স্মৃতি হাতড়েই দিন কাটছে পরিবারের

ইউসুফ সোহেল
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ১১:০১

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। তবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এবারের ঈদটি সবার কাছেই একটু অন্য রকম। চারদিকে মহামারী করোনার আতঙ্ক। প্রতিদিনই করোনার ছোবল কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। লকডাউনে দমবন্ধ পরিস্থিতিতে আক্রান্তরা ধুঁকছেন দিন-রাত। বিচলিত পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা। এ অবস্থায় ভালো নেই কেউই। শোককাতর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী মানুষগুলোর পরিবার। প্রিয়জনের স্মৃতি হাতড়েই এখন দিন কাটছে তাদের। পুরো দেশের চিত্রই এখন এটি।

দেশের জন্য প্রথম জীবন উৎসর্গকারী চিকিৎসক সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনের পরিবারেও একই চিত্র। করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ এপ্রিল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান করোনাযুদ্ধে প্রথম সারির এ যোদ্ধা। কোভিড-১৯ শেষবারের মতো বাবার লাশটি ছুঁতে এমনকি দেখতেও দেয়নি ১১ বছরের শিশু ফাইয়াজ মাহমুদ জিয়াদ ও ৭ বছরের আব্দুল্লাহ মাহমুদ জায়ানকে।

গরিবের চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে গত ঈদুল আজহা উদযাপন করলেও করোনার কাছে হেরে গিয়ে আজ তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তাই বাবাকে ছাড়া ছোট্ট জিয়াদ ও জায়ানের প্রথম ঈদ। মন ভালো নেই দুই ভাইয়ের। সারাক্ষণ বাবাকে শুধু খুঁজে ফেরে তারা। তাদের সান্ত¦না দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই। স্বামীকে হারিয়ে শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী ডা. চৌধুরী ইসরাত জাহানও। স্বামীর স্মৃতি হাতড়ে এখন দিন কাটছে তার। পরিবারের অন্য সদস্যরাও শোকে বিহ্বল।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে কথাগুলো বলছিলেন শহীদ ডা. মঈন উদ্দিনের ভায়রা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. তানভীর মোহিথ। ঘটনার বর্ণনার সময় যেন শোকে কণ্ঠ ধরে আসছিল তার।

ডা. তানভীর মোহিথ বলেন, ঢাকা মেডিক্যালের মেধাবী ছাত্র ডা. মঈন উদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র-বিনয়ী। তিনি গরিব মানুষের কাছ থেকে ফি নিতেন না। সিলেটের ১২২ নম্বর হাউজিং এস্টেটে সপরিবারে থাকতেন। দোতলায় থাকতেন শ্বশুর ডা. সিএম নুর আহমেদ ও শাশুড়ি ডা. জেডএস মুনসুরা খাতুন। এই ফ্লোরেই সপরিবারে থাকেন ডা. তানভীর মোহিথও।

গত ৫ এপ্রিল ডা. মঈন উদ্দিনের করোনা পজিটিভ আসে। অবস্থায় অবনতি হলে ৭ এপ্রিল সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে রাখা হয়। সেখান থেকে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। করোনা রোগীদের সেবা করতে গিয়েই ডা. মঈন উদ্দিন জীবন দিয়েছেন। তার মৃত্যুতে অবশ্য আমূল পরিবর্তন এসেছে সিলেটের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয়।

ডা. তানভীর মোহিথ আরও জানান, কর্মে, চিন্তাচেতনায় সব সময়ই স্বচ্ছ ছিলেন ডা. মঈন উদ্দিন। সর্বদাই ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল। প্রতিবার সবাই একসাথে ঈদ উদযাপন করতাম। মনে একটাই কষ্ট, এবার তিনি আমাদের মাঝে নেই। বাবা ছাড়া জীবনের প্রথম ঈদ পালন করতে যাচ্ছে ছোট্ট জিয়াদ ও জায়ান। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। তারা এখনো বুঝতে পারছে না বাকি জীবন বাবা ছাড়াই ঈদ করতে হবে তাদের। শিশু দুটির মুখের দিকে তাকানো যায় না। অনেক বুঝিয়েও শান্ত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জায়ানকে নিয়ে চিন্তিত আমরা। ও কিছু খেতে চায় না। কি দিন, কি রাত- বেলকুনিতে গিয়ে একা একা বসে কাঁদে বাবার জন্য। নোট বুকে বাবার কাছে সে চিঠি লিখে। এই দৃশ্য কত যে কষ্টের, তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। ডা. মঈন উদ্দিনের রেখে যাওয়া হাজারো স্মৃতি, আছে অনেক কথা, যা ভুলতে পারছি না আমরা। ভোলা যায় না, ভোলা যাবেও না! জীবন তো থেমে নেই।