করোনার পরীক্ষা কমছে দুর্ভোগ বাড়ছে

দুলাল হোসেন
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০২:০৯

দেশে করোনা শনাক্তে নতুন নতুন আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা; কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। কমে যাচ্ছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা। জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই মাসের প্রথম দুই দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি নুমনা পরীক্ষা হলেও গত কয়েক দিন সেটি কমে ১৩ থেকে ১৪ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে করোনা পরীক্ষা করতে আসা মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। ঢাকার পাশাপাশি বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষ এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তারা যথাসময়ে পরীক্ষা করতে না পারায় নানা ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আরটি-পিসিআর মেশিন দিয়ে দিনে ৩০০ নমুনা পরীক্ষা করা যায়। করোনার রোগী শনাক্ত করতে ৭৪টি পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। এসব ল্যাবের কোনোটিতে একের অধিক পিসিআর মেশিন রয়েছে।

জানা গেছে, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। সে সময় দেশে ল্যাবরেটরি ছিল মাত্র একটিÑ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। রোগী বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসের শেষ দিকে ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়ানো শুরু করে সরকার। বর্তমানে ৭৪টি ল্যাবে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা

হচ্ছে। এর মধ্যে ৪০টি রাজধানীতে আর ৩৪টি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে। এসব ল্যাবরেটরির কোনোটিতে দিনে ৩০০ থেকে তিন হাজার পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। সেই হিসাবে ল্যাবগুলোয় প্রতিদিন ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষা সম্ভব; কিন্তু নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে অনেক কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মার্চের শুরুতে একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল আইইডিসিআর। তখন ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল ১০ থেকে ১২টি। ৩১ মার্চ পর্যন্ত পিসিআর ল্যাবরেটরি বেড়ে দাঁড়ায় ৬টিতে এবং ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় দেড়শ। এপ্রিল মাসের শুরুতে দুইশ থেকে আড়াইশ নমুনা পরীক্ষা হলেও মাসের শেষদিকে পিসিআর ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮টিতে। তখন ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজারের কাছাকাছি। এর পর গত ১ মে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১টি এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল সাড়ে ৫ হাজারের নমুনা। একই মাসের ৩১ তারিখে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার নমুনা। এর পর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নমুনা পরীক্ষা বেড়ে প্রায় ১৪ হাজারে পৌঁছে। জুন মাসের শেষ দিকে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৮টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হতো ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেও ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এরই মধ্যে ল্যাবরেটরির সংখ্যা বেড়ে ৭৪টি হলেও হঠাৎ করেই নমুনা পরীক্ষা আগে থেকে অনেক কমে গেছে। পাঁচ দিন ধরে ল্যাবগুলোয় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর হোসেন বলেন, নমুনা সংগ্রহ কম হওয়ায় পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। প্রথম পরীক্ষায় যাদের করোনা পজিটিভ হয়েছিল তাদের দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা করে নেগেটিভ হয়েছে কিনা দেখা হতো। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করাকালে একজন পজিটিভ হলে সেই পরিবারের অনেকে নমুনা দিত, এখন প্রতিজনের নমুনা পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা লাগে বিধায় অনেকে অপ্রয়োজনে নমুনা দিচ্ছেন না। এ ছাড়া দেশের কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দেওয়ায় সেখানে নমুনা সংগ্রহ করা কম হচ্ছে। এসব কারণে নমুনা সংগ্রহ কমছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলেছেন, ২৪ ঘণ্টায় করোনা পরীক্ষায় আরও নতুন একটি ল্যাব যুক্ত হওয়ায় দেশের ল্যাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৪টি। এসব ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩ হাজার ১৭৩টি। এর আগের দিন ল্যাবের সংখ্যা ছিল ৭৩টি এবং ল্যাবগুলোয় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৫টি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১০ দিনের হিসাবমতে, গত ২৮ জুন দেশে পিসিআর ল্যাব ছিল ৬৮টি। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৯টি এবং রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮০৯ জন। ২৯ জুন একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ হাজার ৮৩৭টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৪ হাজার ১৪ জন। ৩০ জুন একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৪২৬টি এবং রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬৮২ জন। এর পর গত ১ জুলাই ল্যাবের সংখ্যা ছিল ৬৯টি। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ হাজার ৮৭৫টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ৭৭৫ জন। ২ জুলাই দেশে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০টিতে, নমুনা পরীক্ষা হয় ১৮ হাজার ৩৬২টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৪ হাজার ১৯ জন। ৩ জুলাই দেশে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১টিতে। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৫০ এবং রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ১১৪ জন। ৪ জুলাই একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ৭২৭টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ২৮৮ জন। ৫ জুলাই দেশে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩টিতে। এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৮৮টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ২ হাজার ৭৩৮ জন। ৬ জুলাই একই সংখ্যক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৫টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ২০১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪টিতে। ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয় ১৩ হাজার ১৭৩টি এবং রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ২৭ জন। গত ৫ দিনে করোনা রোগী শনাক্তকরণ পরীক্ষা কম হচ্ছে।

আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশের অনেক ল্যাবে একটি করে মেশিন রয়েছে। একটি মেশিনে এক শিফটে ৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। দুই বা তিন শিফট পর্যন্ত কাজ করা গেলে প্রায় ৩০০ নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। যেসব ল্যাবে একাধিক মেশিন সেখানে পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হবে। সেই হিসাবে ৭৪টি ল্যাবে একটি মেশিন তিন শিফট কাজ করলে দিনে ২২ হাজারের বেশি পরীক্ষা করা যাবে।

২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৩০২৭ জন, মৃত্যু ৫৫

দেশে ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন হাজার ২৭ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৫ জনে। ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মারা গেছেন ৫৫ জন। মৃতের সংখ্যা দুই হাজার ১৫১। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৯৫৩ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৭৮ হাজার ১০২ জন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

ডা নাসিমা জানান, দেশে করোনা পরীক্ষা ল্যাবরেটরির সংখ্যা ৭৪টি। এসব ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৯১টি এবং পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩ হাজার ১৭৩টি। দেশে এখন পর্যন্ত ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৪৬ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৫৫ জন।