‘ভয়ডরহীন’ ডোমরাও এখন ভীতসন্ত্রস্ত

আমজাদ হোসেন শিমুল রাজশাহী
৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ এপ্রিল ২০২০ ০৮:২০
প্রতীকী ছবি

দীর্ঘ সময় ধরেই লাশ কাটেন তপন কুমার। কখনই আতঙ্কিত হননি, ভয় পাননি। তবে এবার তপন আতঙ্কিত। কারণ করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতেও তাকে লাশ কাটতে হচ্ছে সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই। নেই গ্লাভস, স্যানিটাইজারের মতো সহজপ্রাপ্য জিনিসগুলোও। এমন নিরাপত্তাহীন অবস্থায় কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন এই ডোম।

শুধু তপন কুমার একা নন, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) লাশ কাটা ঘরের প্রত্যেকেই এখন আতঙ্কিত। তারা বলছেন- কোনো লাশ যে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত নয়, তার নিশ্চয়তা নেই। অথচ তারা ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য কিছুই পাননি। তাই ভয়ডরহীন এ ডোমরা এখন করোনা ভাইরাস নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। মৃতদেহ থেকে তারাও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

এদিকে করোনা ভাইরাস শনাক্তের জন্য রামেকে স্থাপিত ল্যাব থেকে সব ধরনের বর্র্জ্য নিয়ে ফেলা হচ্ছে লাশ কাটা ঘরের পাশে একটি গর্তে। এর পাশ দিয়েই সব সময় চলাচল করেন ডোমরা। তাই এখান থেকেও ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তাদের। ডোমরা এর প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার সকালে কীটনাশক পানে মারা যাওয়া এক তরুণীর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে গেলে ডোমরা কাটা-সেলাইয়ে ভয় পান। তাই লাশটি কাটা বাদ দিয়ে ছয়জন ডোম রামেক ক্যাম্পাসে ভাইরাসবিদ্যা বিভাগের প্রধান সাবেরা গুলনাহারের কাছে যান। তার কাছে নিজেদের ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই), গ্লাভস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দাবি করেন।

এ ছাড়া করোনার ল্যাবের বর্জ্যগুলো মর্গের পাশে না ফেলে পুড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে পরে ডোমদের কাজে পাঠান সাবেরা গুলনাহার।

এ বিষয়ে ডোম তপন কুমার বলেন, ‘আমাদের কাজের জন্য তেমন টাকা-পয়সা দেওয়া হয় না। লাশের স্বজনদের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হয়। হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই। এ অবস্থায় যদি কোনো রোগে আক্রান্ত হই, তখন তো আমাদের পরিবারের সদস্যরা মহাবিপদে পড়বে। তাই আমরা লাশ কাটার সময় নিজেদের সুরক্ষার দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে আর কাজ করা সম্ভব হবে না।’

আরেক ডোম বিপন কুমার বলেন, ‘লাশ মর্গে ঢোকানো, কাটা, সেলাই আবার গাড়িতে তুলে দেওয়া-সব কাজই আমাদের। ফরেনসিক বিভাগের একজন চিকিৎসক শুধু নমুনা সংগ্রহ করেন। দেহে কোনো আঘাত আছে কিনা তা যখন চিকিৎসক দেখেন, তখনো ডোমদেরই লাশ ধরে কাজ করতে হয়। তাই মৃত কোনো ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত থাকলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি। কিন্তু পিপিই তো দূরের কথা, আমাদের জন্য গ্লাভস কিংবা স্যানিটাইজার পর্যন্ত নেই।’

জানতে চাইলে রামেক অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, ‘ডোমদের জন্য ১০টি পিপিই আছে। সেগুলো ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলো এখনো ডোমদের দেওয়া হয়নি। কারণ সব লাশ কাটার সময় ডোমরা পিপিই ব্যবহার করতে পারবেন না। কেবল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা চিকিৎসকদের সন্দেহজনক কোনো লাশ কাটার সময়ই সেগুলো তাদের দেওয়া হবে।’

লাশ কাটা ঘরের পাশেই করোনার ল্যাবের বর্জ্য ফেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্জ্যগুলো বিশেষ ধরনের একটি পলিথিন ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলা হয়। তাই সেখান থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। তার পরও বিষয়টি নিয়ে ডোমদের আপত্তি ওঠায় আমরা বিকল্প চিন্তা করব।’