এন্ড্রু কিশোর : দৃশ্যমান জগতের বাইরে

শহীদুল্লাহ ফরায়জী
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০২:৩৫

বাংলা গানের কিংবদন্তি এন্ড্রু কিশোর দৃশ্যমান জগতের সৌন্দর্য অতিক্রম করে উড়াল দিয়েছেন মহাশূন্যতায়। তিনি সুরের তরী তীরে ভিড়িয়েছেন। বাঙালির আত্মার আত্মীয় হয়েও গভীর সম্পর্কের সমাপ্তি করেছেন। সংগীতের পরম পথিক আমাদের সংগীত আকাশে আর পরিভ্রমণ করবেন না।

যিনি সারা দেহ সারা মন সারা হৃদয় সারা সত্তা দিয়ে গানে সাড়া দিতেন এখন তিনি পরম পরিতৃপ্তি নিয়ে সবকিছুকে পরিত্যাগ করেছেন। এখন তার হৃদয়মন গানের জন্য আর ক্ষুধার্ত হবে না। আমরা আর কোনোদিন দেখতে পারব না তার ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ কোমল মাধুর্যমাখা মুখখানি।

আমাদের জীবন জমিনে তিনি যে দাগ কেটে গেছেন, আমাদের অন্তরের অন্তরে সংগীতের মাধুর্য যেভাবে বিতরণ করে গেছেন, আমাদের জীবন পেয়ালায় যেভাবে কণ্ঠ সুরের ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছেন তা আমাদের হৃদয়ে চিরজাগরূক থাকবে।

দয়াল ডাক দিয়েছেন তারে। তিনি পরলোকে অপার আশ্চর্য চোখে বিস্ময়কর সৌন্দর্য দেখবেন, জীবন-মৃত্যুর বাইরে অমৃত আস্বাদ লাভ করবেন, হয়তো সিম্ফোনিতে ঐশ্বরিক সংগীত পরিবেশন করবেন। তার আত্মার পুনরুজ্জীবন হবে অভাবনীয় ভালোবাসায়।

আমাদের হৃদয়ের অনুভূতিতে আনন্দ সঞ্চারের জোগানদার ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। জীবনকে বাংলা গানের জন্য উৎসর্গ করেছেন। গানের মাঝেই খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন জীবনের পূর্ণতার সমুজ্জ্বল রাজপথ।

আজ তিনি মৃত্যুর ক্যানভাসে। বাঙালির ভালোবাসায় দীর্ঘশ্বাসে জীবন সৌন্দর্যের বিরল রঙের ছবি এঁকে দিয়েছেন অগণন গানের মাঝে। তিনি গানের মাঝে আত্মার আকুলতা হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। সুরের ও গানের স্তরে স্তরে থাকত সে ব্যাকুলতারই হাতছানি।

এন্ড্রু কিশোর গান করেছেন যা মানুষের হৃদয়ে প্রবাহিত হয়, যে গান মানুষকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে এবং যে গান মানুষের সুখ-দুঃখকে ভাগাভাগি করে নেয়। তার গান আমাদের হৃদয়ের গোপনীয়তাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। তার গান আনন্দকে অনুসন্ধান করার শক্তি জুগিয়েছে।

এন্ড্রু কিশোর আশীর্বাদপ্রাপ্ত ও সৌভাগ্যবান। তিনি অগণিত মানুষের ভালোবাসার দ্বারা পরিবেষ্টিত। বাঙালি হৃদয়ের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে এন্ড্রু কিশোরকে ভালোবেসেছে আর আত্মার সততা দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। মানুষের ভালোবাসার অগ্নিশিখা তাকে দখল করে নিয়েছিল। তিনি মানুষের ভালোবাসা আস্থা-বিশ্বস্ততা রক্ষা করেছিলেন মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত।

এন্ড্রু কিশোরের অনেক গান বাঙালি মনকে জাগিয়ে তুলেছে এবং অনেক গান হৃদয়ের ভালোবাসাকে উসকে দিয়েছে, মানুষের ভেতরের গভীরতম অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছে।

তার সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি আমার চারপাশে পাখা ঝাপটাচ্ছে। বেদনার্ত মনে স্মৃতি নিয়ে বলব, না তাকে মূল্যায়ন করব কিছু বুঝতে পারছি না। মর্মবেদনাজড়িত দীর্ঘশ্বাসে শুধু মনে হচ্ছে কিশোরদা এখন বসন্তের ক্রুসে সমাহিত। কিশোরদা এখন আলোকস্তম্ভের মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

কিশোরদা আমার প্রাণের মানুষ, বন্ধুর চেয়ে অধিকতর, আর হৃদয়ের চেয়েও কাছের। যেদিন থেকে পরিচিত হয়েছি সেদিন থেকেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধা সংরক্ষিত হয়েছে। কিশোরদার সঙ্গে দেখা হলেই এক অনাকাক্সিক্ষত লজ্জায় পড়ে যেতাম। ‘ওস্তাদ’ ... এই সম্বোধনে আমাকে প্রথমেই লজ্জায় আড়ষ্ট করে দিতেন। কতবার বারণ করেছি কিন্তু আমার বারণ তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। শেষে আর প্রতিবাদ করিনি লজ্জার আশ্রয়ে হজম করে নিয়েছি।

‘জানা হলো নারে, জানলো না কেউ,

চন্দ্র-সূর্য কার,

পৃথিবীর সবাই জানলো শুধু

তুমি যে আমার, ...’

আমার লেখা এই গানটা অন্যান্য গানের মাঝে অনেক পছন্দ করতেন কিশোরদা। হঠাৎ একদিন কিশোরদার ফোন, এই গানসহ দুটি গান ভিডিও হবে মালয়েশিয়াতে। আমার লেখা এবং পল্লব স্যানালের সুরে এই গানগুলোর শুটিং করে এসে সে যে কী আনন্দসহকারে আমাকে জানালেন।

এই তো কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে অসুস্থ অবস্থায়ও তার গাওয়া আমার লেখা কয়েকটা গান দ্রুত পাঠানোর জন্য শিল্পী মমিন বিশ্বাসকে ফোন করেছেন। গানের প্রতি একজন শিল্পীর কী অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ। গান শুনে ক্যানসারের তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও আনন্দ নিতে চেয়েছেন।

রেকর্ডিং স্টুডিও ‘অডিও আর্টে’ কিশোরদা, বারী সিদ্দিকী, পল্লব স্যানাল, পান্না আজম এবং আজম বাবুসহ আমি কত আড্ডা দিয়েছি তার কোনো হিসাব নেই।

অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে আমাদের বাসায় আড্ডা। আমার লেখা বারী সিদ্দিকীর সুরে তিনি গিয়েছিলেন :

‘আমার অনেক কিছুই আছে

শুধু দুঃখের অভাব গেলো না...’

এই গানটি তার খুব পছন্দের এবং এই পছন্দের উচ্ছ্বাস তিনি আমার কাছে বহুবার প্রকাশ করেছেন। এই গানটি আবার তিনি গুনগুন করে শোনালেন। বললেন আপনার এই গান গাওয়ার পর বুঝতে পারলাম দুঃখেরও অভাব হয়, দুঃখের অভাব কোনোদিন শেষ হয় না। আমরা দুজনেই বারী সিদ্দিকীর অভাব অনুভব করলাম। এবং আমরা দুজনেই বেদনার্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন এন্ড্রু কিশোর ভারমুক্ত হয়েছেন আর আমি এখন একাই বারী সিদ্দিকী আর এন্ড্রু কিশোরÑ এই দুজনের অভাববোধ করছি।

কিশোরদা ছিলেন ভিন্নমাত্রার মানুষ। লাজুক প্রকৃতির মানুষ। মাটির দিকে চেয়ে হেঁটে বেড়ানোর মানুষ। ঔদ্ধত্য, অহঙ্কার মাটিচাপা দেওয়ার মানুষ। সর্বপ্রকার বাহুল্যবর্জিত মানুষ। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে আমরা কেউ কেউ যখন নিজেদের জাহির করার কাজে ব্যস্ত তখনো কিশোরদা জাহির করার নিম্নমানের কাজে আক্রান্ত হননি।

অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী তিনি। হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, কিছু কিছু মানুষের জীবনে, কেন লোকে এত ভালোবাসা চায়, ভেঙ্গেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যেখানেসহ অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন তিনি। কাজ করেছেন প্রবাদপ্রতিম সুরকার-গীতিকারদের সঙ্গে।

সংগীত তার জীবনের সব সত্তাকে গ্রাস করেছিল। সংগীতের মাঝে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। সংগীতের জন্যই তিনি সব সময় তৃষ্ণার্থ থেকেছেন। তিনি সব সময় সংগীতের উচ্চতায় বিচরণ করতে চেয়েছেন। তিনি জনপ্রিয়তায় কখনো আত্মহারা হননি।

ভলতেয়ারের মতো দার্শনিকও মনে করতেন যারা গৌরব অর্জন করে তারাই গৌরব খর্ব করে কিন্তু এন্ড্রু কিশোর যা অর্জন করেছিলেন আত্মম্ভরিতায় তিনি তা খর্ব করেননি।

তাই সুসময় এবং দুঃসময়েও সংগীতকেই আঁকড়ে থেকেছেন। তিনি সংগীতকে অন্তরাত্মা দিয়ে ভালোবেসেছেন। তার সব সংযম, বিচারবুদ্ধি, ভালোবাসা সব সংগীতকে কেন্দ্র করে।

প্রত্যেক মানুষেরই দিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার একটা সীমা থাকে। এন্ড্রু কিশোর হয়তো সীমানা অতিক্রম করার আগেই বিদায় নিয়েছেন। কোনো মানুষেরই জীবন তৃষ্ণা মেটে না।

মাটির তলায় হীরা-জহরতের সঞ্চয় কোথায় থাকে তা বোঝার উপায় নেই কিন্তু বাঙালি হৃদয়ের গভীরে কিশোরদা আছেন তা আমরা সবাই বুঝতে পারি।

বিখ্যাত সাহিত্যিক দার্শনিক কহলীল জিবরান বলেছিলেন, ‘তুমি কি তোমার আত্মার চোখ দিয়ে আমার আত্মার চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া দেখতে পাও না?

এন্ড্রুদা আপনি কি আপনার আত্মার চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন না আপনার শূন্যতায় আমরা কতটা দুঃখ পেয়েছি।

শহীদুল্লাহ ফরায়জী : গীতিকার