করোনায় ঘরবন্দি মানুষ এবার বন্যায় পানিবন্দি

আমাদের সময় ডেস্ক
৩০ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২০ ২৩:০৭

দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনায় বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। এসব এলাকার পাশাপাশি ফরিদুপরের সদরপুর ও মাদারীপুরের শিবচরে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন।

এদিকে করোনার কারণে কর্মহীন মানুষজনের কাছে নতুন দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে বন্যা। এ মহামারীর কারণে টানা তিন মাস ঘরবন্দি লোকজন এবার বন্যায় পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। হাতে কাজ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। একদিকে করোনার থাবা অন্যদিকে বন্যা ও নদীভাঙনের গর্জন। এতে জীবন, জীবিকার পাশাপাশি এবার আশ্রয় নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন চরাঞ্চল ও নদী তীরের বাসিন্দারা।

টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর পানি সোমবার বেলা ৩টায় বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে যমুনা নদীর অববাহিকায় চর এবং আশপাশে গ্রামগুলো জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত। বন্যাকবলিত লোকজন অনেকে পাকা স্কুল, সড়ক, বাঁধ ও উঁচু

স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাঙনকবলিত ও পানিবন্দি লোকজন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গরু-ছাগল নিয়ে নৌকায় করে আসবাবপত্র নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।

এদিকে যমুনায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় ২০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে চরাঞ্চলের নিম্নভূমি। সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, পানি আরও কয়েকদিন বাড়তে পারে। এ ছাড়া রবিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বনবাড়িয়া এলাকায় পাউবোর নির্মিত সøুইসগেটের প্লেট আকস্মিকভাবে ভেঙে যাওয়ায় এলাকায় তীব্র স্র্রোতে পানি প্রবেশ করেছে। এতে সড়ক বিভাগের সদ্য নির্মিত সেতু হুমকিতে পড়েছে।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরের বন্দরখোলা ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হয়েছে গত বছরে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদ ভবন। নদীতে বিলীন হয়েছে অস্থায়ী বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার। এ ছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন তলা ভবন, প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন, একটি বাজারসহ বিস্তীর্ণ জনপদ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার সাখাওয়াত হোসেন জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম শামীমুল হকের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। ডাম্পিং এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ হলেও সামনের এলাকায় নদী ব্যাপক ভাঙছে। একটি মসজিদও নদীতে বিলীন হয়েছে। ওই এলাকায় প্রজেক্ট না থাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা যাচ্ছে না।

রংপুর অঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সব নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। তলিয়ে গেছে সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের ১০৩টি ইউনিয়নের আড়াই লাখ মানুষ। বসতবাড়িতে পানি ঢোকায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে বানভাসী মানুষদের। মিলছে না ত্রাণ সহায়তাও।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ জানান, ভারতে ভয়াবহ বন্যা হওয়ায় তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পানি আরও বাড়তে পারে।

পদ্মানদীর পানি বৃদ্ধিতে রাজবাড়ীর নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির ফসল ডুবে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। উজানচর, দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম, বরাট, মিজানপুর, চন্দনী, খানগঞ্জ, রতনদিয়া, কালিকাপুর, হাবাসপুর, বাহাদুরপুর প্রভৃতি ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন গ্রাম ও ফসল ডুবে গেছে।

কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে। বন্যার কারণে নদ-নদী অববাহিকার গ্রামগুলোতে পানি প্রবেশ করেছে। করোনার কারণে কর্মহীন মানুষজনের কাছে চরম দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে বন্যা। পানি বৃদ্ধির ফলে ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর বাম তীর রক্ষায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে বাঁধটির টি পাটের বেল মাউথের ৫০ মিটার বিলীন হয়ে গেছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, টি-বাঁধটি রক্ষায় দ্রুততার সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনজন ঠিকাদারের মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজ চলছে। টি-বাঁধটি রক্ষায় গত ডিসেম্বরই বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। এর পর তিনবার প্রস্তাবনা দিয়েও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বরাদ্দ পাওয়ায় তা দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। আশা করছি বাঁধটি রক্ষা করা যাবে।

ফরিদপুর পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুরের সদরপুরে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। চরমানাইর, চর নাসিরপুর, ঢেউখালি ও দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়াসহ ৪টি ইউনিয়নে ব্যাপক আকারে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের কারণে বর্তমানে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদী পাড়ের হাজারো মানুষজন।

যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গতকাল সোমবার বিকাল পর্যন্ত উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ৪৪টি গ্রামের ১৬ হাজার ৩৬৭টি পরিবারের প্রায় ৬৫ হাজার ৪৭০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপক আবদুল মান্নান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি ৩০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

টাঙ্গাইলের প্রধান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে যমুনা, ঝিনাই ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে নদী তীরবর্তী সদর, ভূঞাপুর এবং কালিহাতী উপজেলায় বেশ কিছু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। এতে অনেকেই পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অপরদিকে নদী ভাঙনও অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে সুনামগঞ্জে জেলার নয়টি উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। রবিবার রাত থেকে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় উঁচু এলাকার পানি হ্রাস পেলেও জেলার নিচু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গতকাল সোমবার বিকাল তিনটায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে সুনামগঞ্জ-ছাতক, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

Ñপ্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক প্রদীপ মোহন্ত কুড়িগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক হারুন-উর-রশীদ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি খায়রুল ইসলাম, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি কাজল আর্য, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি বিন্দু তালুকদার, ফরিদপুর প্রতিনিধি সুমন ইসলাম, রাজবাড়ী প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম, শিবচর প্রতিনিধি সম্পা রায় ও জামালপুরের ইসলামপুর প্রতিনিধি সাহিদুর রহমান।