ডিএনডিতে আশার আলো

লুৎফর রহমান কাকন ও এমরান আলী সজীব
৩০ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২০ ০৮:৩৯
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ এলাকার বাসিন্দাদের কাছে বর্ষা মানেই ভোগান্তি, নান দুর্ভোগ। খানিক বৃষ্টিতেই এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। তা নিরসনে নির্মাণ করা হচ্ছে স্লুইসগেট। ছবি : নজরুল মাসুদ

দুদিন আগেও ডিএনডি প্রকল্পের কাজটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ ডিএনডির জন্য সরকার যে আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছে সেই টাকা কয়েক পর্যায়ের কাজে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা নতুন করে (আরডিপিপি) ১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রথমে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এতে ৩০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কী ভূমিকা থাকবে, সেটা নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অর্ধেক কাজ হওয়া প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ডিএনডি প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা কী খোঁজ নিতে গেলে জানা যায়, সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীন ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে। ১৯৬৫ সালে ৫৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নির্মাণকাজ করা ডিএনডি প্রকল্পটি ২০২০ সালে এসে একটি অপরিকল্পিত এবং অব্যবস্থাপনার নগরীতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা মাফিক প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, খাল, জমি ও রাস্তা পুনরুদ্ধার করতে হচ্ছে। একই খাল কয়েক দফা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। কারণ অসচেতন মানুষ প্রতিনিয়ত খালেই ময়লা-আবর্জনা ফেলছে। ফলে পরিকল্পনা মাফিক কাজ বাস্তবায়ন করতে খরচও বেড়ে গেছে অনেক।

বিষয়টি নিয়ে ১৯ ইসিজিবির প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মাশফিকুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, প্রকল্প এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এখানে ওয়াসা, বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার সার্ভিস লাইন রয়েছে। এগুলোর সঠিক কোনো প্ল্যানে করা হয়নি। মানুষের বাড়িঘরের বর্জ্যরে জন্য কোনো স্যুয়ারেজ লাইন নেই। ফলে কাজ করতে গেলেই বিভিন্ন জায়গায় সংকট তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনা এবং মানুষের অসচেতনতা তো রয়েছেই। তিনি বলেন, আমরা এমনভাবে প্রজেক্টের কাজটি শেষ করতে চাই যে রকম সেনাবাহিনীর কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে। কাজটি যাতে দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে সুফল দেয় এবং টেকসই হয় সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। পুরো ডিএনডি এলাকাটি যাতে দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এবং আগামী কয়েক যুগে যেন এই এলাকায় কোনো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।

আর্থিক অনিশ্চয়তায় প্রকল্পের কাজ থেমে যেতে পারে কিনা জানতে চাইলে গতকাল টেলিফোনে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, যে কোনো প্রকল্পের বরাদ্দের বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আগের বরাদ্দের অর্থ খরচ নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছিল এবং নতুন বরাদ্দ কীভাবে খরচ হবে সেটা নিয়েও আলোচনা করেছে। আজ (গতকাল) পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নতুন বরাদ্দ প্রস্তাব কিছুটা কাটছাঁট করে অনুমোদন হবে বলে তিনি জানান। মন্ত্রী বলেন, ডিএনডির প্রকল্পটি নিয়ে সেখানকার সংসদ সদস্য শামীম ওসমান আন্তরিক চেষ্টা করছেন। ফলে এইটুকু বলতে পারি এ প্রকল্পের কাজ আটকাবে না। ঠিকমতোই শেষ হবে।

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, ডিএনডি প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনী করছে। আশা করছি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করবে তারা। আর্থিক বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, এ প্রকল্পে সংশোধিত বাজেটের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেটাও হয়ে যাবে। করোনার কারণে সব কিছুতেই একটি সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক কাজে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ডিএনডি প্রজেক্টের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

১৯৬৫ সালে ৫৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয় ডিএনডি প্রকল্পের। নির্মাণকাজ ১৯৬৮ সালে শেষ হয়। অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে ২৩৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বর্তমান ঢাকা-৪, ৫ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন এলাকা নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয় ডিএনডি সেচ প্রকল্প। ১৯৮৮ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা হলেও ডিএনডি এলাকাটি বন্যামুক্ত রয়ে যায়। এর পরই ডিএনডি এলাকায় শুরু হতে থাকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপন। ফলে এর সেচ প্রকল্প চাহিদামতো পানি নিষ্কাশন করতে না পারার কারণে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে থাকে। ডিএনডির পানি নিষ্কাশনের খালের মধ্যে ৬০ শতাংশ খাল ভরাট, বেদখল হয়ে যাওয়া এবং আবাসিক এলাকা বৃদ্ধিসহ মানুষের ব্যবহার্য পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের নিষ্কাশন খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হচ্ছিল না।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১০ সালে সরকার ২৩৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট একনেকের সভায় ৫৫৮ কোটি টাকার ডিএনডির এক মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পানি নিষ্কাশনের খাল পুনঃখননের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রজেক্ট সম্পন্ন করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সেনাবাহিনী চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জুনে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান গত রবিবার টেলিফোনে আমাদের সময়কে বলেন, তিনি কৃতজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। একনেকের সভায় ডিএনডি নিয়ে কোনো এজেন্ডা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তার অনুরোধে ডিএনডি প্রজেক্ট টেবিল এজেন্ডা হিসেবে তুলে অনুমোদন করেছেন। আর্থিক অনিশ্চয়তা বিষয়ে শামীম ওসমান বলেন, আমি সব জায়গায় কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ ডিএনডির কাজ আর্থিক সংকটে আটকাবে না।

এদিকে সরেজমিন ডিএনডির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রবল বর্ষণে এখনো পানি আটকায়। তবে সেটা দ্রুত নেমে যায়। সেনাবাহিনী পুরো ডিএনডি এলাকার ৯৩ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার খালের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার উদ্ধার এবং ৬৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি ডিএনডি প্রজেক্টের জন্য অত্যাধুনিক পাম্প বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পাম্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ডিভাইস, যাতে পাম্পগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পানি টানার কাজ করবে। তবে সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতাধীন ডিএনডির নিজস্ব জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২৭টি মসজিদ, ১১টি মাদ্রাসা, ১৩টি সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজ, একটি মন্দির, ১টি পুলিশ চেকপোস্ট, ৪টি পেট্রল পাম্প ও ওয়াসার পাম্প হাউস, ৫টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। ইতোমধেই প্রায় ২৮ অবৈধ দখলদার উচ্চ ও নি¤œ আদালতে রিট করায় উচ্ছেদ অভিযানে বাধা পেতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে।