‘উহান স্পিরিট’ কি ব্যর্থ হতে চলেছে

তারেক শামসুর রেহমান
৭ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ জুলাই ২০২০ ০৯:১৯

চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘উহান স্পিরিট’কে অন্যতম অগ্রগতি হিসেবে ধরা হয়। ২০১৮ সালের ২৭-২৮ এপ্রিল মধ্য চীনের হুবাই প্রদেশের রাজধানী উহানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে তখন বলা হয়েছিল দুই শীর্ষ নেতার অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শুধু এ অঞ্চলেরই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির উন্নয়ন ও বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখবে।

ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়েছিল, দুদেশের মধ্যে এই সম্পর্ক একটি শক্তিশালী ‘এশিয়ান সেঞ্চুরি’ গঠনে বড় অবদান রাখবে। এই অঞ্চলের শান্তি স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন এই দুই নেতা (ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নোট ২৮ এপ্রিল, ২০১৮)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই দুই নেতার অনানুষ্ঠানিক বৈঠককে উহান স্পিরিট হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এর রেশ ধরে পরবর্তী অনানুষ্ঠানিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রাচীন শহর সমুদ্রঘেঁষা মামাল্লাপুরমে ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর।

পরপর দুটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর তৃতীয় আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা চলতি বছরের শেষের দিকে। কিন্তু গত ১৫ জুন হিমালয় অঞ্চলের গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারত সংঘর্ষ ও তাতে ২০ জন ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুর পর সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হচ্ছে উহান স্পিরিট কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে চলেছে?

চীন ও ভারত উভয় দেশই গালওয়ান উপত্যকা নিজেদের বলে দাবি করে। এটি ভারতের লাদাখ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই অঞ্চলটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে। এক সময় লাদাখ ছিল ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ভারত সরকার এই অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১৯ সালের সব ধরনের আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আলাদা করে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে (৩১ অক্টোবর ২০১৯)। লাদাখের পূর্বে রয়েছে চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বত, দক্ষিণে রয়েছে ভারতের হিমাচল রাজ্য, পশ্চিমে রয়েছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গিলগিট-বাল্টিকস্তান, আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে চীনের ঝিনঝিয়াং প্রদেশ। সিয়াচিন হিমবাহ ও চীনের আকসাই চীন এ অঞ্চলের মাঝেই অবস্থিত। এই লাদাখেই অবস্থিত কারগিল, আর কারগিলে (১৯৯৯) ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের কথা অনেকেই স্মরণ করতে পারেন। লাদাখের গুরুত্ব এ কারণে যে, তিব্বত চীনের অধিভুক্ত হওয়ার (১৯৫০-৫১) পর সাম্প্রতিককালে সেখানে চীনবিরোধী অসন্তোষ বাড়ছে। ১৯৫৯ সালে তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামা ভারতে আশ্রয় নেন এবং এখনো সেখানে আছেন। ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধরমশালায় একটি তিব্বতি নির্বাসিত সরকারের অস্তিত্বের খবরও আমরা জানি, যার প্রধান দালাই লামা স্বয়ং। ২০১৫ সালে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যেখানে তিব্বতি নেতাদের সঙ্গে চীনের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। আর গত মে মাসে কংগ্রেসম্যান স্কটপেরী মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল (৬৯৪৮) উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিব্বতকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই লাদাখের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব বাড়ছে। তিব্বতের পাশাপাশি ঝিনঝিয়াংয়ের অধিবাসী উইঘুর মুসলমানদের নিয়ে চীনের একটি ‘সমস্যা’ রয়েছে। উইঘুরে চীন মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এ ধরনের অভিযোগ তুলে মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইনও পাস হয়েছে। Uyghur Human Rights Policy Act of 2020, Uyghur Human Rights Policy Act of 2019, S, 3744। উইঘুরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও এই আন্দোলনের পেছনে বাইরের শক্তির মদদের ব্যাপারে চীন অবগত। ফলে এই অঞ্চলে কোনো শক্তি চীনবিরোধী কোনো কর্মকান্ডে যাতে জড়িত হতে না পারে, চীন সে ব্যাপারে সতর্ক। সিয়াচিন হিমবাহ নিয়ে (১০০০ বর্গমাইল) ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষের খবর (১৯৮৪) আমরা জানি। চীনের কাছেও এই হিমবাহের গুরুত্ব আছে। আকসাই চীনের একটি অংশ, এক সময় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা পাকিস্তান চীনকে হস্তান্তর করে। আর ভারতের হিমাচল রাজ্যটি যে চীনের এ দাবি থেকে চীন এখনো সরে আসেনি। গালওয়ান উপত্যকায় (১৪৭০০ বর্গমাইল) ভারতীয় কর্মকাণ্ডকে চীন তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলে মনে করছে। গালওয়ান উপত্যকার সীমানা চিহ্নিতকরণ সংক্রান্ত লাইন অব কন্ট্রোলের পাশাপাশি ভারত ২৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণ শেষ করেছে। এই সড়কটি লাদাখের রাজধানী লেহর সঙ্গে চীনা সীমান্তের কাছাকাছি দৌলতবেগ আলভি সামরিক বিমান ঘাঁটিতে সংযুক্ত করেছে। এটি একটি দুর্গম এলাকা। আগে লেহ থেকে দৌলতবেগ আলভি সামরিক বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছতে দুদিন লাগত। এখন লাগে মাত্র ৬ ঘণ্টা। ভারতীয় সমরনায়কদের কাছে দৌলতবেগ আলভি বিমান ঘাঁটির গুরুত্ব অনেক বেশি। এখান থেকে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীন যা ভারত নিজের বলে দাবি করে, এর সীমান্ত মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর সিচিয়ান গোসিয়ারের দূরত্ব মাত্র ৮ কিলোমিটার। এই বিমান ঘাঁটিতে ভারত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। চীন কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো যুদ্ধে এই বিমান ঘাঁটি একটি বড় ভূমিকা পালন করবে।

উহান ও মামাল্লাপুরমে চীন ও ভারত পরস্পরের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস আর উন্নয়নের কথা বলেছিল, কিন্তু গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের সঙ্গে তা মেলানো যায় না। দুপক্ষই সেখানে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলার চেষ্টা করেছেন, ভারত ও চীন যদি একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা হলে বিশ্বকে তারা বদলে দিতে পারবে। এজন্যই এক সময় একটি ধারণা প্রমোট করা হয়েছিল চীন ও ভারত মিলিয়েই।

পাঠক, চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের ১৯৫৪ সালে ভারত সফরের কথা স্মরণ করতে পারেন। ভারত ও চীন তখন ‘পঞ্চশীলা’ নীতি স্বাক্ষর করেছিল। এই পঞ্চশীলা নীতিকে কেন্দ্র করে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বাংদুংয়ে আফ্রো-এশিয়ার দেশগুলোর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর ধারণা এভাবেই বিকশিত হয়। ভারতের রাজনীতিবিদ (কংগ্রেস) ও সাবেক পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রামেশও ধারণা প্রমোট করেছেন (ইকোনমিক টাইমস, ২৭ মার্চ ২০১৪)। সমসাময়িককালের একজন বহুল আলোচিত জিও স্ট্র্যাটেজিস্ট রবার্ট ডি কাপলানও তার লেখনীতে বিখ্যাত গ্রন্থ সম্ভাব্য চীন-ভারত আঁতাতের কথা উল্লেখ করেছিলেন। চীন ও ভারত যদি এক মঞ্চে কাজ করতে পারে তা হলে বদলে দিতে পারে বিশ্বকে। ভারত ও চীনের মোট এলাকার পরিমাণ ১২৯২৮০৬১ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ (২৭১ কোটি) এই দুই দেশে বসবাস করে। দুটো দেশের মোট জিডিপির পরিমাণ (পিপিপি) ৩৫.৬২৪ ট্রিলিয়ন ডলার (সাধারণ নিয়মে ১৬১৫ ট্রিলিয়ন ডলার)। অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ২০১৬ সালে বিশে^ চীনের অবস্থান ছিল এক নম্বরে (সাধারণ হিসাবে ২ নম্বরে)। ২০৫০ সালে জিডিপির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে তাতেও চীন থাকবে এক নম্বরে (পিপিপি)। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থ’ান ছিল ২ নম্বরে (পিপিপি, ২০১৫), তা নেমে আসবে (২০৫০) ৩ নম্বরে। আর ভারত অবস্থান করবে ২ নম্বরে। ফলে চীন ও ভারত যদি একত্রিত হয়, তা হলে বদলে দেবে বিশ্বকে। চীনকে এখন বলা হয় ‘উৎপাদনের কারখানা’- অর্থাৎ সব পণ্যই চীন উৎপাদন করে ও সস্তায় তা বিশে^র সর্বত্র পৌঁছে দেয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও চীনের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর মাধ্যমে চীন ৬১টি দেশকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে সার্ভিস সেক্টর ও ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ভারত বিশ্বে একটা অবস্থান তৈরি করেছে। দেশ দুটো বিশ^ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ব্রিক্সব্যাংক (২০১৪) প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশ দুটো সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সদস্য (২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত)। ফলে নয়া বিশ^ ব্যবস্থ’া বিকাশে এই দেশ দুটি একত্রিত হয়ে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে তা বলাই বাহুল্য। তবে গালওয়ানের ঘটনাবলি দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের অনাস্থা সৃষ্টি করল কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। ১৫ জুনের ঘটনাবলির পর বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের খবর আমরা পাইনি। নীতিগতভাবে দুদেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনী আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সম্মত হলেও তা কার্যকর হয়নি। গত ৩ জুলাই গোপনে মোদি গালওয়ান উপত্যকা সফর করেছেন। তিনি সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে যে বক্তব্য রাখেন, তাতে পরোক্ষভাবে তিনি চীনকে ‘সম্প্রসারণবাদী’ শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাশিয়া থেকে ৩৩টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার কথাও বলা হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার ২০১৮ সালের ‘উহান স্পিরিট’ ব্যর্থ হতে চলেছে! এই ‘ব্যর্থতা’ দুটো দেশের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না।

 

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক