অপরিকল্পিতভাবে অনলাইন ক্লাস আত্মঘাতী হবে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২০ ০২:১৮
প্রতীকী ছবি

বিভিন্ন সমস্যা সত্ত্বেও সেগুলো সমাধান না করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে তা আত্মঘাতী হবে বলে মনে করেছেন শিক্ষকরা। তাই অনলাইনে ক্লাস শুরুর আগে শতভাগ শিক্ষার্থী যেন এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে সে বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানানো হয়। এতে বেশ কিছু দাবি জানিয়ে বলা হয়, শুরুতে শুধু স্নাতকোত্তর ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণের আগে স্নাতক শ্রেণির ক্লাস শুরু করা হবে অনুচিত।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পর সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে ক্লাস শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার পর এ প্রতিক্রিয়া জানালেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই সংগঠন। তারা বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পুনরুদ্ধারে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে এটি শুরু করতে হবে। অপরিকল্পিত, অপ্রস্তুত ও বৈষম্যমূলক পন্থায় তা চালুর চেষ্টা হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আত্মঘাতী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ। প্রশ্নোত্তরপর্বে আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, কামরুল হাসান মামুন, কাজী এস ফরিদ, শর্মী হোসেন, কিবরিয়া ইসলাম, সিত্তুল মুনা হাসান, খাদিজা মিতু ও আরিফুজ্জামান রাজীব।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালুর আগে প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাস্তব অসুবিধার কথা বিবেচনা করতে হবে। এটি চালানোর প্রতিবন্ধকতা ও পূর্বশর্তগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রতিকার এবং পদক্ষেপ নেওয়ার পরেই কেবল অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে যাওয়া যেতে পারে।

অনলাইন শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কিছু প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে বলা হয়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাস শুরু করলে বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী আকারে দেখা দেবে। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সক্ষমতা এখনো অনলাইন কার্যক্রম চালানোর ন্যূনতম পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। করোনার দুর্যোগকালীন বিশেষ শিক্ষাপঞ্জি তৈরি করে সেই সময়সীমার মধ্যে শেখানো সম্ভব এমন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিও করা হয়নি। মহামারীর কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বাড়ি ফিরে গেছেন এবং প্রান্তিক স্থানে উপযুক্ত ইন্টারনেট সংযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন অনেকেরই নতুন করে কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন কেনারও সামর্থ্য নেই। ইন্টারনেট সেবার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং তা শিক্ষার্থীদের কাছে বিনামূল্যে পৌঁছানো ছাড়া শিক্ষাকে অনলাইনে নিয়ে গেলে তা নতুন ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি করবে।

এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণও তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের ২০০ জনের একটি ক্লাসের জরিপে দেখা গেছে, ৪০ জন শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার মতো যন্ত্র বা ইন্টারনেট কেনার মতো অর্থ নেই। অনুমান করা যেতে পারে, সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই অনুপাতটি আরও বেশি হবে। ভার্চুয়াল পরিবেশে ক্লাস নেওয়ার জন্য যে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন তা-ও নেই অধিকাংশ শিক্ষকের।

এ অবস্থায় বেশ কিছু দাবি জানায় শিক্ষায় শিক্ষকদের এই সংগঠন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট এবং দেশের সব অঞ্চলে প্রয়োজনীয় গতির ইন্টারনেট প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে সংকটে থাকা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক বছরের জন্য মাসে তিন হাজার টাকার বৃত্তির ব্যবস্থা করা ও প্রয়োজনে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তুতি রাখা। কমপক্ষে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষমতা অর্জনের জন্য এককালীন ২০ হাজার টাকার বৃত্তির ব্যবস্থা করা। অর্থনৈতিক বিবেচনায় দুঃসাধ্য হলে তা দীর্ঘমেয়াদি সুদহীন ঋণ হিসেবে দিতে হবে। এসব শিক্ষার্থী নির্বাচন বিভাগীয় পর্যায়ে হবে এবং এ ক্ষেত্রে অনিয়ম রোধে নিতে হবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা।

এ ছাড়া সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। মহামারীর এই সময়ে নিশ্চিত করতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের চাকরি ও পূর্ণ বেতন। ‘ই-লার্নিং’ কনটেন্ট তৈরির ব্যবস্থাও করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি। অনলাইনে ই-শিক্ষণ চালুর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত পরিবর্তনও আনতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে বাতিল করতে হবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন বহাল রেখে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলে শিক্ষকরা প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।