করোনাকে অবহেলার দায় মেটাতে হবে জীবন দিয়েই

২৩ মে ২০২০ ০০:৪০
আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০০:৪০

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যদি মাত্র সাত দিন আগে থেকে সামাজিক দূরত্বের বিধানটুকু আরোপ করা হতো, তা হলে এখন পর্যন্ত মারা যেত ৩৬ হাজারের কম লোক। অর্থাৎ অনেকগুলো জীবন বেঁচে যেত। অথচ দেশটিতে এখন যে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখে। গত বৃহস্পতিবার এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর। করোনার শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়াকড়ি আরোপ করতে রাজি হননি। করোনাকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি মার্কিন ইমেজ ও নিজের আসন্ন নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শুধু শুরুর দিকে কেন, দেশটিতে যখন করোনায় আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে, সে সময় খোদ ট্রাম্পই আওয়াজ
তুলেছেন লকডাউন তোলার। এসব হেলাফেলার মাশুল এখনো দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
করোনাকে হালকা করে দেখা আরেকটি দেশ হলো ব্রাজিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট জইর বোলসোনারো করোনাকে সামান্য ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই কারণে দেশটি করোনা মোকাবিলায় তেমন প্রস্তুতিও নেয়নি। আর এখন ব্রাজিল করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে রোগীর সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আর মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২০ হাজার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করে আসছে যে তড়িঘড়ি করে লকডাউনসহ অন্যান্য বিধিনিষেধ দ্রুত উঠিয়ে নেওয়া যাবে না। দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার তাগিদ বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও বিশ্বনেতারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অজুহাতে উপযুক্ত সময়ের আগেই লকডাউন তুলে নিচ্ছেন। জার্মানিতে দেখা গেছে, লকডাউন তোলার পরপরই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। রাশিয়ায় যখন রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সে সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন লকডাউন শিথিল করলেন। এখন দেশটি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয়। গতকাল পর্যন্ত রাশিয়ায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৮ জন। এ সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। অর্থাৎ, যেসব দেশে লকডাউনসহ অন্যান্য নিয়ম পালনে শিথিলতা ছিল, সেসব দেশে আক্রান্ত ও মৃতের হার ঊর্ধ্বগামী।
করোনার বিধিনিষেধ মানার ক্ষেত্রে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়ও। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই শিথিল করা হয়েছে। জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত এ দেশগুলো লকডাউন কঠোর না করার পেছনে সরকারগুলো যুক্তি দেখিয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী না খেয়ে মারা যাবে। অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, করোনায় মারা যাবে, নাকি ক্ষুধায় মারা যাবে। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সরকারের ওপর মহল থেকে শুরু করে জনসাধারণের একাংশ করোনাকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। এর দায় কে নেবে?
চলতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে চীনের উহানে নতুন করোনা ভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় চার মাস হতে চলল। এ সময়ের একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, যেসব দেশ শুরু থেকেই নিয়মকানুন কঠোরভাবে পালন করেছে, সেসব দেশ করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। আর যেসব দেশে লেজেগোবরে অবস্থা, তারাই জীবন দিয়ে এর মাশুল দিয়েছে। খোদ চীনের প্রতিবেশী দেশ তাইওয়ান ও হংকংয়েও ভাইরাসটি খুব একটা ছড়ায়নি। ভিয়েতনামে করোনায় কেউ মারা যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়ালেও দ্রুতই সেটিকে বাক্সবন্দি করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। নিউজিল্যান্ড করোনা মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুরের কার্যক্রম ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। যদিও দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে, তবে সে দেশের সরকার বেশ আন্তরিকভাবে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কাজেই প্রাণঘাতী এ ভাইরাসকে হেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি আর কিছুই জানে নাÑ মানুষকে আক্রমণ করতে জানে, মারতে জানে আর দ্রুত ছড়াতে জানে। দেশে সরকারে কোন দল আছে, প্রধানমন্ত্রী কোন দলের, অর্থনীতি কেমনÑ এসব বিষয় করোনার অভিজ্ঞানে নেই। এ কারণে করোনা থেকে মুক্তি পেতে হলে কঠোর নিয়ম পালন ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। আর ঢিলেমি করলে শুধু মৃত মানুষের সারি পাহাড়সম হবে।