খাদ্য সংমিশ্রণ বিষয়ে কিছু কথা

ফারিয়া ইসলাম বৃষ্টি
৭ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২০ ২২:১৬

প্রতিদিনই আমরা খাবার গ্রহণ করছি, কিন্তু একবারও কি ভেবেছি সম্পূর্ণ পুষ্টি পাচ্ছে কিনা দেহ? অনেক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার খেয়েও পুষ্টি ঘাটতি হচ্ছে? আসুন জেনে নিই এর কারণÑ

আমাদের সুস্থ থাকতে খাদ্যের প্রয়োজন। খাবারের পুষ্টিগুণ আমাদের দেহের বিভিন্ন কাজ করতে সহায়তা করে থাকে। দেহে শক্তি সঞ্চার করা, পেশি গঠন এবং বৃদ্ধি সাধন থেকে শুরু করে রোগব্যাধি দূরে রাখতে সাহায্য করে। প্রত্যেকটি পুষ্টি উপাদানের আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের দেহে শোষিত হয়ে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে। এই উপাদানগুলো আবার একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। কিছু পুষ্টি উপাদান শোষণের জন্য প্রয়োজন পড়ে অন্য কোনো পুষ্টি উপাদানের। আবার কোন কোন খাবার একসঙ্গে খেলে কোন কোন পুষ্টি উপাদানের শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। আজ এমনই কিছু খাবার বা পুষ্টি উপাদান নিয়ে জানানোর চেষ্টা করব।

আয়রন ও ভিটামিন সি : আয়রন মানবদেহে গুরুত্ব অনেক বেশি। আয়রন মূলত রক্তকণিকার জন্য খুবই জরুরি। তা ছাড়া গর্ভবতী এবং ল্যাক্টেশন ও ঋতু¯্রাবের সময় আয়রনের চাহিদা একটু বাড়তি থাকে। যে যে খাবারে আয়রন বেশি থাকে, সে খাবারগুলো হলো কলিজা, কাঁচা কলা, ডিমের কুসুম, কচুশাক ইত্যাদি।

সাধারণত উদ্ভিজ খাবার থেকে যে আয়রন পাই বা নন-হিম আয়রনের শোষণের জন্য দরকার পড়ে ভিটামিন সি-এর। এই ভিটামিন সি আয়রনকে ভাঙতে সাহায্য করে, ফলে খুব সহজেই দেহে শোষণ হয়। মূলত উদ্ভিজ আয়রন সোর্সের সঙ্গে একই সময়ে ভিটামিন সি গ্রহণে আয়রনের পূর্ণ শোষণ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কচুশাকের সঙ্গে এক টুকরো লেবু খেতে পারেন।

ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম : হাড়ের প্রতিরক্ষায় এবং সুস্থতায় ক্যালসিয়ামের গুরুত্ব আমাদের কমবেশি সবার জানা। দেহে ক্যালসিয়ামের অভাব হলে হাড় ও দাঁতের ক্ষতি উল্লেখযোগ্য। হাড়ের রোগ যেমন অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওমেলাসিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই ক্যালসিয়ামের সর্বোচ্চ শোষণের জন্য স্মার্ট পেয়ার হলো ভিটামিন ডি। কারণ ভিটামিন ডির অ্যাক্টিভ ফর্ম ক্যালসিয়ামের শোষণ বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু ভিটামিন ডি খুব কম খাবারে পাওয়া যায়। যেমনÑ সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম ইত্যাদি। তবে সূর্যের আলো থেকে দেহ ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। তাই ডিম ভাজির সঙ্গে এক টুকরো পনির খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

ফ্যাট ও ভিটামিন এ, ডি, ই, কে : ভিটামিন এ, ডি, ই, কে হলো ফ্যাটে দ্রবীভূত ভিটামিন। অর্থাৎ এই ভিটামিনগুলো চর্বি ছাড়া দ্রবীভূত হয় না। তাই শাকসবজি তেল দিয়ে রান্না করা হয়। এই ভিটামিনগুলোর জন্য অল্প পরিমাণ তেলই যথেষ্ট। যারা সিদ্ধ শাকসবজি গ্রহণ করেন তারাও অল্প একটু তেল ব্যবহার করলে এই ভিটামিনগুলো খুব সহজেই পেয়ে যাবেন। লক্ষ করলে দেখবেন, স্কিম মিল্কগুলোতেও ৫ শতাংশ হারে ফ্যাট থেকে থাকে, কারণ দুধে যে ফ্যাট সলিউবল ভিটামিনগুলো থাকে তা যেন শোষণ হতে পারে।

ক্যারটিনইডস ও হেলাথিফ্যাট : ক্যারটিনইডস হলো এমন একটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা বিভিন্ন রকম রঙিন শাকসবজিতে পাওয়া যায়। এই ক্যারটিনইডস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্যানসার ও হৃদরোগের মতো রোগের সঙ্গে লড়তে সহায়তা করে থাকে। তাই রঙিন শাকসবজি রান্নার সময় অলিভ তেল, স্বাস্থ্যকর তেল, পনির ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। তা ছাড়া সালাদের সঙ্গে অ্যাভোকাডো হতে পারে আদর্শ বন্ধন। সালাদের সঙ্গে খেতে পারেন একটি ডিম।

বাদামি চালের সঙ্গে পেঁয়াজ আর রসুন : অনেকগুলো রিসার্চে দেখা গিয়েছে যে, বাদামি চাল বা ব্রাউন রাইসের সঙ্গে পেঁয়াজ ও রসুন যোগ করার ফলে চালে থাকা আইরন ও জিংক খুব ভালোভাবে শোষণ হয়। জিংক আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ, হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং আমাদের স্বাদ ও গন্ধের জন্য দরকারি।

প্রোটিন ও পটাশিয়াম : খেয়াল করে দেখবেন অনেক ডায়াটেশিয়ান দইয়ের সঙ্গে কলা খেতে বলে থাকেন। এর কারণ কলায় রয়েছে উচ্চ পটাশিয়াম, যা দই থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনের সাহায্যে খুব ভালোমতো শোষণ হয় এবং সেই সঙ্গে দইয়ের অ্যামাইনো অ্যাসিড শোষণে পটাশিয়াম সাহায্য করে।

টমেটো ও স্বাস্থ্যকর তেল : টমেটোর লাল রঙে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে লাইকোপেন, যা ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। এই টমেটো একটু অলিভ তেল দিয়ে রান্না করলে অথবা সালাদে অল্প একটু তেল ব্যবহার করলে দেহে এই লাইকোপেনের শোষণ বেড়ে যায়।

টমেটো ও ব্রোকলি : উভয়ই টিউমার কোষের বৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করার জন্য বেশ ভালো। টমেটোয় পাওয়া লাইকোপিন ও ব্রোকলির সালফোরাফেন হলো শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা বিশেষত প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য জরুরি।

গ্রিন টি ও লেবু : গ্রিন চা-তে লেবু মিশিয়ে খাওয়ার কথা অনেক ডায়াটেশিয়ানই বলে থাকেন। কিন্তু এর কারণ হলো লেবুর অ্যাসিড, সবুজ চা-এ থাকা কেটেচিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্টকে প্রায় ৮০ শতাংশ ধরে রাখতে সহায়তা করে। তা ছাড়া অনেকেই সবুজ চা স্বাদের কারণে পান করতে চান না। তাই এক টুকরো লেবু চায়ের স্বাদও অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।

আনারস ও পুদিনা জুস : সুস্বাদু ও সতেজতার পাশাপাশি এই কম্বো আপনার শরীর পরিষ্কার এবং হজম প্রক্রিয়ার বৃদ্ধির জন্য দুর্দান্ত কাজ করে। আনারসে রোমেলিন পাওয়া যায়, যা যকৃতকে ডিটক্সে সহায়তা করে এবং পুদিনা হজম প্রক্রিয়ার জন্য অনেক সহায়ক।

এবার আসুন জানি কোন পুষ্টি উপাদানগুলো একসঙ্গে না খাওয়াই ভালো।

শাকসবজিতে ফাইটিক অ্যাসিড ও অক্সালেট থাকে, যা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামকে বাধা প্রদান করে। তাই প্রোটিন শেক হিসেবে দুধ ব্যবহার করা উত্তম, কিন্তু শাকসবজি খাওয়ার পর পরই দুধ না খাওয়াই ভালো।

আমরা চা-কফি পান করতে খুব পছন্দ করি। কিন্তু কফিতে থাকা ক্যাফেইন অনেকগুলো পুষ্টি উপাদান শোষণে বাধা দেয়। তাই কফি নাশতার সঙ্গে খাওয়া ভালো।

কপার ও জিংক একে অন্যের শোষণে বাধা দেয়। খাবারে যদি বেশি পরিমাণ জিংক থাকে, তবে দেহে কপারের ঘাটতি দেখা যেতে পারে। জিংক মূলত ডিএনএ সংশ্লেষণে সহায়তা কওে এবং শিশুদের বৃদ্ধিতে ও ডায়রিয়ায় উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্যদিকে মানবদেহে কপারের গুরুত্ব অনেক। রক্তকণিকা গঠনে এবং হাড়, রক্তনালিকা ও নার্ভস সিস্টেমকে সুস্থ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

আমরা প্রতিনিয়ত খাবার থেকে পুষ্টি পেয়ে থাকি, কিন্তু অনেক সময় সঠিক নিয়ম না জানার দরুন সেই পুষ্টি আমাদের দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণে শোষণ হয় না, ফলে দেখা দেয় পুষ্টি ঘাটতি। কিন্তু সঠিক নিয়মে পুষ্টির এই যুগলবন্দি মেনে খাওয়া-দাওয়া করলে পুষ্টির সর্বোচ্চ শোষণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

ফারিয়া ইসলাম বৃষ্টি : পুষ্টিবিদ