মেহেরপুরে সংক্রমণ সর্বনিম্ন রাখার লড়াই

মীর মাহলায়েল আলী শিশির মেহেরপুর
৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২০ ২২:৫০

করোনা প্রাক্কালে মানুষের কল্যাণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে বিশেষ কয়েকটি মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। তারই ধারাবাহিকতায় নিবেদিতপ্রাণ মেহেরপুর জেলা পুলিশ বিভাগও। চীনের উহান প্রদেশে নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতামূলক ব্যানার প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগের সব মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়। মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ামাত্রই মেহেরপুর জেলা পুলিশ প্রতিটি থানা ও ক্যাম্পের মাধ্যমে জেলা, উপজেলা, পৌর এলাকাসহ বাজার এলাকাগুলোয় মাইকিং করে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনুরোধ করা হয়। এ সময় জেলা পুলিশ বিদেশফেরত প্রত্যেক ব্যক্তির বাড়ি চিহ্নিত করে সেগুলোর সামনে লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাদের ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার অনুরোধ ও সেটি নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হলে ওইসব এলাকা থেকে আগত ব্যক্তিদেরও একইভাবে হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়। এ পর্যন্ত লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ২ হাজার ৪২৬ জনের হোম কোয়ারেন্টিন রাখা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সরকারের নির্দেশে মার্কেট ও দোকানপাট খোলার নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে পুলিশ। কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই জেলার প্রবেশ ও বাহির পথে এবং বিভিন্ন উপজেলায় মোট চারটি চেকপোস্ট বসিয়ে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চেকপোস্টগুলোয় আগত গাড়িগুলোকে জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে জেলায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জনসচেতনতার জন্য মাস্ক বিতরণ, লিফলেট বিতরণ, ব্যানার, ফেস্টুন স্থাপন, পুলিশ প্যাট্রল গাড়ির মাধ্যমে মাইকিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনটি থানার প্রতিটিতে ও পুলিশ লাইন্সে ১০ সদস্যের কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম বিভিন্ন স্থানে করোনায় মৃত্যুবরণকারী মানুষের দাফন ও সৎকার থেকে শুরু করে বাড়ি লকডাউনে কাজ করে যাচ্ছে। করোনায় হতদরিদ্র ও অসহায় প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারকে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এখনো চলছে এই কার্যক্রম। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক, পরিবহন শ্রমিক, চা-দোকানিসহ প্রান্তিক মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ সুপারসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর প্যাকেট পৌঁছে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বেদে পরিবার, সুইপার ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের ৫০ সদস্যকে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন পুলিশ সুপার নিজে। এ দুঃসময়ে পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) মেহেরপুরও দুস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটি প্রায় ৩০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায়ও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। জেলার সব পুলিশ স্থাপনার সামনে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন স্থাপন করে হ্যান্ডওয়াশ ও সাবান রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া জীবাণুনাশক স্প্রের মাধ্যমে সব স্থাপনা জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ লাইনসে ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের মাঝে দফায় দফায় মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপিই, আই প্রটেক্টর, ফেস শিল্ড, সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, সিকোন ট্যাবলেট, জিংক ট্যাবলেট ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আর্সেনিক অ্যালবাম-৩০ শক্তি ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ক্যাম্ফর-১এমসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার এসএম মুরাদ আলি আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের নির্দেশে পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন এমপি মৌখিক ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে মেহেরপুর জেলাকে করোনামুক্ত রাখতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। করোনার বিস্তার রোধে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারাও গেছেন। এর পরও পুলিশ সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা আছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে মেহেরপুর জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ দুর্যোগে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইতোমধ্যে মেহেরপুর জেলা পুলিশের দুজন পুলিশ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং পুলিশপ্রধান যে মানবিক পুলিশের স্বপ্ন দেখছেন, তা বাস্তবায়নে মেহেরপুর জেলা পুলিশ অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করছে। সেই সঙ্গে যতদিন করোনার এই প্রাদুর্ভাব থাকবে, মানুষের জন্য জেলা পুলিশের প্রত্যেক সদস্য সেবাদানকার্য অব্যাহত রাখবেন।