লিবিয়ায় মানবপাচার : ভৈরবে ৪ মানব পাচারকারী আটক

খাইরুল ইসলাম সবুজ,ভৈরব প্রতিনিধি
৩ জুন ২০২০ ১৮:৫৫ | আপডেট: ৩ জুন ২০২০ ১৯:০৮
ভৈরবে আটক মানব পাচারকারী চক্রের তিন সদস্য। ছবি : আমাদের সময়

লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে খুন হওয়া ২৬ বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন ভৈরবের ৬ জন। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় মানবপাচারকারী দালাল চক্রের প্রধান হেলাল মিয়া, খবির উদ্দিন ও শহিদ মিয়া এ ছয় যুবককে প্রথমে ভারত ও পরে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। কয়েক হাত বদল করে অভিবাসী যুবকদের জিম্মি করে তারা। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করে নগদ ১০ হাজার ডলার।

নিহত ৬ যুবকের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আজ বুধবার ভোরে এক অভিযানে মানবপাচার চক্রের সক্রিয় ৪ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-১৪) ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-১৪'র অধিনায়ক ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল এফতেখার উদ্দিন।

গ্রেপ্তারের পর আটককৃত ৩ পাচারকারী হেলাল মিয়া, খবির উদ্দিন ও শহিদ মিয়াকে সাংবাদিকেদের সামনে উপস্থিত করা হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে চক্রটির এক নারী সদস্যকে সামনে আনা হয়নি।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভৈরব ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক ল্যাফটেন্টে কর্নেল এফতেখার উদ্দিন জানান, নিহত ৬ যুবকের পরিবার অভিযোগ জানানোর পর গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় হেলাল উদ্দিন হেলু, শহিদ মিয়া, খবির উদ্দিনসহ এক নারীকে আটক করা হয়।

তিনি জানান, ভৈরবের ৬ যুবককে তারা বিভিন্ন কৌশলে কয়েকবার হাত বদলের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাচার করে। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের পাচার কাজের কথা স্বীকার করে তারা।

কর্নেল এফতেখার বলেন, ‘আটককৃতরা অভিবাসীদের জিম্মি করে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যামে অত্যাচার করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করতো। পরে এসব ভিডিও দেখে অপহরণকারীদের কাছে টাকা পাঠাতে বাধ্য হতো পরিবারের সদস্যরা।’

গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার সকালে লিবিয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ভৈরববাসীরা হলেন- উপজেলার আকবরনগর গ্রামের জিন্নত আলীর ছেলে মাহবুব (২১), রুসুলপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে মো. আকাশ (২৬), শ্রীনগরের বাচ্ছু মিয়ার ছেলে সাকিব, ভৈরব বাজারের অধির দাসের ছেলে রাজন দাস, সম্ভুপুর গ্রামের আ. সাত্তার মিয়ার ছেলে মো. জানু মিয়া (২৭), মৌটুপী গ্রামের আবদুল আলীর ছেলে মো. সোহাগ (২০)। তাদের মধ্যে শাকিল নামে এক নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জগন্নাথপুর গ্রামের সজল গুরুতর আহত হয়ে ত্রিপোলির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে ইতালি অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ভারত ও দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছান নিহতরা। এরপর প্রায় দুই মাস মানব পাচারকারীরা তাদেরকে লিবিয়ায় গোপন করে রেখেছিল বলে জানিয়েছেন নিহতের পরিবার।

তারা আরও জানায়, উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের। কিন্তু প্রচলিত ও ব্যবহৃত পথে না গিয়ে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বেশ বিপদসংকুল একটি পথে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অপহরণকারীদের সঙ্গে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কাঙ্খিত মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় অনেক অভিবাসী।

তবে নিহতদের পরিবার দাবি করছে, অনেকেই মুক্তিপণ হিসেবে ১০ হাজার ডলার করে পাঠিয়েছেন। তবে দেশে লকডাউন থাকায় অনেকেরই টাকা পাঠাতে বিলম্ব হয়েছে। মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আাটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা। এক পর্যায়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এরপর অপহরণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে ৩৮ জন বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হয়। মারা যায় ২৬ জন।

এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-১৪ অধিনায়ক ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল এফতেখার উদ্দিন বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে মোট ৩৮ জন মানব পাচারকারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এর বাইরে আরও অনেক দালাল রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। দালালদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই যেকোনো মূল্যে মানবপাচার বন্ধ করতে আমরা শক্ত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছি।’