা দেখানোর কোন সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না৷

এর সাথে সাথে এখন আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে, সন্দেহভাজন এবং আক্রান্তদেরকে আমাদেরকে অবশ্যই ‘টেস্ট’ এর আওতায় নিয়ে আসতে  হবে। তাহলে এ ভাইরাসের ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ নিয়েও আমরা যথাযথ ধারণা করতে পারব। তাই টেস্ট, কোয়ারেন্টিন ও ‘আইসোলেশন’ একইসাথে চালিয়ে যেতে হবে এ ভাইরাসের বিস্তারকে রুখে দিতে।

প্রম্ন হচ্ছে, কতদিন এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে? এর উত্তরে বলব যতদিন পৃথিবী এ রোগ থেকে পুরো মুক্ত না হচ্ছে। অথবা যতদিন এর প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়ে তা মানুষের দেহে প্রয়োগ না হচ্ছে। ফলে করোনার বিস্তার রুখে দেওয়ার কাজটা কিন্তু ভীষণ কঠিন।

তবে এ প্রক্রিয়ার যেহেতু বিকল্প নেই, এখন অবধি আর সেই সাথে এ ভাইরাসের বিস্তার যেহেতু খুবই আগ্রাসীভাবে হয়, ফলে এ নিয়ে শিথিলতা দেখানোরও বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। বরং নিরবিচ্ছিন্নভাবে তা আমাদের করে যেতেই হবে।

ডা. পলাশ বসু : চিকিৎসক ও শিক্ষক