বিজেএমসি খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ অন্ধকার

এম.এম. মাসুক
৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২০ ০০:৩৬

খেলোয়াড় তৈরির কারখানা ছিল বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন অর্থাৎ বিজেএমসি। দেশের ক্রীড়াঙ্গণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ ক্রীড়া দলটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গত ১ জুলাই থেকে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন সাড়ে তিনশর বেশি খেলোয়াড়। চাকরি হারিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছেন এসব ক্রীড়াবিদ। বিজেএমসি থেকেই উত্থান হয়েছিল সাবেক ফুটলার আব্দুস সালাম মুর্শেদীর। বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। বিজেএমসির সাবেক এই খেলোয়াড় বলেন, ‘এ টিমে আমি ১৯৭৯ সালে অংশগ্রহণ করে শেষ বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল টিমটি। পরবর্তীতে আমি যখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) দায়িত্ব পাই, তখন কোনো নিয়মনীতি না মেনে এ টিমটাকে পেশাদার লিগে দেই। পেশাদার লিগে বেশ কবছর তারা সফলতার সঙ্গে অংশগ্রহণও করে। ক্রীড়াঙ্গনে শুধু ফুটবল নয়, টোটাল স্পোর্টসে তাদের বড় অবদান। দেশের জন্য জাতীয় খেলোয়াড় যেমনÑ অ্যাথলেটিকস, সুইমিং ও অন্যান্য সব কিছুই তাদের আছে ফুটবলসহ। ওই বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়াটা আমি মনে করি, খেলোয়াড় তৈরির একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। সব মিলিয়ে আমি আশা করেছিলাম যে টিমটি ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি টিম করবে। যেখানে অসংখ্য খেলোয়াড়, তারকা খেলোয়াড়Ñ অ্যাথলেটিকস, জিমন্যাস্টিকস থেকে শুরু করে ফুটবল, জাতীয় দলে তারা অংশগ্রহণ করেছে। আমি মনে করি, এই টিমটিকে কীভাবে রাখা যায়Ñ সে ব্যাপারে অবশ্যই নজর দেবে। একজন সাবেক বিজেএমসির খেলোয়াড় হিসেবে আমি মনে করি যে এ টিমটিকে খেলার স্বার্থে সচল রাখা উচিত, জীবিত রাখা উচিত।’

বিজেএমসি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় খেলোয়াড়দের কোনো ভবিষ্যৎই দেখছেন না সাবেক অ্যাথলেট মিলজার হোসেন। মানসম্পন্ন কিছু খেলোয়াড় অন্য দলে জায়গা করে নিলেও বেশির ভাগ ক্রীড়াবিদের হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মিলজার হোসেন বলেন, ‘বিজেএমসি আসলে এমন একটা টিম ছিল যে বাংলাদেশের একটা খেলোয়াড় তৈরি করার জায়গা। এক সময় অনেক খেলাই ছিল। অ্যাথলেটিকস, ভলিবল, হ্যান্ডবল, সাইক্লিং, কাবাডি, ফুটবল আদমজী নামে ফুটবল দলও ছিল। অনেক সুনাম ছিল বিজেএমসির। আমি মনে করি, বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খেলোয়াড়রা অনিশ্চিত একটা জীবনে পড়ে গেল। তাদের সামনে কষ্ট আছে। অনেক খেলোয়াড়ই হারিয়ে যেতে পারে। আমি মনে করি, বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় একটি ধাক্কা।’

১৯৯৮ সালে বিজেএমসিতে যোগ দিয়েছিলেন নাজমুন নাহার বিউটি। ১৮ বছর দলটির হয়ে খেলেছেন। ২০১৬ সালে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। বাংলাদেশের সাবেক দ্রুততম মানবী বিউটি বলেন, ‘ক্রীড়াঙ্গনের খেলাধুলা বলতেই বিজেএমসি। সবাই এক নামে চেনে। পাটকলে শুধু যে চট তৈরি হতো কারখানায় তা না, প্লেয়ারও তৈরি হতো। খেলোয়াড়দেরও কারখানাও বটে। সরকার এখন কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেÑ কিছু করার নাই। আমাদের অনেক প্লেয়ার বেকার হয়ে যাবে, কষ্ট হবে ওদের চলতে। আমাদের যারা খেলাধুলা করে ওরা তো সবাই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের। সচ্ছল পরিচবারের আসলে কেউ আসে না। খেলাধুলা আসলে অনেক কষ্টের।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিজেএমসি ছিল বিধায় আমি আজ বিউটি হতে পেরেছি। আমাদের যে প্লেয়াররা চলে গেছে তাদের জীবনে কষ্ট আসছে। এটা আমি মনে করি। সরকার যদি মনে করে যে প্লেয়ারগুলো আছে ওদের ডিফেন্সে নিয়ে নিই, তা হলে তো ভালো। না হলে ওদের কষ্ট হয়ে যাবে। বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো টিম আর নেই। বিজেএমসি এক সময় আর্মির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। এখন আর টিম নেই। এখন প্লেয়ার যারা আছে খালি মাঠে গোল দেবে।’

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন খেলেছেন বিজেএমসির হয়ে। বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুবই হতাশ হয়েছেন সাবিনা। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ। কারণ অনেক খেলোয়াড় তারা নিজের পরিবারকে সাপোর্ট করত। যে অর্থ পেত সেটি দিয়েই পরিবার চলে। এটা খুবই দুঃখজনক আমাদের জন্য। আমিও একটা আর্থিক সাপোর্ট এখান থেকে পেতাম। ছয়-সাত বছর আমি পেয়ে আসছি। আমার জন্য বিজেএমসি একটি সাপোর্ট হিসেবে ছিল।’ সাবিনা আরও বলেন, ‘আমি চাই যে খেলোয়াড়দের চাকরি চলে গেছে, তাদের চাকরি যেন নতুন করে দেওয়া হয়। এটাই এখন আমার চাওয়া।’ বিজেএমসির হয়ে খেলেছেন নারী ফুটবলার সৌরভি আক্তার ইতি। তিনি বলেন, ‘বিজেএমসিতে তো আমাদের চাকরি নেই। আগে টাকা আসত, এখন আর আসে না তিন-চার মাস ধরে। অবশ্যই খারাপ লাগছে। এটা আমার জন্য আয়ের একটা জায়গা ছিল। সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা পেতাম। পরিবার চালাতাম, নিজে চলতাম। এখন অনেক কষ্ট করে চলছি। লিগে খেলে কিছুই টাকা পেয়েছিলাম, সেটি দিয়ে এখন চলছি।’ বিজেএমসির হয়ে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪০০ মিটারে অংশ নেওয়া দৌড়বিদ নাসরিন আক্তার বলেন, ‘একসঙ্গে আমরা সবাই খেলতাম বিজেএমসির হয়ে। বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুবই খারাপ লাগছে। সবাই আর আগের মতো একসঙ্গে হতো পারব না। আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। আমি মনে করি, যে আমাদের চাকরি যদি আবারও দেওয়া হতো আমরা খেলাধুলা করে সুনাম উজ্জ্বল করতে পারতাম।’ বিজেএমসি বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে দলটির অ্যাথলেট তাহিয়া আক্তার পিয়া বলেন, ‘এখানে আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছিল। এখন আমরা কোথায় যাব বলেন? কে আমাদের নেবে? অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।’