বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং আতরজানের করোনা সময়

মাহফুজুর রহমান
৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:৩৬

একবার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। আমার বাড়ি থেকে পাকুন্দিয়া বাজার এক মাইল দূরে। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একজনকে সাইকেল দিয়ে পাঠালাম আধা মাইল দূরের একটি স্ট্যান্ড থেকে রিকশা ডেকে আনার জন্য। মিনিট পনেরো পরে একটি ছোট্ট ছেলে রিকশা চালিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। এর বয়স বড়জোর বারো বছর। শরীরটা লিকলিকে। চুলগুলো আঁচড়ানো, ফিটফাট। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘দাদা, উডুইন’।

এই ছেলেটির এখন রিকশা চালানোর কথা নয়। হৈচৈ করে স্কুলে যাওয়ার কথা, ফুটবল নিয়ে মাঠে যাওয়ার কথা, কলাগাছের ভেলায় চড়ে বিলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। সে রিকশা চালাচ্ছে। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। একজন বিবেকবান (নিজেকে অন্তত তাই বলে দাবি করি) মানুষ হিসেবে এই বালকের রিকশায় উঠি কেমন করে! আমি ওকে বললাম, ‘এই বয়সে তুই রিকশা চালাইতে আইছস? তুই তো দুই বছরও বাঁচবি না। মইর‌্যা যাইবি।’

আমার কথাকে ছেলেটি মোটেও পাত্তা দিল না। সে বলল, ‘কতা ঠিক। কিন্তু রিকশা না চালাইলে তো দুই দিন পরেই মরবাম। আমারে খাওয়াইবো ক্যালা?’

আমার কাছে মনে হলো, অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছে সে। হাজার বছরের দর্শন লুকিয়ে আছে ওর এই একটি বাক্যে। রিকশা চালালে সে দু বছর বাঁচবে। আর রিকশা না চালালে না খেয়ে দুদিনের মধ্যেই মারা যাবে। জানতে পারলাম, ওর বাবা নেই। অসুস্থ মা আর এক বোন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষই সে। প্রতিদিন রাতেই তাকে খাবার কিনে বাড়ি ফিরতে হয়।

ছেলেটির কথা এখানে থাক। বেশ কবছর থেকে বাংলাদেশ দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রপ্তানি বাড়ছে, রেমিট্যান্স বাড়ছে, উৎপাদন বাড়ছে, মানুষের চিন্তা-ভাবনায় আধুনিকতা বাড়ছে। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ছে, পড়াশোনার চর্চা বাড়ছে, মানুষের প্রত্যাশা বাড়ছে। আমরা উন্নত দেশে পৌঁছার স্বপ্ন দেখছিলাম। আমাদের এই স্বপ্ন অলীক ছিল না। দিবাস্বপ্নও নয়। বিশ্বের বিখ্যাত অর্থনীবিদরা প্রশংসার চোখেই দেখছিলেন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। হলমার্ক-বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ, আবদুল হাই বাচ্চুর ব্যাংকিং কারসাজি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের মতো বড় বড় ধাক্কা হজম করেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল। ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কাবু করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং আমাদের জনগণের প্রত্যাশার সীমাবদ্ধতা। পাকিস্তানসহ পৃথিবীর অনেক দেশেরই স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের মতো এগিয়ে যাওয়া।

হঠাৎ করেই করোনা ভাইরাস এসে গলাটিপে ধরেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। পৃথিবীর সব দেশই আজ এই ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট এবং খুবই ঘনবসতিপূর্ণ বিধায় আমাদের ঝুঁকি আরও বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে সচেতনতার অভাব; অবশ্য সচেতনতার অভাব বলা ঠিক হবে না। তারা জেনেবুঝেই নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করেন। বর্তমান কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে অনেক মানুষই সরকারি নির্দেশ মানছেন না। তারা বাজারে যাচ্ছেন, অন্য কাজকর্ম করছেন, মোড়ের দোকানে চা খাচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থেকেও অনেকে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছেন এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আবার পবিত্র কাবা বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে বহু মানুষ নিয়মিত মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাচ্ছেন। করোনা সংক্রমণের ভয়ে আল্লাহর ঘর যদি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে তা হলে আমাদের দেশে কেন ঘরে বসে নামাজ পড়া যাবে না! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাউকে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দেননি। কিন্তু অনেকেই নিষেধ অমান্য করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না। ফলে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সমূহ ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে তারা অনুমান করেছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার চলতি বছরে শতকরা ০.২ থেকে ০.৪ ভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গত ৩ এপ্রিল এডিবির প্রকাশিত ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে তারা এ কথা বলেছেন। গত বছর বাংলাদেশে জিডিপি ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এ বছর এই প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে। তারা অবশ্য আরও বলেছেন, করোনার বিস্তার যদি আরও বেশি হয় তা হলে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে।

আতরজান বিবির তিনটি সন্তান। বড়টির বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। স্বামী কোথায় যেন চলে গেছে। ঢাকার একটি সড়কদ্বীপে শিশুগুলোকে নিয়ে রাত কাটায় সে। দিনের বেলা পাশের ছয়টি বাসায় বুয়ার কাজ করে। বড় মেয়ে রাস্তায় তার ভাইবোনদের নিয়ে ভিক্ষা করে। তাদের ছিল সুখের সংসার। এর বেশি তারা কখনো ভাবেনি। অসুখ হলে সরকারি হাসপাতালে গেলে দু-চারটি বড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু এখন শুরু হয়েছে ঘরেনটাইন। ছয়টি বাসা থেকেই তার চাকরি গেছে। বাসাগুলোতে ঢুকতেও পারে না। রাস্তায় কোনো লোক নেই, যানবাহন নেই, ট্রাফিক জ্যাম নেই। কাজেই ভিক্ষা করাও চলে না। কারা যেন এক প্যাকেট খাবার দিয়ে গিয়েছিল পরশু রাতে। একজনের খাবারই ভাগ করে চারজন খেয়েছে ওরা। খিদের জ্বালায় সবাই অস্থির। আতরজানের আয়ের হিসাব এডিবির দশমিক দিয়ে মেপে বলা যাবে না। তার পুরো আয়ই এখন লোপাট করে নিয়েছে করোনা। এদের বাঁচাতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারের উদ্যোগে সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে এই পথশিশুদের বা অসহায় আতরজানদের একটা তালিকা করা দরকার। তাদের এক জায়গায় বসিয়ে রেখে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই তাদের কাছে প্রতিদিন অন্তত কিছু খাবার পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। ত্রাণের নামে দল বেঁধে দুটো কলা বা আধা কেজি চিঁড়া নিয়ে গিয়ে মোবাইলে ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়া কেবল অর্থহীনই নয়, বরং করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টিকারী। এই দুর্যোগে আমাদের সবাইকে সহনশীল হতে হবে, যে কাজটি করা দরকার তাই করতে হবে। আর সরকার যে কাজটি থেকে বিরত থাকতে বলছেন, তা পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা একটি মহাদুর্যোগকাল পার করছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় দুর্যোগ মানবজাতি আর প্রত্যক্ষ করেনি। এই দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেই আমাদের বাঁচতে হবে।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক