পদ্মা-যমুনার ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে

আমাদের সময় ডেস্ক
৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২০ ২২:৫৯

পানি কমতে শুরু করলেও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে দেশের প্রধান দুই নদী পদ্মা ও যমুনার ভাঙন। পদ্মার ভাঙনে রাজবাড়ীতে শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। আর মাদারীপুরের শিবচরের চরজানাজাত ইউনিয়নে ভাঙনের মুখে পড়া এক চেয়ারম্যানের বাড়িসহ শতাধিক বাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় বুধবার রাতে যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে সিমলা স্পারের ৭০ মিটার ও অর্ধশতাধিক বাড়িঘর। এলাকায় যমুনার ভাঙন আতঙ্কে আছে মানুষ।

এদিকে সরকারি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, গতকাল সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে রাজবাড়ী ও মাদারীপুরে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে টাঙ্গাইল, বগুড়া ও কুড়িগ্রাম জেলায়। আর উন্নতি হয়েছে জামালপুর ও গাইবান্ধায়। অবশ্য এসব জেলায় এখনো পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমলেও বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের কষ্ট কমেনি মোটেও। তারা ভুগছেন শুকনো খাবার সংকটে। এখনো বেশিরভাগ মানুষের হাতে কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি। রাখার নিরাপদ জায়গা না থাকায় গবাদিপশু নিয়ে অনেকে পড়েছেন বিপাকে।

টাঙ্গাইল : জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। যমুনা, ধলেশ্বরী ও ঝিনাই নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, আগের দিনের চেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জোকারচর পয়েন্টে যমুনা ও ঝিনাই নদীর পানি কমে বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এলাসিন পয়েন্টে ধলেশ^রীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানিয়েছে, ভূঞাপুর, কালিহাতী ও সদর উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন এবং ভূঞাপুর পৌরসভার একাংশ বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে

আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম : জেলার বেশিরভাগ নদনদীর পানি কমলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। করোনা ও বন্যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে বন্যার্ত মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসডি মাহমুদ হাসান জানান, গতকাল ধরলার পানি সদর পয়েন্টে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

গাইবান্ধা : জেলায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি কমতে শুরু করায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে গতকালও ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে করতোয়ার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বা উঁচু স্থানে আশ্রিত বানভাসি মানুষের মধ্যে শুকনা খাবার, বিশুব্ধ পানি ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

রাজবাড়ী : জেলায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী সদর, কালুখালী ও পাংশা উপজেলার ১২ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে শত শত ঘরবাড়ি। ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দৌলতদিয়া ইউনিয়ন। ক্ষতিগ্রস্তরা সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুর ইসলাম শেখ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

বগুড়া : বগুড়ায় যমুনা নদীর পানির উচ্চতা ৩ সেন্টিমিটার কমলেও বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী, এ নদীর পানি কিছুটা কমেছে। তবে বেড়েছে বাঙালি নদীর পানি। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিষয়টি এ তথ্য জানান বগুড়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান।

এদিকে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার মানুষ গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। একদিকে গরু-মহিষ ও ছাগলকে চাহিদা অনুযায়ী খাবার দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে শুকনো জায়গার অভাবে নিরাপদে রাখার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে তিন উপজেলার শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জ সদরে যমুনা নদীর পানির প্রবল স্রোতে সিমলা স্পারের ৭০ মিটার ও অর্ধশতাধিক বাড়িঘর যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। বুধবার রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের শিমলা এলাকায় এই ভাঙন শুরু হয় বলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল আলম জানান। সদ্য সংস্কার করা এই স্পারে ভাঙনের কারণে পুরো এলাকা এখন হুমকিতে পড়েছে। অবশ্য পাউবোর পক্ষ থেকে বালুর বস্তা ফেলা হলেও কোনো কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। মাত্র ১০ দিন আগে স্পারটির সংস্কারকাজ করা হয়েছিল।

এদিকে যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার কমলেও চৌহালীতে পানি বেড়েছে। গতকাল সকালে পানি ২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিামিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে।

শিবচর : পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের ৩ ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনকবলিত চরজানাজাত ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের বাড়িসহ শতাধিক বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভয়াবহ ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক স্কুলভবন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে জিওব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

জামালপুর : জামালপুরে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও কমছে না বন্যাকবলিতদের দুর্ভোগ। জেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ শুরু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে দাবি করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। আর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ চলছে। আরও ত্রাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিনি আরও বলেন, ভারতে বন্যা না হলে যমুনার পানি আরও দ্রুত কমবে।

# প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক প্রদীপ মোহন্ত, জামালপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আতিকুল ইসলাম রুকন, কুড়িগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক হারুন-উর-রশীদ, টাঙ্গইল সদর প্রতিনিধি মা.আবু জুবায়ের উজ্জল, গাইবান্ধা প্রতিনিধি খায়রুল ইসলাম, রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম ও চৌহালী প্রতিনিধি আব্দুল লতিফ ও শিবচর প্রতিনিধি সম্পা রায়